শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ওসি মোয়াজ্জেম কারাগারে, অভিযোগ গঠন ৩০ জুন

স্টাফ রিপোর্টার : নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দীর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ানোর মামলায় গ্রেপ্তার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে কারাগারে পাঠিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ৩০ জুন ধায্য রেখেছে আদালত। এই পুলিশ কর্মকর্তার জামিন আবেদন নাকচ করে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মাদ আস সামছ জগলুল হোসেন গতকাল সোমবার এই আদেশ দেন।

সাইবার ট্রাইব্যুনাল পরোয়ানা জারির ২০ দিন পর রোববার বিকালে ঢাকার হাইকোর্ট এলাকা থেকে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ লাপাত্তা থাকার পর আগাম জামিন চাইতে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন তিনি।

আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সোনাগাজী থানায় পাঠানো হয়েছিল বলে সেখান থেকে পুলিশের একটি দল ঢাকায় এসে গতকাল সোমবার সকালে পরিদর্শক মোয়াজ্জেমের দায়িত্ব বুঝে নেন। দুপুরে একটি প্রিজন ভ্যানে করে তাকে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় নেয়া হয়।  

বাদামি রঙের টি শার্ট ও কালো চশমা পরা মোয়াজ্জেমকে বেলা সোয়া ২টার পর আদালত কক্ষে নেওয়া হলে প্রথমে তাকে কাঠগড়ার বাইরে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে দেখা যায়। থানা থেকে আনার পর কখনোই তার হাতে হাতকড়া দেখা যায়নি। সেখানে উপস্থিত বেশ কয়েকজন আইনজীবী এবং আদালতের পেশকার এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এ আসামীকে কাঠগড়ার ভেতরে নেওয়া হয়।

মোয়াজ্জেমের পক্ষে আদালতে জামিন আবেদন করেন তার আইনজীবী সালমা সুলতানা। তার জামিন আবেদনের শুনানি করেন মো. ফারুক আহাম্মাদ।

এ মামলার বাদী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনও এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। শুনানির সময় ওসি মোয়াজ্জেমকে আশপাশে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।

শুনানি শেষে বিচারক মোজাম্মেলের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সেই সঙ্গে অভিযোগ তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেওয়া প্রতিবেদনকে অভিযোগপত্র হিসাবে নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ৩০ জুন দিন ঠিক করে দেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় দায়ের করা এ মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে পুলিশ পরিদর্শক মোয়াজ্জেমের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদন্ড হতে পারে।

ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত গত মার্চ মাসে তার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করলে ওসি মোয়াজ্জেম তাকে থানায় ডেকে জবানবন্দী নিয়েছিলেন। তার কয়েক দিনের মাথায় নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগ করা হলে সারাদেশে আলোচনা শুরু হয়। তখন ওই জবানবন্দীর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হলে গত ১৫ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমকে আসামী করে ঢাকায় বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন আইনজীবী সুমন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, মোয়াজ্জেম বেআইনিভাবে মোবাইল ফোনে নুসরাতের জবানবন্দীর ভিডিও করেছেন এবং তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছেন। 

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ওই অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানালে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মাদ আস সামছ জগলুল হোসেন গত ২৭মে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

এদিকে নুসরাতের মৃত্যুর পর ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রথমে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করে রংপুর রেঞ্জে পাঠান হয়। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় পুলিশ বাহিনী থেকে।

কিন্তু আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিলে তা তামিল করা নিয়ে ফেনী ও রংপুর পুলিশের মধ্যে বেশ কয়েক দিন ঠেলাঠেলি চলে। এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমে পরিদর্শক মোয়াজ্জেমের লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার খবর আসে।

ফলে পুলিশ বাহিনী তাদের কর্মকর্তা মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তারে আদৌ আন্তরিক কি না- সেই প্রশ্ন তোলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

ঈদের আগে মোয়াজ্জেম হোসেনের একটি আগাম জামিনের আবেদন হাইকোর্টে জমা পড়লেও সেই শুনানি তখন হয়নি। ফলে আদালতেও তাকে দেখা যায়নি।

সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শেষে রোববার আদালত খুললে হাইকোর্টের নিয়মিত বেঞ্চে নতুন করে আবেদন করেন এই পুলিশ পরিদর্শক। সেখান থেকে ফেরার সময়ই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। 

হাতকড়া না পরানোয় আদালতে হইচই  

সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিট। আদালতের এজলাসে উপচেপড়া ভিড়। ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে আদালতের হাজতখানা থেকে এজলাসে উঠানো হলো বিশেষ নিরাপত্তায়। গায়ে হলুদ টি শার্ট। চোখে কালো সান গ্লাস। কাঠগড়ার সামনে দাঁড় করানো হলো তাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাধারণ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হইচই দেখা যায়। অভিযুক্তকে কাঠগড়ায় নেয়া হচ্ছে না কেন? হাতকড়া পরানো হলো না কেন? জানতে চান তারা। সঙ্গে সঙ্গে আদালতের নির্দেশে কাঠগড়ায় উঠানো হয় তাকে। আদালতের শুনানি চলা অবস্থায় সারাক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

এদিকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে হাতকড়া পরানো হয়নি কেন? এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় আদালতে। মামলার বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনও হাতকড়া না পরানোয় বিষয়টির সমালোচনা করেন। তাকে কেন হাতকড়া পরানো হলো না জিজ্ঞাসা করলে এ আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, 'ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে  হাতকড়া দিয়ে কেন আদালতে আনা হয়নি সে বিষয়ে পুলিশ ভালো জানেন। তবে পুলিশের কাছে আমার অনুরোধ ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে যেভাবে আদালতে আনা হয়েছে পরবর্তীতে অন্য অভিযুক্তদেরও যেন একইভাবে আনা হয়।’

এদিকে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২ টায় মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের চত্বর আনা হয়। এরপর সেখান থেকে তাকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে আবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর শুনানি শুরু হয়। মামলার বাদী সায়েদুল হক সুমন আদালতে বলেন, ‘আসামী যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতেন তাহলে তিনি কেন এতোদিন আত্মগোপনে ছিলেন? তিনি পুলিশ বিভাগের কলঙ্ক।’ এ সময় তিনি জামিনের বিরোধিতা করেন।

পুলিশের কক্ষেই ঘুম ও নাস্তা !

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে রোববার (১৬ জুন) বিকেলে হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেফতারের পর রাখা হয়েছিল শাহবাগ থানায় পুলিশ অফিসারদের কক্ষে। সেখানেই রাত কেটেছে তার। পরদিন গতকাল সোমবার সকালে প্রিজন ভ্যানে তোলার আগ পর্যন্তও সেখানেই ছিলেন তিনি। রাতের ঘুম, সকালের নাস্তা সবই তাকে সারতে হয়েছে পুলিশ অফিসারদের সেই রুমেই।

শাহবাগ থানার এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) গতকাল এ তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এসআই জানান, থানায় সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে যেমন আচরণ করা হয়, মোয়াজ্জেমের সঙ্গেও তেমন আচরণ করা হয়েছে। তবে হাজত খানায় অন্য আসামীর সঙ্গে না রেখে তাকে ঘুমাতে দেওয়া হয় অফিসারের কক্ষে। এমনকি সকালে তিনি নাস্তাও সেরেছেন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মাহবুবুর রহমানের কক্ষে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একই থানার আরেক এসআই জানান, শাহবাগ থানায় ওসি মোয়াজ্জেম রাত কাটিয়েছেন বেশ আরামেই। অন্য কয়েদিদের সঙ্গে রাত কাটাতে হয়নি তাকে। তার খাবারও পরিবেশন করা হয়েছে আলাদাভাবে।

এ বিষয়ে জানতে পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালে অফিসে ছিলেন না বলে জানান। বিষয়টি নিয়ে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন মাহবুব।

ওসি আবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমরা তাকে আদালতে পাঠিয়েছি। বিষয়টি এখন আর আমাদের কাছে নেই।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ