বুধবার ২৭ মে ২০২০
Online Edition

উন্নয়নের নামে করের বোঝা জনগণ পাচ্ছে কি?

 

এইচ এম আকতার: বিপুল অঙ্কের বাজেট ব্যয়ের আকাক্সক্ষা থাকলেও সরকারের আয়ের সামর্থ্য কমে গেছে। করনির্ভরশীল এই বাজেটে আসলে জনগণ কি পাচ্ছে। উন্নয়নের নামে বাড়ছে বাজেটের আকার বাড়ছে করের বোঝা। সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা ও নাজুক আর্থিক খাত। সরকারের ঘরে টাকা নেই অথচ বিলাসিতার ব্যয় বেড়েছে। তারল্য সংকট থাকা সত্ত্বেও বিশাল ঘাটতি বাজেট কিভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সরকারের। নতুন অর্থমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ এখন অনেক। 

 গতকাল অর্থমন্ত্রী ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ঘাটতিসহ ৫লাখ ২৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকার  বিশাল বিলাসি বাজেট ঘোষণা করেন। করের ওপর নির্ভরশীল এই বাজেটে আসলে জনগণ কি পাবে। এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। 

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরাসরি জনগণ উপকৃত হয় এমন খাত হলো চারটি। সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ, কৃষি খাত, স্বাস্থ্য খাত এবং শিক্ষা খাত। এসব খাতে সরকারের বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। এসব বরাদ্দের কোন টাকাই সরাসরি জনগণের হাতে পৌঁছায় না। সরকার জনগণের কল্যাণে এসব খাতে ব্যয় করে। অথচ এসব খাত থেকে জনগণের স্বার্থে ব্যয় হয় শিক্ষায় ৭১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয় ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণে ৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ লাখ ৯০০১ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে থাকে।

আর এর বিপরীতে জনগণের ঘাড়ে চাপবে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। তার মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে আয় হবে ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব বহির্ভূত আয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ২১০ কোটি টাকা। এ টাকা জনগণের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভ্যাট আর করের মাধ্যমে আদায় করা হবে।

আবার ব্যয়ের নামে সারা বছরই চলে লুটপাট। স্বস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকলেও তা অপ্রতুল। এখানে সাধারণ মানুষ সেবা পায় খুবই কম। এখাতে সরকারের আয়ও হয়ে থাকে। তবে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়াতে প্রতি বছরই ঘাটতি দিতে হচ্ছে।

একইভাবে কৃষি খাতে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ। এখাতে ভর্তুকি ৯ হাজার ১ কোটি টাকা। এখানে কৃষকরা সরাসরি কোন টাকা পায় না। সরকার বীজ, সার আর সেচ কাজে এ টাকা ব্যয় করে থাকে। অথচ কৃষি খাতে জিডিপির অবদান ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ। তাহলে দেখা যাচ্ছে এ খাতে সরকারের ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি।

শিক্ষা খাতেও সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। আর এ কারণেই এ খাতে সর্বোচ্চ দ্বিতীয় বরাদ্দ। এখাতে থেকে সাধারণ জনগণ সরাসরি কোন টাকা পায় না। তবে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাবৃত্তি এবং ফ্রি বই পেয়ে থাকে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ খাতে মোট বরাদ্দ ২৭ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। ভর্তুকি ৩৫৭৪ কোটি টাকা। গত বছর এ খাতে ভর্তুকি ছিল ৪৪৪ কোটি টাকা। এখাত থেকে প্রায় সব টাকাই জনগণের হাতে পৌঁছে। তবে এখাতেও চেয়ারম্যান মেম্বাররা লুটপাট করেন। 

বাজেটে বলা হয়েছে, কৃষির উন্নয়নের জন্য স্বাভাবিক বিনিয়োগের অতিরিক্ত হিসেবে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ চালিত সেচ যন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদান অব্যাহত থাকবে।

অনুদানসহ আগামী বাজেটের মোট আয় ধরা হতে পারে ৩ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত কর ব্যবস্থা থেকে আসবে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিভিন্ন সেবা মাশুল থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে করা হয় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। যদিও অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এনবিআর আদায় করতে পেরেছে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি তিন মাসে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য পূরণ হয় কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

মোট রাজস্বের মধ্যে বড় অংশ হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট)। আগামী ১ জুলাই থেকে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ কার্যকর করা হবে। নতুন আইনে ভ্যাটের স্তর থাকবে পাঁচটি। আর কর আদায়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে ১০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দেয়ার কথা এরই মধ্যে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাদের মাধ্যমে নতুন করদাতা খোঁজার কাজটি করার চিন্তা তাঁর।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, সবার আগে করের জাল বিস্তৃত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। গ্রামাঞ্চলেও এখন অনেক লোক আছেন যারা কর দেয়ার যোগ্য, কিন্তু সরকার তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

করপোরেট করের ক্ষেত্রে হিসাব কারসাজি রোধ করতে পারলেও সংগ্রহ বাড়বে বলে মনে করেন মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, একদিকে দেখা যায় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই, আবার নিবন্ধন থাকলেও ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) যন্ত্র ব্যবহার করে না। অন্যদিকে, এক পণ্য আমদানি করে শুল্ক ফাঁকি দিতে দেখায় আরেক পণ্য। এগুলো রোধ করতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়বে।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট বা ব্যয়ের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা করা হয়েছে। সে হিসেবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে আগামী বাজেটের আকার ৮০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা বা ১৮ শতাংশ বেশি।

মোট ব্যয়ের মধ্যে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকাই অনুন্নয়ন ব্যয়। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ দিতে ৫৩ হাজার কোটি এবং বিদেশি ঋণের সুদ দিতে ব্যয় হবে আরও ৪ হাজার কোটি টাকা। আর ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে।

ব্যয়ের মধ্যে বড় প্রশ্ন রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের মান নিয়ে। কাজের বিনিময়ে খাদ্যসহ (কাবিখা) নতুন বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় বা এডিপি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

বড় আকারের এডিপি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যয়টা যে ঠিকভাবে ও ঠিক সময়ে হয় না, তার বহু দৃষ্টান্ত আছে দেশে। একটি উদাহরণ যদি দিই, ওই যে ডেমু ট্রেন কেনা হয়েছিল, ছয় বছর পরে আজ তা ভাগাড়ে পড়ে আছে। পত্রিকায় দেখলাম চালকের পরীক্ষা নিতে ৭০০ গাড়ি কিনবে বিআরটিএ। জাতীয় স্বার্থের কথা না ভেবেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যয়ের ক্ষেত্রে তাই সবার আগে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। দেখতে হবে যে ব্যয়টা প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে কি না বা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে কি না।

বরাবরের মতো আগামী বাজেটের ঘাটতিও থাকছে জিডিপির ৫ শতাংশই। এ হিসেবে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। জিডিপির আকার চলতি অর্থবছরের ২৫ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগামী অর্থবছরের জন্য ধরা হচ্ছে ২৮ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা।

সূত্রগুলো বলছে, সরকার এই ঘাটতি মেটাবে কয়েকটি উপায়ে। প্রথমত বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতির বাকি টাকা পূরণ করা হবে দেশের ভেতর থেকে ঋণ নিয়ে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া হবে ৪৭ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যে অর্থের মধ্যে আবার ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে। চলতি অর্থবছরে অবশ্য সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে করা হয় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এ নিয়ে বলেন, ‘ঋণ ব্যবস্থাপনাটা একদমই হচ্ছে না। হচ্ছে না বলেই সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদের বোঝা বইছে সরকার। বহু দিন থেকেই এ কথা বলে আসছি। কিন্তু সরকার তার জায়গাতেই আছে।’

জনগণের ঘাড়ে চাপবে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকার কর বোঝা আর সে জনগণের কথা বলার ওপর কর বসানো হয়েছে। এবছর মোবাইল ফোনে কথা বলায় খরচ বাড়ছে। বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক দ্বিগুণ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল ফোনের টক টাইমের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। বর্তমানে ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ আছে।

মোবাইল ফোনের কথা বলায় ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পাশাপাশি ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১ শতাংশ সারচার্জ বসবে। এতে কর ভার হবে ২৭ শতাংশের বেশি। বর্তমানে কর ভার ২২ শতাংশের মতো আছে।

বেসরকারি ব্যাংকে টাকা নেই, আর সরকারি ব্যাংকের নেই পর্যাপ্ত মূলধন। ফলে সরকারি ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রায় করের বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি ২২ হাজার কোটি টাকা। আর এসব ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছরই দেয়া হচ্ছে জনগণের করে টাকা। গত ছয় বছরে এভাবে দেওয়া হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকই পেয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। যদিও তার আগের ১০ বছরে এ ব্যাংকগুলোকে দিতে হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ