শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাস্তায় আন্দোলনের এত বালিশ কেনার টাকার জোগানদাতা কে?

সংসদ রিপোর্টার: চলতি সংসদে নতুন অর্থ বছরের বাজেট উপস্থাপনের পর গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট নিয়েও অর্থমন্ত্রী আ হ ম  মোস্তফা কামালের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমন কী বিভিন্ন সংসদ সদস্যদের ছাঁটাই প্রস্তাবের বক্তব্যের জবাবও দেন তিনি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে বালিশ ক্রয়ে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের কারণে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ না দেয়ার জন্য ছাঁটাই প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একজন বালিশ তত্ত্ব নিয়ে এসেছেন। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওই ঘটনায় যিনি দায়িত্বে ছিলেন তার কিছু পরিচয় আমরা পেয়েছি। এক সময় তিনি বুয়েটে ছাত্রদলের নির্বাচিত ভিপিও নাকি ছিলেন। তাকে সেখান থেকে সরানো হয়েছে। যখনই তথ্য পেয়েছি সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। যে দলেরই হোক আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

বালিশ তত্ত্ব নিয়ে বক্তব্যকালে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির গঠন ও নানা কর্মকা- নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এখানে (বিএনপিতে) এমন লোক রয়ে গেছে জন্ম থেকেই তাদের চরিত্র দুর্নীতির। তার কারণও আছে। এই দলটি বিএনপি যিনি করেছিলেন। সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় সংবিধান ও সামরিক আইন লঙ্ঘন করে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাকের সাথে হাত মিলিয়ে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার সাথে যিনি জড়িত- হত্যার পর খুনিদের ইনডেমনিটি অর্ডারটাকে ভোটারবিহীন পার্লামেন্টে আইন হিসেবে পাস করিয়ে দিয়েছেন। অস্ত্রের মুখে সায়েম সাহেবকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে নিজেকে নিজে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন জিয়া। ক্ষমতা দখল করার পর তাদের হাতে যে দল গড়ে ওঠে তাদের চরিত্রটা জানা উচিত। তাদের উৎসটাই হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতিগ্রস্ততার মধ্যে থেকে ওঠে আসা। পঁচাত্তরের পর থেকে দুর্নীতিটাকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করে যারা দীর্ঘদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, সব জায়গায় এই জঞ্জাট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন।

পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বালিশ তত্ত্ব নিয়ে আমারও একটা প্রশ্ন আছে। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র সেখানে গড়ে উঠছে। সেখানে আর কিছু না পেয়ে পেল বালিশ। এটা কোন বালিশ। কী বালিশ সেটাও একটা প্রশ্ন? এটা কী তুলার বালিশ। কোন তুলা? কার্পাস তুলা না শিমুল তুলা, নাকি সিনথেটিক তুলা? নাকি জুটের তুলা? আর বালিশ নিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করতে দেখলাম। এত মানুষ, এত বালিশ একদিনে কিনে ফেলল কীভাবে? এই বালিশ কেনার টাকার জোগানদাতা কে? সেটা আর বলতে চাই না।

সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান সম্পূরক বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সুশাসনের অভাব বলে অভিযোগ করেন। সংসদ সদস্যের এমন অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আরেকজন মাননীয় সংসদ সদস্য বললেন, সুশাসনের অভাব। উনি যে দল থেকে এসেছেন, নবগঠিত দল। আসলে আওয়ামী লীগ ভেঙেই ওই দলটি গড়া হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, উনাদের নেতা আওয়ামী লীগই করতেন। তারপর চলে গিয়েছিলেন। কাজেই তার দলে কী ডিসিপ্লিনটা আছে? কী দলতন্ত্রটা আছে? যার নিজের দলেই সুশাসন নেই, গণতন্ত্র নেই, ডিসিপ্লিন নেই- যেখানে কেউ কথা বলতে গেলেই বলেন, খামোশ। তার কাছ থেকে কী আশা করা যায়?

এ সময় বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদের এক বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্য বললেন, প্রতিবার নির্বাচিত হলেই প্লট পাবেন। আমি তো সাতবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। আমি তো কোনো প্লট নেইনি।

এর আগে সম্পূরক বাজেটে সমাপনী বক্তব্যে ব্যাংকের তারল্য সংকটের অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বলা হচ্ছে ব্যাংকে টাকা নেই। ব্যাংকে টাকা থাকবে না কেন? অবশ্যই টাকা আছে। তবে লুটে খাওয়ার টাকা নেই।

ব্যাংক খাতে লোপাট প্রশ্নে বিএনপি সরকারের সময়ের ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক খাত যারা লুট করে নিয়ে গেছে তারা দেশান্তর হয়ে পড়ে আছে, অথবা দুর্নীতির দায়ে কারাগারে বন্দি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি, এ রকম বহু ঘটনা আছে। সময় এলে এ ব্যাপারে আরও আলোচনা করতে পারবো।

বাজেট নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট নিয়ে ভেতরে-বাইরে অনেক কথা হচ্ছে। কেউ কেউ এমনও বলছেন, বাজেট নাকি কিছুই না। যারা এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে কথা বলছেন, তাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন−বাজেট সঠিক না হলে মাত্র দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ এতো উন্নতি করলো কী করে?

তিনি বলেন, ‘কেউ বলছেন−বাজেট দিয়েছেন, বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বাজেট যদি বাস্তবায়ন করতে না পারি তাহলে ২০০৮ সালে মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেয়েছিলাম, আজকে সেখানে ৫ লাখ কোটি টাকার ওপরে চলে গেছে। বাস্তবায়নের দক্ষতা না থাকলে এটা করলাম কীভাবে?

সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় তিনি আরও বলেন, সরকারের উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন, জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি অর্জন ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়। এই প্রাক্কলন করতে গিয়ে সঙ্গত কারণেই আমরা কিছুটা বেশি করি। রাজস্ব আদায়ে খানিকটা উচ্চাভিলাষী হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সমৃদ্ধির পথে গত এক দশকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অসম্ভবকে সম্ভব করা, অজেয়কে জয় করা, দুর্ভেদ্যকে ভেদ করারই গল্প। আমাদের উচ্চাভিলাষ না থাকলে এসব অর্জন সম্ভব হতো না। বাজেট বাস্তবায়ন, পরিসংখ্যান, সবই প্রমাণ করে আমাদের লক্ষ্য সব সময়ই বাস্তবভিত্তিক ছিল। বাস্তবতার কারণেই আমাদের বাজেটে কিছুটা সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, পরিবর্ধনের প্রয়োজন হয় এবং প্রতিবছরই আমরা এটা করে থাকি। এটা সব দেশের বাজেটেই হয়ে থাকে।

বক্তব্যকালে তিনি সম্পূরক বাজেটে হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ অনুমান করেছিলাম। সংশোধিত বাজেটে তা আমরা ৮.১৩ শতাংশ হবে বলে আজ অনুমান করছি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৬ শতাংশ নির্ধারণ হয়েছিল, এটি আমরা সাফল্যজনকভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হবো বলে আশা করছি। মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অনুমান করা হলেও সংশোধিত মূল্যস্ফীতি ধারণা করা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অত্যন্ত সতর্ক থাকার জন্যই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখন যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বলেই আমরা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি। এটা দেখে সারাবিশ্ব আজ অবাক হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে এখন উন্নয়নের বিস্ময়। যেখানে যাই সেখানেই সেই কদরটা পাই। দেশবাসী সেই সম্মানটা পায়। কাজেই অযথা কিছু কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না করাই ভালো। আমরা কাজ না করলে দারিদ্র্যের হার ৪০ ভাগ থেকে ২১ ভাগে নেমে আসতো না। এই ২১ ভাগ থেকে দারিদ্র্যের হার আরও নামিয়ে আনবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ