শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দুঃখ কষ্ট বেদনা এবং বিড়ম্বনার ঈদ উদযাপন

মুুহাম্মদ হাফিজুর রহমান : দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের আগমণ ঘটে। ঈদ মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে তার প্রিয় বান্দাহদের জন্য এক অনুপম পুরস্কার। ¯্রষ্টার এ নেয়ামত বান্দাহর জন্য কতো বড়ো অনুগ্রহ তা ভাষায় প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি- অথবা জাতীয় কবির ভাষায় - ‘রমজানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ- তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানী তাকিদ’। ঈদে গরীব দুঃখী একাকার হয়ে যেমন ঈদগাহে যায়, একইভাবে সামর্থ্যবান মানুষেরা চেষ্টা করে সাধ্যমতো গরীব,দুঃখী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। যদিও আমাদের দেশের সামর্থ্যবান মানুষের সংখ্যা, তাদের সামর্থ্য এবং দরিদ্র মানুষদের ন্যূনতম প্রয়োজনের আলোকে সকল যায়গায় এ সহযোগিতার হাত সমানভাবে প্রসারিত হয় না। যেই আল্লাহ রোযা ফরয করলেন, যিনি রোযা শেষে ঈদের মতো আনন্দময় একটি তাৎপর্যম-িত মহা-খুশির দিন দিলেন তার নির্দেশ সকলস্তরে বাস্তবায়িত নেই। যদি এটা থাকতো যে, সামর্থ্যবান মানুষেরা অসহায় মানুষের পাশে তাদের সামর্থ্যরে সবটুকু নিয়ে দাঁড়াবে, তবে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য আরো কমে আসতো। এরপরও বলবো উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্রের সম্মিলনের মাধ্যমে ঈদের আনন্দের রেশ সব যায়গায় ছুঁয়ে যায়। দূরের মানুষেরা আপনজনের কাছে ছুটে যায়। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ আনন্দ পূর্ণতা লাভ করে। উৎসবপ্রেমি এই জনপদের মানুষদের কাছে ঈদ শুধু নতুন জামা-জুতো আর সেমাই-পোলাও খাওয়া নয়, নয় শুধু আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানো। বছরের এই একটি দিনকে কেন্দ্র করে আত্মীয়-অনাত্মীয় যেমন একটি মেলবন্ধন তৈরী হয়, একইভাবে পিতা-মাতা, সন্তান, দাদা-দাদী, নাতি-নাতনী সকলের সম্মিলনের সাথে আরো অনুষ্ঠান এবং পার্বণ সমাপ্ত হয়। এবারের ঈদ দেশবাসীর জন্য খুশির বার্তা বয়ে আনার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেদনা এবং হতাশার বার্তা নিয়ে এসেছে। একটি দেশ এবং তার জনগণের জীবনের প্রাত্যহিক বিষয়গুলো শাসকবর্গের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। শাসকরা জনগণকে যেমন শাসন উপহার দিবেন জনগণ তেমনভাবেই তা ভোগ করবে। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ এবং ভালো থাকা-না থাকা সব কিছু নির্ভর করে শাসকবর্গের ভূমিকার ওপর। কোনো জনপদে সুশাসন না থাকলে সেখানকার জনগণের ভালো থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কেমন চলছে বাংলাদেশ, কেমন আছে লাল-সবুজ পতাকার ধারক-বাহকেরা, কেমন চলছ তাদের জীবনের গাড়িগুলো? আশা-আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা, চাওয়া-পাওয়া এগুলো নিয়েই মানুষের জীবন বহমান। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মাঝে কিছু হতাশা কাজ করে, আলোকের সন্ধানে পথ চলতে কিছু আধার ঝাপটে ধরে এইতো মানুষের জীবন। কিন্তু হতাশা আর আঁধারের ব্যপ্তি যদি জীবন সংহারী হয় তবে সে জীবনে কোনো আশা থাকে না, প্রত্যাশা থাকে না। বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় আমরা এমন এক সময়কে ধারণ করছি যেখানে আলোকের সন্ধান পাওয়া দুস্কর। এক একটি দুঃসংবাদে জীবনের স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নের বুননে কীটের বাসা, ঘুনে পোঁকার মতো কুট কুট করে সব সূতো ছিঁরে করছে একাকার। অনাকাক্সিক্ষত ঝড়ের তা-বে সমাজ সংসারের দেয়ালগুলো খসে পড়ছে অবিরত। জীবনের আনন্দগুলো হতাশায় রূপ নেয় বারে বারে। শাসক মহলের খামখেয়ালিপনা আমাদের সময়গুলোকে বিরক্তিকর আর নিরানন্দ করে দিচ্ছে। এবারের ঈদ কেমন কাটলো তা নিয়েই লিখতে বসেছি। আজ ঈদের তৃতীয় দিন। ঢাকা শহর এখনো ফাঁকাই বলা যায়। জুমুআর মসজিদে যেখানে মসজিদের বাইরেও মুসল্লীদের লাইন হয়, আজ মসজিদের ভেতরেও ফাঁকা ছিলো। ঘরমুখো মানুষগুলো আস্তে আস্তে ফিরতে শুরু করবে। এ নীরব নগরী আবরা সরব হবে। জীবন সংগ্রামে মানুষগুলো আবার নেমে পড়বে। কাজের ফাকে ফাকে ঈদের কষ্ট-বিড়ম্বনা আর তার সাথে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যের মুহূর্তগুলো স্মৃতিপটে ধরা দিবে Ñ এইতো জীবন, জীবনের এই রূপ, এই রং, এরই মাঝে আমাদের চলাচল। সুন্দর পৃথিবীতে কেউ আসছে কেউ যাচ্ছে। জীবন থেমে থাকে না, থেমে থাকে নি। বহমান এ সময়ে আমরা আমাদের জীবনকে কেমনভাবে পাড় করছি তা নিয়েই লেখা, যাতে সামনের দিনগুলো সুন্দর হয় এ প্রত্যাশায়। এবারের ঈদটি শুরু হয়েছে বিড়ম্বনা দিয়ে, চাঁদ দেখা গিয়েছে, কি দেখা যায় নি। এ বিতর্কে ফেলে গোটা দেশের জনগণকে এক অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে সরকার। এর সাথে ছিলো ট্রেনের টিকেট জালিয়াতি, পরিবহনের ভাড়া দ্বিগুণ, সড়কে যানজট, সড়কেই সন্তান প্রসব, সড়কে মৃত্যুর মিছিল ইত্যাদি। 

চাঁদ দেখা বিড়ম্বনা : ইসলামের বিধান হচ্ছে চাঁদ দেখে রোযা রাখতে হবে, চাঁদ দেখে রোযা ভাঙতে হবে- অর্থাৎ ঈদ উদযাপন করতে হবে। সহীহ মুসলিম শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী ‘আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, চাঁদ না দেখা (রমজানের) পর্যন্ত রোযা রাখবে না এবং চাঁদ না দেখা (শাওয়ালের) পর্যন্ত রোযা রাখা বন্ধ করবে না। এ হাদীসটি স্পষ্টত নির্দেশ দিচ্ছে যে চাঁদের সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি সম্পর্কিত। হাদীসের ভাস্য অনুযায়ী কাউকে না কাউকে চাঁদ দেখতে হবে। কোনো বিশ^স্ত দুজন ব্যক্তি চাঁদ দেখার ব্যাপারে স্বাক্ষ্য দিলে সকল মুসলমানের জন্য তা যথেষ্ট। ইসলামের শুরু থেকে নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর নির্দেশনা অনুযায়ী গোটা বিশে^র মুসলমানরা রোযা রাখছে এবং ঈদ পালন করে আসছে। বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউ-েশনের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি আছে, ইসলামিক ফাউ-েশনের প্রতিটি জেলায়, জেলা কার্যালয় এবং সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ আছেন, প্রতিটি উপজেলার ইউনিয়ন পর্যন্ত মসজিদ ভিত্তিক মক্তবের মাধ্যমে ইসলামিক ফাউ-েশনের কার্যক্রম জড়িত। এ ছাড়া প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকগণ আছেন, যারা চাঁদ দেখার বিষয়টি ধর্ম মন্ত্রনালয়কে অবহিত করবেন। সরকারের এত লোকবল এবং আধুনিক সকল ব্যবস্থাপনা থাকার পরেও এবারে ধর্মমন্ত্রী সাহেব এবং ধর্ম মন্ত্রণালয় জনগণের সাথে চাঁদ দেখা নিয়ে যে বিভ্রান্তিকর আচরণ করেছেন তা মেনে নেয়ার মতো বিষয় নয়। সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে যারা চাঁদ দেখেছেন তারা সাথে সাথে ইসলামিক ফাউ-েশন এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছেন। এরপরও সরকারের তরফে প্রথম সিদ্ধান্ত জানাতে লেগেছে রাত সারে আটটা, তখন তারা সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন- কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি, বৃহস্পতিবার ঈদ। ততোক্ষণে সাধারণ জনগণের পক্ষ হতে যারা চাঁদ দেখেছেন তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাঁদ দেখার বিষয়টি প্রচার করেছেন। যদিও সরকারের তরফে বলা হয়েছে- চাঁদ দেখা যায়নি। চাঁদ দেখার সংবাদটি বিশ^াসযোগ্য কি না, তা যাচাই করতে সময় লেগেছে চার ঘন্টা। জনগণের ম্যা-েটবিহীন এ সরকারের সাথে আসলেই জনগণের কোনো সম্পর্ক যে নেই- এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে চাঁদ দেখা নিয়ে সরকারের তেলেসমাতি কারবার। সরকারের এতগুলো অর্গান থাকার পরেও কে চাঁদ দেখার দায়িত্ব পালন করেছে, তা কি স্পষ্ট করে বলতে পারবে ? সরকারের ভূমিকায় বোঝা গেছে ধর্ম মন্ত্রণালয় শুধু মিটিং-ই করেছে তারা কেউ চাঁদ দেখার দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ অথবা যারা চাঁদ দেখেছে এমন লোকদের কাছ থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ সংগ্রহেরর কোনো চেষ্টা করেছে বলে কোনো আলামত ঘটনাচক্রে প্রমাণ হয় না। ধর্মমন্ত্রী বলেছেন, চাঁদ দেখার সংবাদটি যাচাই বাছাই করতে সময় লেগেছে। যাচাই বাছাইয়ের জন্য কত সময় লাগার কথা? এবং কতজন লোকের সাক্ষ্য প্রয়োজন ? চাঁদ দেখার সংবাদ প্রদানের জন্য জাতীয় এবং জেলা পর্যায়ে সরকারের কোনো সেল কি সচল ছিলো ? বিচারিক সাক্ষ্যের জন্য ইসলামী বিধানে দু’জন স্বাক্ষী প্রয়োজন, কিন্তু চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে ঈমানদার ব্যক্তি হলে এমন একজনের স্বাক্ষ্যই যথেষ্ট। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : ‘‘ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, একজন মরুবাসী রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট চাঁদ দেখার স্বাক্ষ্য দিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ কথার সাক্ষ্য দাও যে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল’ লোকটি বললো হ্যা, তখন রাসূলুল্লাহ সা. সকলকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন’’। যাচাই বাছাই এবং সংবাদ সংগ্রহের জন্য সময় লেগেছে এমন যে বক্তব্যই সরকারের তরফে দেয়া হোক না কেন, তা মূলত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এ যুগে এমন বক্তব্য দায়িত্বহীন লোকদের জন্য মানায়। মূলত দেশের কোথাও যে ন্যূনতম সুশাসন নেই। কারো কোনো দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহিতা নেই, চাঁদ দেখা নিয়ে সরকারের অবহেলা, গাফলতি এবং কা-জ্ঞানহীন কর্মকা- তার প্রমাণ। বর্তমান ক্ষমতাসীন মহল ১৯৯৬-২০০০ মেয়াদে একবার এমনই কাজ করেছিলো। তখন তারা রাত বারোটায় ঘোষণা দিয়েছিলো চাঁদ দেখা গিয়েছে। সেই একই মহল আবার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই কাজ করলো। জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা সুশসান এবং জনগণের ম্যা-েট নিয়ে যদি রাস্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে তারা আসতো তবে আশা করা যায় জনগণকে তারা এভাবে ভোগান্তিতে ফেলতে পারতো না। চাঁদ দেখার সংবাদের এই বিভ্রন্তির কারণে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পরেছে, যারা চাঁদ রাতে কেনা কাটা করে তারা সমস্যায় পড়েছে, যারা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে- চাঁদ দেখার সংবাদ আসার পর বাড়িতে যাবে তারা বিড়ম্বনায় পড়েছে। অনেক মানুষ রাত এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে গিয়েছে, তারা ভোর রাতে সংবাদ পেয়েছে। এমনকি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে জানা গেল রিমোট এরিয়ায় বসবাসরত বেশ কিছু গ্রামীণ মানুষ সারা দেশে যখন মানুষ ঈদ উদযাপন করেছে, তারা সেদিন রোযা রেখেছে। এত কিছুর পরেও ধর্ম মন্ত্রীকে যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেন ‘এর দায়ভার কে নেবে?’ তিনি রেগে উত্তর দিলেন, জননণকে নিতে হবে। জনগণ তো স্ব-উদ্যোগে চাঁদ দেখার দায়িত্ব পালন করেছে। আপনারা তো সে কাজটি করেন নি। এমনকি জনগণের মধ্যে যারা চাঁদ দেখেছে তাঁদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহেরও চেষ্টা করেন নি। আবার জনগণকেই দায়ভার নিতে বলছেন। জনগণের সাথে সম্পর্কহীন সরকারের তরফেই যে এমন কথা মানায় তা তাদের বক্তব্যে স্পষ্টত বোঝা যায়। 

 ট্রেনের টিকেট কালোবাজারে : সড়ক পথের চেয়ে রেলপথে যাত্রা করতে অনেকেই স্বস্তি অনুভব করেন। সাধারণত স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে যে কোনো ছুটিতে রেল পথে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে দুই ঈদের ছুটিতে মানুষ তার আপন জনের সান্নিধ্যে গ্রামের দিকে যখন যাত্রা করেন তখনই ভিড় একটু বেশী হবে, হচ্ছে, এটাই স্বাভাবিক। রেলপথ মন্ত্রনালয় এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা যদিও বলেছেন, সবাই টিকেট পাবে, যতক্ষণ টিকেট থাকবে ততোক্ষণ টিকেট বিক্রি করা হবে। অনলাইনে টিকেট বিক্রির কথা থাকলেও অনলাইনে টিকেট প্রাপ্তি এবং টিকেট বিক্রির সার্ভারের সেবায় জনগণ কখনো খুব ভালো সেবা পেয়েছে বলে জানা নেই।  (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ