মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বায়ুদূষণ মানুষের জন্য বড় সমস্যা

এইচ এম আব্দুর রহিম : বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এক গবেষণায় জানা গেছে, ২০১৫ সালে বিভিন্ন প্রকার দূষণের শিকার হয়ে  সারা বিশ্বে ৯০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছে বাংলাদেশে। দূষণজনিত মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের প্রধান কারণ হলো বায়ুদূষণ। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলান্বিয়ার হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস এ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তারমধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
আর বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। মার্চ ২০১৯ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এয়ারভিজ্যুয়ালের ‘বিশ্ব বাতাসের মান প্রতিবেদন ২০১৮তে বলা হয়েছে, বিশ্বে সর্বাধিক বায়ুদূষণের কবলে থাকা রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এই শহরে বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পি এম (২.৫)পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাত্রার চাইতে প্রায় ১০ গুণ বেশি। একটি বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ আর ভারত ও চীনে মারা গেছে ১২ লাখ মানুষ। এ বায়ুদূষণের কারণে ২০১৭ সালের হিসাবে প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন বায়ুদূষণের কারণে মারা গেছে। সড়ক দুর্ঘটনা বা ধূমপানের কারণে মৃত্যুর হারের তুলনায় ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের ফলে বেশি মানুষ মারা গেছে।
এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এ বায়ুদূষণের শিকার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় প্রতিটি শিশুর ৩০ মাস করে আয়ু কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি, যদিও উন্নত দেশগুলোয় এই হার পাঁচ মাসের কম। ক্ষতিকারক পদার্থ বাতাসে মেশার ফলে বায়ুদূষণ হয়। শিল্প, যানবাহন, জনসংখ্যার বৃদ্ধি এবং নগরায়ন বায়ুদূষণের কয়েকটি কারণ। তবে বায়ুদূষণের বড় দুটি উপাদান হল, শিল্পকারখানার বর্জ্য ও যানবাহনের ধোঁয়া। নন-কমপ্লায়েন্স শিল্প ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে অধিকহারে দূষিত হয়। বাতাসে থাকা রাস্তাঘাট ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার ধুলিকণা, সালফার-ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, ওজোন, সাসপেনডেড পার্টিকুলার ম্যাটার, বাতাস দূষণের জন্য বহুলাংশে দায়ী। ইটভাটার ধোঁয়া এ ধরনের দূষণের আর একটি কারণ। নানা কারণে বায়ুদূষণ ঘটে, যার অনেকগুলোই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মরুভূমি অঞ্চলে ধুলোঝড় এবং অরণ্য বা ঘাসে আগুন লাগার ফলে নির্গত ধোঁয়া বাতাসে রাসায়নিক ও ধুলিকণাজনিত দূষণ ঘটিয়ে থাকে। পেট্রোল, ডিজেল এবং কাঠসহ নানাধরনের কার্বন-যুক্ত জ্বালানি আধপোড়া হলে কার্বন মনোক্সাইড রঙ বিহীন গন্ধবিহীন গ্যাস তৈরি হয়। সিগারেট পোড়ালেও এই গ্যাস বের হয়। এই গ্যাস আমাদের শরীরে অক্সিজেন গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এই গ্যাসের প্রতিক্রিয়ায় আমাদের প্রতিবর্ত ক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সব সময় ঝিমানোভাব আসে। বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতার শিকার হতে হয়। কয়লা, তেল প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনিং মেশিন থেকে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন গ্যাস নির্গত হয়।  বাতাসে এই গ্যাস নির্গত হওয়ার পরে স্ট্র্যাটেস্ফিয়ারে চলে যায়। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির বিকিরণ থেকে রক্ষা পাওয়ার স্বাভাবিক ক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় লেড বা সিসা লেড ব্যাটারি, পেট্রোল, ডিজেল, হেয়ারডাই, রঙ প্রভৃতি পণ্যে পাওয়া যায়। সিসা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের ক্ষতি করে থাকে। এটির প্রভাবে হজমের প্রক্রিয়া ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয়। কখন এর প্রভাবে ক্যানসারও হতে পারে।
ওজোন বায়ুমন্ডলের উচ্চস্তরে পাওয়া যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসের চাদর সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির বিকিরণ থেকে পৃথিবীকে বাঁচায়। কিন্তু মাটির কাছাকাছি এই গ্যাস অত্যন্ত বিষাক্ত ধরনের। মাটির কাছাকাছি যে ওজোন পাওয়া যায় তা মূলত কলকারখানা এবং মাটির কাছাকাছি যে ওজোন পাওয়া যায় তা মূলত কলকারখানা এবং যানবাহন থেকে নির্গত হয়। ওজোনের প্রভাবে চুলকানি হয়, জ্বালা করতে পারে। ওজোনের প্রভাবে ঠান্ডা লাগার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নাইট্রোজেন অক্সাইড প্রভাবে ধোঁয়াশা তৈরি হয় এবং এ্যসিড বৃষ্টি হয়। পেট্রোল, ডিজেল, কয়লার মতো জ্বালানি পোড়ানোর ফলে এই গ্যাস নির্গত হয়। নাইট্রোজেন অক্সাইডের প্রভাবে বাচ্চাদের শীতের সময় সর্দিকাশি হতে পারে। ধোঁয়া, ধুলো, বাষ্প এবং একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে বাতাসে ভেসে থাকা কঠিন বাংলাদেশে বেঁচে থাকা কঠিন পদার্থের কণা কে এসপি এম বলে। এটি বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। ধোঁয়াশা একটা অন্যমত কারণ এসপিএম। এসপি এম বেশি থাকলে দুরের জিনিস দেখার ক্ষেত্রে খুব অনুবিধা হয়। এই ধরনের পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা ফুসফুসে প্রবেশ করে শরীরের প্রধান অন্যতম প্রধান অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। মূলত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পোড়ানোর ফলে এই গ্যাস নির্গত হয় যেমন কাগজ উৎপাদন পদ্ধতিতে, ধাতু গলানোর ক্ষেত্রে ইত্যাদি। এই গ্যাস এ্যসিড বৃষ্টি এবং ধোঁয়াশা সৃষ্টির প্রধান কারণ। সালফার ডাইঅক্সডের প্রভাবে ফুসফুসের নানা ধরনের জটিল রোগ হয়। ইটভাটা থেকে নাইট্রোজেন, অক্সাইড ও সালফার-ডাই অক্সাইড এ্যজমা, হাঁপানি, এলার্জি সমস্যা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। বালুকণার মাধ্যমে ফুসফুসের নিকোসিস নামে রোগ সৃষ্টি হয়, যা ফুসফুসকে শক্ত করে দেয়। ই-কার্বন-মনো-অক্সাইড রক্তের সঙ্গে মিশে অক্সিজেন পরিবহনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হৃদরোগের ঝুঁকিবাড়ায়। এক গবেষণায় জানাগেছে, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা দায়ী ৫৮%, ডাস্ট ও সয়েল ডাস্ট ১৮%, যানবাহন ১০%, বায়োমাস পোড়ানো ৮% এবং অন্যান্য উৎস ৬% দায়ী।
 একজন সুস্থ স্বাভাবিক লোক গড়ে ২,০০,০০০ লিটার বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে থাকে। অনেকেই মনে করি, নরমাল বসবাসের রুমের চাইতে এসি করা রুম বায়ুদূষণমুক্ত। মোটেই ঠিক নয়। সাধারণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের বায়ুদূষণের পরিমাণ নরমাল বসবাসের রুমের বায়ুদূষণের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। কোন কোন ক্ষেত্রে একশ’গুণ বেশি হতে পারে। এসি করা রুমে হয়ত ঠান্ডাবাতাস পাচ্ছি, কিন্তু শুদ্ধ ঠান্ডাবাতাসের পরিবর্তে অধিকতর ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায়। তাই রুমে আলো আসা বা খোলা বাতাস পাওয়া বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশে শতকরা ৯০-৯৫ সরকারী বেসরকারী হাসপাতাল ক্লিনিকসমূহের রোগীদের বায়ুদূষণের মাধ্যমে সংক্রমিত না হওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নেই। দু:খজনক হলে ও সত্য যে হাসপাতালের রুমগুলো এয়ারটাইড করে এসি করা থাকে। বাতাস ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে রোগীদের আরোগ্য লাভের সময় বেশি লাগে। প্রায় শোনা যায় অপারেশন সাকসেস কিন্তু ইনফেকশনের কারনে রোগী মারা গেছেন। হাসপাতালের অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে দূষিত/সংক্রমিত বায়ু। ব্যকটোরিয়া, ভাইরাস, ধুলাবালি, পোলেন, প্যাথোজেন প্রভৃতি হাঁচি কাশির মাধ্যমে রোগ জীবাণু বাতাসে প্রায় ১৬০ ফুট পর্যন্ত প্রবাহিত হতে পারে। বাংলাদেশে অনেক ব্যয়বহুল হাসপাতাল নির্মিত হলেও কোন হাসপাতালের কক্ষসমূহের বায়ুদূষণমুক্ত করার ব্যবস্থা নেই। নেই কোন জীবাণু ধ্বংস করার কোনো ফিল্টারেশন। বাতাসের চাপ ও বেগ রক্ষাকরণ, ভেল্টিলেশন, বাতাস পরিবর্তন ও ফ্রেশবাতাস আনার কোন ব্যবস্থা নেই। যার কারণে অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ অধিক মাত্রায় বেশি। প্রতিবছর পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় জানা যায় যে, ঢাকা শহরে পরিবেশ দূষণের জন্য ইটভাটা দায়ী। ১০৪৮ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত স্ট্রোকের ওপর ৯৪টি গবেষণায় তথ্য রিভিউ করে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে উপনতি হর যে, উচ্চমাত্রায় বায়ুদূষণের আওতায় থাকা এবং স্ট্রোকের মাঝে সম্পর্ক বিদ্যমান।
আমেরিকায় যুদ্ধ ফেরত সেন্যদের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে, বায়ুদূষণের ফলে কিডনির কাজে বাঁধা পড়ে। কিডনির রোগ হয় এমনকি কিডনি ফেইলিওর পর্যন্ত হতে পারে। কম পরিমাণে বায়ুদূষণ ও কিডনিকে প্রভাবিত করতে পারে। আর দূষণ বাড়তে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে। শুধু যে শরীরের উপরেই বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তা কিন্তু নয়। বায়ুদূষণে মানুষিক সমস্যা বাড়ায়। আমেরিকায় ৬ হাজার মানুষের তথ্য নেয়া হয়। দেখা যায় বায়ুদূষণের পরিমাণ বেশি হয়, তাদের হতাশা, বিষাদ, অস্থিরতা অন্যন্য নেতিবাচক অনুভূতির প্রকোপ তত বেশি। আমেরিকান হার্ট এ্যসোসিয়েশন থেকে জানা যায়, দূষিত বায়ুতে শ্বাস নেয়ার ফলে হতে পারে হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন রোগ। এ্যালকোহল, কফি, যেভাবে হার্ট এ্যটাকের জন্য দায়ী, বায়ুদূষণ ও সেভাবে দায়ী।
শতাংশ হার্ট এ্যটাকের জন্য বায়ুদূষণকে দায়ী করা হয়, এটা গবেষকদেকদের গবেষণায় পাওয়া গেছে। দূষিত বায়ুর কারণে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এ থেকে ক্যান্সার হতে পারে। মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। বায়ুদূষণের ফলে শুধু স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় না, পরিবেশ ও সম্পদ নষ্ট হয়। বায়ু মনে আলোর ওজন স্তর পাতলা হয়ে যায়। ফলে এর প্রভাব পড়ে জলবায়ুর উপর এবং তা বিশ্বব্যাপি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাড়ায়। বর্তমাণে বায়ুদূষণের বিষয়টিতে বিশ্বে সকল শ্রেণীর পেশা, ধনী গরিব সবাই সমাহারে আক্রান্ত হওয়ায় সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সকলেই বুঝতে শিখেছে বায়ুদূষণ একটিভয়াবহ আতংক। তবু ও জনমনে সচেতনতার পর্যায়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অবধি পৌঁছাতে পারেনি। তাই বায়ুদূষণের বিষয়টি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাসহ বাযুদূষণ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারে সর্বসাধারণের ব্যাপক ভূমিকা পালন করা সময়ের দাবী।
বাংলাদেশে পরিবেশগত দূষণ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, প্রতি বছর, শুধু ঢাকায়ই এক বছরে ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটে। সারা দেশে শহরাঞ্চলে মারা যায় ৮০ হাজার মানুষ। বিশ্ব ব্যাংকের এই জরিপ করা হয় ২০১৫ সালে। তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে যা ২০১৮ সালে প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব ব্যাংকের এক রিপোর্টে প্রকাশ-বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণে বছরে ক্ষতি ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৭ শতাংশ। শুধু বায়ুদূষণে ক্ষতি হয় ২০ হাজার কোটি টাকা। দূষণের সব চাইতে বেশি শিকার হয় শিশুরা। এখন বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন চলছে। সে সংক্রান্ত আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত পরিবেশ নিয়ে পৃথিবীর মানুষকে সর্তক করেছে। পরিবেশের অবনতির কারণে বিশ্ব ব্যাপি আবহাওয়া পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তন মানবজাতির প্রতিকূলে যাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দিকে চলেছে। প্রতিটি দেশ যদি নিজ নিজ জণপদের পরিবেশের বিপর্যয় রুখতে এগিয়ে আসে তবে হয়ত রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। পরিবেশগত সমস্যায় তৃতীয় বিশ্বের লোকজন বেশি দুর্যোগের মুখে। অথচ বাংলাদেশ সহ এসব দেশের ক্ষমতাসীনদের পরিবেশ নিয়ে তেমন মাথা ব্যাথা নেই। পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইপি এ তার সর্ব শেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশ্বের দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান উপরে। বিশ্বের দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান উপরে। বিশ্বের কোন শহর স্থাপনার ক্ষেত্রে, কোনটা আবার বৃক্ষ বাজলাভূমির জন্য বিখ্যাত হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণের জন্য এখন আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ইপিএ’র সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বের সব চেয়ে দূষিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। সংস্থাটি বিশ্বের ১৮০টি দেশের সামগ্রিকভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় কী ধরনের ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে একটি সুচক তৈরি করেছে। তাতে বাংলাদেশ ১৭৯তম স্থানে নেমে এসেছে।
২০০৬ সালে সর্ব প্রথম এই সুচক তৈরি করা হয়ে ছিল। সে বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫তম। অর্থাৎ গত এক যুগে দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৫৪ ধাপ নিচে নেমেছে। এই ক্রমাবনতি ঘটছে, তা নিয়ে চিন্তা করার কেউ নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প থেকে দেশের আটটি শহরের বায়ুর মান প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়। দুই দিন ধরে ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী। তাতে দুইমাস ধরে ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা শহরের বায়ুর মান মারাত্মক ও খুব অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চি‎ি‎হ্নত হয়েছে। এর মধ্যে দূষিত বায়ুর শহর হল ঢাকা। এরপর রয়েছে রাজশাহী। বরিশাল খুব কম দূষিত হলে ও এর বায়ুর মান গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে খারাপ অর্থাৎ আশঙ্কাজনক। ২০১৬ সালের পরিবেশ অধিদপ্তরের কেইস প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বায়ুদূষণ উৎস্য ও ধরন নিয়ে একটি জরিপ হয়েছে। সেই জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার চার পাশে প্রায় এক হাজার ইটভাটায় ইট তৈরি হয়। এসব ইট ভাটা দূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী। জানা গেছে, বিশ্ব ব্যাংকের ঋণের টাকায় সরকার ঢাকার পরিবেশ উন্নয়নের কাজে ব্যয় না করে পরিবেশ অধিদফতরের বহুতল ভবন, সড়কে উন্নতমানের ফুটওভার ব্রিজ তৈরি করেছে। প্রতিটি দেশের রাজধানীর একটি গুরুত্ব রয়েছে। একে পরিবেশ বান্ধব রাখা, নির্মল বায়ুর প্রবাহের জন্য প্রচুরগাছপালা রোপণ করা হয়। অথচ বাংলাদেশের রাজধানি ঢাকার বায়ু নির্মল করার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে তা আঁচ করা যায় না। অতি সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে সবচেয়ে বায়ুদূষণের কবলে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭তম। আর রাজধানীগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এই শহরে বাতাসের ক্ষুদ্রবস্তু কণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেয়া মাত্রার চেয়ে দশগুণ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এয়ারভিজ্যুয়ালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বায়ুদূষণের বিশ্বের ৭৩টি দেশের বিভিন্ন শহরের ২০১৮ সালের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৭তম হলে ও রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় এটি দ্বিতীয়। এ ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ভারতের নয়াদিল্লি। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার গড় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। অথচ ঢাকার বাতাসে কণিকার মাত্রা ২০১৮ সালে ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৯৭ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম।
আরো জানা গেছে, গত ১০ বছরে ঢাকার বাতাস আরা অস্বাস্থ্যকর হয়েউঠেছে। বেঁচে থাকার জন্য মানুষের অক্সিজেন দরকার। সে অক্সিজেন যদি বিশুদ্ধ না হয় তাহলে বিভিন্ন রোগ ব্যাধি দেখা দেয়। হাঁপানি, ফুসফুসে ক্যান্সারের জন্য দায়ী করা হয়। ঢাকার বায়ুতে ভয়াবহ দূষণ পাওয়া গেছে। এটা নি:সন্দেহে রাজধানীবাসীদের জন্য দু:সংবাদ। বিভিন্ন সূত্রে জানা, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দিন দিন নগরবাসীর স্বাস্থ্য বিপর্যয় বেড়ে চলেছে। হেলথ ইফেক্টর ইনস্টিউটের তথ্য মতে, বাংলাদেশে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুবরণ করে, দূষিত বায়ুর কারণে পৃথিবীতে ৩৬ শতাংশ ফুসফুসে ক্যান্সার, ৩৪ শতাংশ স্ট্রোক ও ২৭ শতাংশ হৃদরোগের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী মনে করা হয়। এমন বায়ু মানুষের দীর্ঘ জীবন লাভের প্রতিবন্ধকতা ঘুচিয়ে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ