বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

খুলনায় শ্রমজীবী ও পথশিশুর ৮০ শতাংশই মাদকাসক্ত

খুলনা অফিস : খুলনা মহানগরীতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে, কিন্তু ঝুঁকি কমেনি। আর এসব শ্রমজীবী ও পথশিশুর আশি শতাংশই মাদকাসক্ত। বাকিরাও রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। কিন্তু কী পরিমাণ শিশু শ্রমিক রয়েছে খুলনায়, তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই সরকারি বা বেসরকারি সংস্থায়।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও শিশু শ্রমিকের সংখ্যা উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়ে গেছে। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে অল্প বয়সী এসব শিশু অমানবিক পরিশ্রমের সাথে যুক্ত হচ্ছে। কাজের ক্ষেত্রে দিন দিন তাদের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর আইন থাকলেও অর্থনৈতিক দূরবস্থা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে শিশুরা নানা শ্রমে নিয়োজিত হচ্ছে। নগরীতে পথশিশু, শ্রমজীবী শিশু নিয়ে কাজ করেন অনেক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা। কিন্তু নগরীতে কী পরিমাণ শিশু শ্রমিক রয়েছে বা পথশিশু রয়েছে তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে। 

এসব সংস্থাগুলো বলছে, পথশিশু এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের প্রায় ৮০ শতাংশই মাদকাসক্ত। এইসব শিশুরা ড্যান্ডি (সলিউশন জাতীয় আঠা পলিব্যাগে ভরে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে নেয়া এক জাতীয় নেশা) নামক নেশার সাথে যুক্ত হচ্ছে। আবার ভাঙ্গাড়ি টোকানো এবং এর সাথে যুক্ত শিশুদেরকে ব্যবসায়ীরাই ড্যান্ডি সরবরাহ করে থাকে। নগরীর হাদিস পার্কে কয়েকজন শ্রমজীবী পথশিশুকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। দলের মধ্যে ছিল পিরোজপুরের রাজিব। তার জন্মস্থান বলতে পারে না। বড় হয়েছে নতুন বাজার ওয়াপদা এলাকায় নানির কাছে। নানি খোঁজ নেয়না। মাঝে মাঝে দেখা হলে টাকা চায়। তাই আর তার কাছে যায় না রাজিব। 

রাজিব জানায়, আমি ভাঙ্গাড়ি টোকাই। কাকা (ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ী) আমারে টাকাও দেয় আবার ড্যান্ডিও দেয়। আগে এক দোকানে মাল দিতাম। সেখানে ড্যান্ডি খেতে দেয় না। ড্যান্ডি খাইলে গায়ে ব্যথা থাকে না। ভালই লাগে। কোনো স্কুলে যাই না। সবাই আমাদের দেখায়ে টাকা আয় করে। ক’দিন মাথায় হাত বুলায়। তারপর আর নেই।

পরিবর্তন খুলনার নির্বাহী পরিচালক এম নাজমুল আযম ডেভিড জানান, দারিদ্র্যের কারণেই মূলত শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না। দারিদ্র্য ছাড়াও জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষার অভাব, গণসচেতনতার অভাব, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, আইন প্রয়োগের অভাব, স্বল্প বেতনে শিশু শ্রমিকের সহজপ্রাপ্যতা, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক বিচ্ছেদ, কুসংস্কার, পরিবারের আকার বড়, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, শহরে বস্তির বিস্তার, পিতা-মাতার মৃত্যু/স্থায়ী অনুপস্থিতি প্রভৃতি শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ।

বেসরকারি সংস্থা জেজেএস’র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এমএম চিশতী জানান, বেসরকারি সংস্থাগুলো কিছু দিনের জন্য শিশুদের নিয়ে কাজ করে। সরকারিভাবে স্থায়ী কাজের পরিধি বাড়লে ভাল হতো। তাছাড়া কর্ম এলাকার মালিকরা আন্তরিক হলে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হয়তো কমবে। একথা সত্য যে, খুলনায় অনেক সংগঠন শিশুদের নিয়ে কাজ করলেও প্রকৃত শ্রমজীবী বা পথশিশুদের সংখ্যা কারো কাছে পাওয়া যাচ্ছে না। এসব শিশুদের নিয়ে আর দেরি করা ঠিক হবে না। কারণ এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ শিশুই মদকাসক্ত এবং দিন দিন এর সংখ্যা আরও বাড়ছে।

খুলনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক খান মোতাহার হোসেন জানান, খুলনায় কী পরিমাণ শিশু শ্রমিক, পথশিশু রয়েছে, তার তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে সমাজসেবা এইসব শিশুদের উন্নয়নের জন্য অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

শ্রমজীবী শিশুর তথ্য নেই কোনো দপ্তরে : খুলনা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কত সংখ্যক শিশু শ্রমে জড়িত বা পথশিশু রয়েছে, তা সমাজসেবা অধিদফতরসহ খুলনার কোনো দপ্তরের কাছে কোনো হিসেব নেই। ফলে এ বিষয়ে জরীপ করে সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং সরবরাহ করতে জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালকে উদ্যোগ নিতে বলেন সিটি মেয়র। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পরিবর্তন খুলনা ও সিএসএস’র আয়োজনে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় তিন বছর মেয়াদী প্রকল্পের অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এসব কথা বলেন।

সিএসএস’র পরিচালক (শিক্ষা) জেমস অজয় চৌধুরী’র সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত অবহিতকরণ সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন পরিবর্তন-খুলনার নির্বাহী পরিচালক নাজমুল আজম ডেভিড, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন সৈয়দ আলী হাফিজ, পবিত্র গীতা পাঠ করেন পূর্ণিমা রায়। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার এ হোসেন মোহাম্মদ এহসান শাহ, শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো. আরিফুল ইসলাম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর রাফেজা শাহীন এবং বক্তৃতা করেন সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক খান মোতাহার হোসেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ হাফিজুর রহমান, এডভোকেট মেমোরী সুফিয়া রহমান শুনু, শেখ মোহাম্মদ আলী, ইমাম হাসান চৌধুরী ময়না, মনিরুজ্জামান মনি, আলী আকবর টিপু, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. মনিরুজ্জামান, গোলাম মাওলা শানু, উন্নয়নকর্মী মোড়ল নূর মোহাম্মদ, হিরন্ময় ম-ল, ইসরাত আরা হিরা, সমাজকর্মী শেখ আশরাফুজ্জামান, শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন, সাংবাদিক আসাফুর রহমান কাজল প্রমুখ। সভায় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। প্রকল্পের বিস্তারিত উপস্থাপনা করেন সিএসএস’র পক্ষে মো. জহিরুল ইসলাম এবং পরিবর্তন খুলনার পক্ষে মো. আকবর হোসেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ