বুধবার ২৭ মে ২০২০
Online Edition

এই বাজেট অসম্পূর্ণ ও দিকনির্দেশনাহীন

*বাজেট বাস্তবায়ন খুবই কঠিন----- মুহিত 

*এই বাজেট অসম্পূর্ণ ---------- দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

*বাজেটে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি --- ড. সালেহ উদ্দিন

* বাজেটে ৭০ ভাগ খুশি ------ রুবানা হক

 

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে এই বাজেট অসম্পূর্ণ ও দিক নির্দেশনাহীন। ট্যাক্স আদায়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা (বাংলাদেশ) নিচের দিকে। কারণ মানুষ ট্যাক্স দিতে চায় না। বাজেট বাস্তবায়ন খুবই কঠিন। এছাড়া বাজেটে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়নি। নতুন বাজেটে শতভাগ খুশি হতে না পারলেও ‘অন্তত ৭০ ভাগ’ খুশি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। 

সংসদে বাজেট উত্থাপনের পর গতকাল বৃহস্পতিবার বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা এ সব কথা বলেন। এর আগে বিকেলে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করা হয়। রীতি অনুযায়ী, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন। 

এবারের বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণ ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে নেওয়া হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে বড় আকারের ব্যয় মেটাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৩ দশমিক ১ শতাংশের সমান।

বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়ন খুবই কঠিন। কারণ মানুষ ট্যাক্স দিতে চায় না। ট্যাক্স আদায়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা (বাংলাদেশ) নিচের দিকে। তিনি বলেন, বাজেট ডিক্লেরেশন (ঘোষণা) খুবই সুন্দর হয়েছে। আমি আমার বক্তব্যের কোথায়ও বক্তব্য ও তথ্য উপাত্ত তুলে ধরতাম। কিন্তু এবার অর্থমন্ত্রী উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেট তুলে ধরেছেন। 

বাজেট প্রতিক্রিয়া জানান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থমন্ত্রী নিঃসন্দেহে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবতার নিরিখে করার চেষ্টা করছেন। তবে এতে সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়নি। উনি প্রত্যাশা উচ্চাকাক্সক্ষার কথা বলেছেন, সেটা পরিপূরণের জন্য যে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প-প্রস্তাবনা থাকে, বিশেষ করে নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে, তা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। 

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে কতগুলো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। আমাদের ধারণা ছিল সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে উল্লেখ করে, সেগুলোর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো সেরকম একটা ব্যবস্থা আমরা লক্ষ্য করবো। দুঃখজনকভাবে আমরা এই মুহূর্তে তা পেলাম না। যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যেমন- তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। কিন্তু এটা কোন খাতে, কীভাবে সৃষ্টি হবে এবং এটা ব্যক্তিখাতে হবে না, সরকারি খাতে হবে, এটা কি গ্রামে হবে নাকি শহরে হবে এ ধরনের কোনও মূল্যায়নভিত্তিক বা কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাভিত্তিক কৌশলপত্র আমরা সেভাবে লক্ষ্য করিনি।

তিনি আরও বলেন, যে সব প্রতিশ্রুতি আছে, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে কোন সময়ের ভেতরে বাস্তবায়ন হবে তা বলা নেই। যেমন ব্যাংকিং খাতে কমিশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আলাপ আলোচনা করে করা হবে। আমার কাছে এক কথায় মন্ত্রী নিঃসন্দেহে বাস্তবতার নিরিখে বাজেট করার চেষ্টা করেছেন, তবে সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা তাতে প্রতিফলিত হয়নি। উনি প্রত্যাশা ও উচ্চাকাক্সক্ষার কথা বলেছেন, সেটা পরিপূরণ করার জন্য যে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প-প্রস্তাবনা থাকে, বিশেষ করে নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে, সেটা কিন্তু অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাজেট সাধারণের নয়, আমলাতান্ত্রিক অঙ্কের যোগ-বিয়োগ মাত্র। বাজেট আজও গণমানুষের হতে পারেনি। এটা নিয়ে অনেক কিছুই বলা হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না।

বাজেট বাস্তবায়নে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বাজেট নিয়ে অনেক কথা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেট আলোচনায় কথা বলছে কারা? সরকারের নীতিনির্ধারকরা, আমলা বা আমাদের মতো আলোচক-সমালোচকরা। বলা যায়, প্রতি বছর নির্ধারিত ব্যক্তিরাই বাজেট নিয়ে আলোচনা করছেন। সরকার আলোচনা করছে এফবিসিসিআই বা বিজিএমইএ’র মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। এসব সংগঠন গ্রামের একজন মুদি ব্যবসায়ীর প্রতিনিধিত্ব করেন না। এফবিসিসিআই হাজার হাজার কোটি টাকার বিষয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু গ্রামের একজন সাধারণ মানুষের কাছে ১০০ টাকাই অনেক বড় কিছু। বাজেটে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বা তাদের প্রত্যাশার বিষয়টি একেবারেই গুরুত্ব পায় না। বাজেট আলোচনায় অনেক কিছুই বলা হয়, কিন্তু বাস্তবায়নে নানা ত্রুটি রয়ে যায়।

বাজেট সাধারণের জন্য শুভঙ্করের ফাঁকি’ উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারের বাজেট প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রভাব রাখে। কারও জীবনে ইতিবাচক আবার কারও জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ কারণে আমাদের মতো দেশে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে বাজেট প্রণয়ন দরকার। কিন্তু তা হয় না। বাজেট মূলত সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব।

বাজেটের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব, বেসরকারি উন্নয়ন এবং দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই হলো বাজেটের মূল লক্ষ্য। কিন্তু আমাদের দেশে প্রথম দুটি হয়, তৃতীয়টি আর হয় না। সরকারের বাজেট আলোচনায় বড় বড় রাস্তা, ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। সেই ফ্লাইওভারে সাধারণ মানুষ কী সুবিধা পাচ্ছে, তারা সেই রাস্তায় আদৌ উঠতে পারছে কি না, তা গুরুত্ব পায় না। গরিব মানুষের সঙ্গে যা সরাসরি জড়িত সেখানে গুরুত্ব না দিলে উন্নয়ন কাঠামো দুর্বলই থেকে যায়। 

খাতা-কলমে বাজেট না দেখিয়ে প্রায়োগিক অর্থে বাজেট মূল্যায়ন করা দরকার। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বাড়ানোর জন্য আগে থেকেই ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে। আপনি জুন থেকে আলোচনা করে জুন মাসেই ঘোষণা করবেন, তাতে সব বিষয় আলোকপাত হয় না।

তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সমিতির সভাপতি রুবানা হক বলেছেন, নতুন বাজেটে শতভাগ খুশি হতে না হতে পারলেও ‘অন্তত ৭০ ভাগ’ খুশি হয়েছি। 

দেশের রফতানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রণোদনা হিসেবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী করলেও তা ‘যৎসামান্য’ বলে মনে করছেন বিজিএমইএ সভাপতি। তৈরি পোশাক খাতের রফতানিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে আরও দুই হাজার ৮২৫ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করেন তিনি।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন তৈরি পোশাকের চারটি খাত ৪ শতাংশ রফতানি প্রণোদনা পাচ্ছে। আমি আগামী অর্থবছর থেকে তৈরি পোশাকের বাকি সব খাতের জন্য এক শতাংশ রফতানি প্রণোদনা প্রস্তাব করছি।

রুবানা বলেন, এ বাজেট নিঃসন্দেহে জনকল্যাণমুখী বাজেট। শিল্পের দিক থেকে যদি বলেন, তাহলে বলব শতভাগ খুশি না হলেও শতকরা ৭০ ভাগ খুশি আমরা। ঘোষিত প্রণোদনাতে খুশি হতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ক্যাশ ইনসেনটিভ আসলে অন্তত ছোট্ট একটি ফিগার। পোশাক খাত এমন একটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, যেখানে এই ইনসেনটিভ আমরা যৎসামান্য মনে করি। অন্তত পক্ষে আরও তিন পারসেন্টও যদি আমাদের দিতেন, তাহলে লাভ হত।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে ‘কিছু নেই’ উল্লেখ করে হতাশা প্রকাশ করে রুবানা বলেন, শিশুদের জন্য অ্যালোকেশন আলাদা আছে, কিন্তু নারীদের জন্য দেখিনি। নারী উদ্যোক্তাদের শোরুমের উপর কোনো ট্যাক্স ধরা হবে না, সেটি অবশ্য আমরা যৎসামান্য মনে করি।

পোশাক শ্রমিকদের যেন সামাজিক সুরক্ষা খাতের অধীনে আনা হয় সে দাবি করে রুবানা হক আরও বলেন, বাজেটের আগে আমরা এটি প্রস্তাব করেছিলাম কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে যে খাতগুলো উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে পোশাক শ্রমিক নেই। কিন্তু যেহেতু বরাদ্দের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৩শ’ ৬৭ কোটি টাকা সেহেতু পোশাক শ্রমিকদেরও এর আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ