শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

সড়কে ২৬ হাজার মৃত্যু

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর গা-সওয়া হয়ে গেলেও জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন তা জনগণকে একই সাথে ভীত-আতংকিত ও স্তম্ভিতও করেছে। গত ১২ জুন বিএনপির একজন এমপির প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে তাদের দল ক্ষমতায় আসার পর থেকে চলতি বছর ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত ১০ বছরে ২৫ হাজার ৫২৬ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। এদের মধ্যে নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছে। এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ১৯ হাজার ৭৬৩ জন। 

মন্ত্রীর এই পরিসংখ্যানে তাই বলে সকল হতাহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। ওবায়দুল কাদের নিজেই জানিয়েছেন, তার দেয়া পরিসংখ্যানে শুধু সেইসব মানুষের তথ্য রয়েছে যাদের মৃত্যুর পর থানায় মামলা হয়েছে। অন্যদিকে এমন অনেক  দুর্ঘটনায়ও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং অনেকে আহত হয়েছে, যেসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ব্যাপারে মামলা করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্টরা আপসে নিষ্পত্তি করে নিয়েছে। এ কথাটাও মন্ত্রীই বলেছেন। 

এমপির অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সড়ক পথ, যানবাহন ও চালকদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা বিআরটিএ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট দুর্ঘটনার কয়েকটি কারণ নির্ধারণ করেছে। 

এতে দেখা গেছে, চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব, আইন অমান্য করার প্রবণতা এবং পুলিশ তথা সরকারের পক্ষ থেকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার কারণেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। পাশাপাশি রয়েছে ওভারলোডিং অর্থাৎ বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানো, ওভারটেকিং বা যে কোনো পন্থায় সামনের অন্য গাড়িকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ট্রাফিক সিগনাল না মানার মতো আরো কিছু কারণ। পথচারীসহ সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেনতাকেও একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিআরটিএ এবং বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট। তাছাড়া কোনো বিশ্রাম না নিয়ে এক নাগাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গাড়ি চালানোর কারণে চালকরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে বলেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, মাত্র ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যান সকল বিবেচনায় শুধু দুঃখজনক নয়, অগ্রহণযোগ্যও। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে সরকারের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতাই প্রাধান্যে এসেছে। সেই সাথে রয়েছে জনগণের স্বার্থে ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়টিও। কারণ, জনগণের জানমালের ব্যাপারে সরকার যদি ন্যূনতম দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিত তাহলে এত বেশি দুর্ঘটনা যেমন ঘটতো না তেমনি প্রাণ হারাতো না এত বিপুল সংখ্যক মানুষও। 

এ প্রসঙ্গে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর দুরবস্থার কথা বলতেই হবে। অতি সম্প্রতি কিছু কিছু অঞ্চলে কিছুটা উন্নতি হলেও দেশের প্রায় সব এলাকাতেই সড়ক-মহাসড়কগুলো এখনো এবড়োথেবড়ো এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়ই রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানা গেছে বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময়। এবারের ঈদে তুলনামূলকভাবে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কম ঘটেছে সত্য, কিন্তু বিভিন্নস্থানে এখনো যথারীতি মানুষকে মৃত্যুর শিকার হতে হয়েছে। এখনো মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। যেমন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যেদিন জাতীয় সংসদে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন সেদিনও নওগাঁয় গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেছে তিনজন ছাত্র। কুষ্টিয়া, গাজীপুরসহ পাঁচ জেলায় মৃত্যু ঘটেছে আরো ছয়জনের। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্যও রয়েছেন। তার মৃত্যু ঘটেছে গাজীপুরে।

অর্থাৎ দুর্ঘটনা এবং সড়কে মর্মান্তিক মৃত্যু একেবারেই বন্ধ হয়নি। আমরা মনে করি এবং একথা অতীতেও বহুবার বলা হয়েছে যে, সড়ক দুর্ঘটনা ও মানুষের মৃত্যু বন্ধ করার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে হলে সড়ক-মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করার ব্যবস্থা নিতেই হবে। অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন কেউ যাতে চালকের আসনে বসতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এবারের ঈদের সময়ও এমন অনেক চালককে পাওয়া গেছে, যাদের না আছে লাইসেন্স এবং না আছে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ। 

দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রয়েছে ত্রুটিযুক্ত যানবাহন। বলা দরকার, এসবই চলাচল করতে পারছে উৎকোচের বিনিময়ে। এই ঘুষ বা উৎকোচ কারা খায় এবং কাদের প্রশ্রয়ে ত্রুটিযুক্ত যানবাহন চলাচল করতে পারে এসব বিষয়ে নিশ্চয়ই নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। দুর্ঘটনা কমাতে চাইলে এ ধরনের কোনো যানবাহনকে রুট পারমিটসহ চলাচল করতে দেয়া যাবে না। এভাবে সব মিলিয়ে জনস্বার্থে ব্যবস্থা নেয়া হলেই সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে আসতে পারে বলে আমরা মনে করি। 

বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তেমন ব্যবস্থাই নেয়া দরকার। এই ব্যবস্থা  নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদী সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতেÑ যার মধ্যে বাস-ট্রাক ও লেগুনা-সিএনজি ধরনের হাল্কা যানবাহন তো বটেই, লঞ্চ ও স্টিমারসহ সব ধরনের নৌযানকেও অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণ শুধু আশ্বাস ও মিষ্টি কথা শুনতে চায় না। তারা কাজ দেখতে চায়। আমরা মনে করি, ১০ বছরে ২৬ হাজার তথা প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার মানুষের মৃত্যুর তাৎপর্য সম্পর্কে ক্ষমতাসীনরা অনুধাবন করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ