সোমবার ২৯ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

দেশে ১ লাখ ৭০ হাজার ৬১৭ জন খেলাপি

স্টাফ রিপোর্টার: অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দেশের শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা সংসদে প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন, এমন ১৪ হাজার ৬১৭ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিয়েছেন তিনি। এসময় তিনি জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপির সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ জন। আর ঋণের পরিমান ১ লাখ ২ হাজার ৩১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলমের (নওগাঁ-৬) প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তালিকা দেন।

মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, এ তালিকায় শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপির মধ্যে আছে, চট্টগ্রামের সামানাজ সুপার অয়েল (এক হাজার ৪৯ কোটি টাকা), গাজীপুরের গ্যালাক্সি সোয়েটার এন্ড ইয়ার্ন ডায়িং (৯৮৪ কোটি), ঢাকা সাভারের রিমেক্স ফুটওয়্যার (৯৭৬ কোটি), ঢাকার কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেম (৮২৮ কোটি), চট্টগ্রামের মাহিন এন্টারপ্রাইজ (৮২৫ কোটি), ঢাকার রূপালী কম্পোজিট (৭৯৮ কোটি), ঢাকার ক্রিসেন্ট লেদার ওয়্যার (৭৭৬ কোটি), চট্টগ্রামের এসএ অয়েল রিফাইনারি (৭০৭ কোটি), গাজীপুরের সুপ্রভ কম্পোজিট নিট (৬১০ কোটি), গ্রামীণ শক্তি (৬০১ কোটি)।

শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির কাছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা আছে ৭০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা।

সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১৭ জন। তাদের নেওয়া ঋণের মোট পরিমাণ ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। তাদের মোট ঋণের মধ্যে বড় একটি অংশ খেলাপি রয়েছে। এর পরিমাণ এক লাখ ১৮৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডাটাবেইজে রক্ষিত ডিসেম্বর ২০১৮ ভিত্তিক বাংলাদেশের সকল তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপির সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ জন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

সংসদ সদস্য বেগম লুৎফুন নেসা খানের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একই সময়ে বাংলাদেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২ হাজার ৩১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সিআইবি ডাটাবেজে রক্ষিত ডিসেম্বর ২০১৮ ভিত্তিক বাংলাদেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির সংখ্যা এক লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ জন এবং অর্থের পরিমাণ এক লাখ দুই হাজার ৩১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা ২০১৫ সালে ছিল এক লাখ ১১ হাজার ৯৫৪ জন এবং তাদের কাছে প্রাপ্ত ঋণের অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে ৫৮ হাজার ৪৩৬ এবং অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৪৩ হাজার ২১০ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরে মে ২০১৯ পর্যন্ত দাতাদেশ/সংস্থাসমূহের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে মোট পাঁচ হাজার ২১৩ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে। ঋণ বাবদ চার হাজার ৯৭৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং অনুদান বাবদ ২৩৮ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে।

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ১৯৯৮ সালে কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ ব্যাংকটি সহজ শর্তে বেকার যুব ও যুব মহিলাদের মধ্যে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ করে আসছে। বর্তমানে জামানতবিহীন ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ হচ্ছে পাঁচ লাখ টাকা।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল আজীমের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে মে ২০১৯ পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৫ হাজার ৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের এই সময়ের তুলনায় এক হাজার ৪৬২ মিলিয়ন ডলার বেশি।

নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মামুনুর রশীদ কিরণের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মোট টিআইএনধারী করদাতার সংখ্যা ৪০ লাখ ৩৭ হাজার ৪২৯।

জানা গেছে সারা বিশ্বেও মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ঋণ খেলাপির পরিমান। যা ১২ শতাংশের পৌছেছে। নানা উদ্যোগ গ্রহন করার পরেও কেলাপির পরিমান কমানো যায়নি। বরং উল্টো খেলাপির পরিমান আরও বেড়েছে।

কেন্দ্র্রয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১০ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ শেষে এ হার ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশে ঠেকেছে।

টানা তৃতীয় বারের মত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আওযামী লীগ। আবুল মাল আব্দুল মুহিত পর পর দুই বার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এবার আ হ ম মোস্তফা কামালকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে। তিনি অর্থমন্ত্রী হওয়ার পরে বলেছিলেন আর খেলাপির পরিমাণ বাড়বে না। দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে (১৬ হাজার ৯১১ কোটি প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে জানুয়ারি-মার্চ এ তিন মাসে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের উচ্চহার ছিল পাকিস্তানে। ২০১৬ সালেও দেশটির ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল বিতরণকৃত ঋণের ১১ শতাংশের বেশি। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

তথ্য-উপাত্ত বলছে, এশিয়ার বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার বাড়ছিল ভারতে। ২০১৮ সালে দেশটির ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নানা উদ্যোগে তা কমে এসেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশটির ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে। শুধু এশিয়া নয়, আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকার সিংহভাগ দেশের খেলাপি ঋণ নিম্নমুখী। অধিকাংশ দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণই ৫ শতাংশের নিচে। কেবল জাতিগত সহিংসতা, যুদ্ধবিধ্বস্ত, সাম্রাজ্যবাদী বৃহৎ শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ ও আধিপত্যবাদের শিকার হওয়া কিছু দেশ এবং ক্ষুদ্র অর্থনীতির কয়েকটি দেশের খেলাপি ঋণ দুই অংকের ঘরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে বিতরণকৃত ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার। খেলাপি ঋণকে দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে তবেই ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে।

 খেলাপি ঋণের কারণে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিজেএমসির মতো ভর্তুকি নির্ভর হয়ে চলছে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনীতির জন্য যতটা হুমকি তৈরি করেছে, ততটা উদ্বেগ আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দেখি না। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে খেলাপি ঋণকে সংকট (ক্রাইসিস) হিসেবে প্রথমে স্বীকৃতি দিতে হবে। জনগণের করের অর্থ থেকে মূলধন জোগান না দিলে অনেক আগেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ভেঙে পড়ত।

তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এটি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। যখন পুরো ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর অনাস্থা তৈরি হবে কিংবা সিস্টেম ব্যর্থ হবে, তখন পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোই ভেঙে পড়বে। সে পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই নীতিনির্ধারকদের সুবুদ্ধির উদয় হোক। সংকট গভীর হলে তখন আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের কাছে ধরনা দিতে হবে। সে পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক, এটি আমরা চাই না।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ