শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ওদের স্বাধীনতা নেই, নেই ঈদও

সময় বহিয়া যায়। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। তবে কাজ থেমে থাকে না এক জায়গায়, কাজ কাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় অর্থাৎ আজকের কাজটি কাল অন্য মাত্রায় অন্য জায়গায় পৌঁছতে চায়। এটাকে আমরা কাজের ধারাবাহিকতা বলতে পারি, বলতে পারি কাজের বিকাশ কিংবা পরিণতি। আরবি মাসের হিসেবে আমরা এখন অবস্থান করছি শাওয়ালে। এর আগের মাসটি ছিল রমজান। রমজানে আমরা পালন করেছি সিয়াম। সিয়াম শেষে এই শাওয়ালের প্রথম দিনেই আমরা উদযাপন করেছি পবিত্র ঈদ। এখন ভাবতে হয়, রমজানের সিয়াম আমাদের কী বার্তা দিয়ে গেল, আর ঈদ কি শুধুই আনন্দে ভেসে যাওয়ার দিন- নাকি ঈদের আনন্দের মধ্যেও রয়েছে উন্নত ও মানবিক কোনো বার্তা। বছরের বাকি মাসগুলোতেও কি সিয়াম ও ঈদের সৌরভ প্রবাহমান থাকা সঙ্গত কিংবা যৌক্তিক? ভাবতে গেলে এই বিষয়গুলো আমাদের চেতনার জগতকে নাড়া দেয়।
সিয়াম বলি, ঈদ বলি- এগুলো আমাদের ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপার, আবার সংস্কৃতির বিষয়ও বটে। মানুষের বোধবিশ্বাস যখন আচরণের মাধ্যমে রূপময় হয়ে ওঠে, তখন তা সংস্কৃতির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। রমজানে সিয়ামের বিষয়টা আসলে কী? শুধুই উপবাস থাকা, নাকি উপবাসের বিধান পালনের মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের ঐকান্তিকতায় নিজেকে বান্দা হিসেবে প্রমাণ করা? এই বিষয়টিকেই আমরা আরবীতে বলে থাকি ‘তাকওয়া’। এই তাকওয়ার চেতনায় সমৃদ্ধ হলে আমাদের পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, বিনোদন-সংস্কৃতি আরো অর্থবহ ও মানবিক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই জায়গায় আমাদের দারিদ্র্য রয়েছে।
মানুষ হিসেবে এই দারিদ্র্য দূর করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। তাকওয়ার চেতনায় সমৃদ্ধ না হলে কোনো ক্ষেত্রেই আমরা কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হবো না। তাই ঈদের মাস শাওয়ালে সিয়ামের লক্ষ্য ও ঈদের তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের পুনঃপাঠ প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে আমাদের দারিদ্র্য বিশেষভাবে উপলব্ধি করা যায় টিভির ঈদ অনুষ্ঠানগুলোতে। সিয়াম ও ঈদের বার্তার সাথে ওগুলোর কোনো সম্পর্ক আছে কী?
পত্র-পত্রিকায় এবং টিভি চ্যানেলে ঈদ নিয়ে অনেক খবরাখবর প্রচারিত হয়েছে। ঈদ নিয়ে ফিচারধর্মী লেখা এখনও মুদ্রিত হচ্ছে। কিন্তু এবার পহেলা শাওয়ালে ফিলিস্তিনীরা ঈদ করেছে কিনা কিংবা তাদের ঈদ পালনের চিত্রটা কেমন ছিল- তা বোধ হয় বিশ্ববাসীর জানার মতো একটা বিষয় হতে পারে। কিন্তু বর্তমান ভ্রষ্ট সভ্যতায় তেমন মানবিকবোধ ক’জনার মধ্যে অবশিষ্ট আছে? তবে ফিলিস্তিনীদের ঈদ প্রসঙ্গে ফিলিস্তিনী নেতা মাহমুদ আব্বাস যে বক্তব্য রেখেছেন, তা আমাদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম মিডলইস্ট মনিটর জানিয়েছে, বুধবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, কেবল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলেই ফিলিস্তিনীদের কাছে ঈদের পরিপূর্ণ আনন্দ ফিরে আসবে। এ ছাড়া স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন মাহমুদ আব্বাস। ভাবতে অবাক লাগে, ইহুদীরা উড়ে এসে জুড়ে বসে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন করে ফেললো বৃহৎ অপশক্তির সহযোগিতায়, আর ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনীরা এখনও নিজ ভূমিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে পারলো না বৃহৎ শক্তিগুলোর বাধায়। ফলে এখনও তাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ফরিয়াদ জানাতে হচ্ছে মহান আল্লাহর দরবারে।
বেশ কিছুদিন ধরেই ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনীদের সংকট নিরসনে একটি প্রস্তাব হাজির করার তোরজোর চলছে। তবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনীরা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন রেখেছে। আগামী ২৫ ও ২৬ জুন বাহরাইনের রাজধানী মানামায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি সম্মেলনে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত সেই চুক্তির প্রথম অংশ প্রকাশের কথা রয়েছে। এই চুক্তি মানতে ফিলিস্তিনীদের বাধ্য করার প্রচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ এসেছে সংবাদ মাধ্যমে। সেই ধারাবাহিকতায় মানামা সম্মেলনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষ।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলছে, জনগণের অধিকার চিরতরে নির্মূল করার জন্য আমেরিকা ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ বা কথিত ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ নামক পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এটি কখনো ফিলিস্তিনীদের কল্যাণ বয়ে আনবে না। তবে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশ এই পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথিত শান্তি পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা তৈরি করেছেন তা শেষ পর্যন্ত জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। মাহমুদ আব্বাস আরও বলেছিলেন, আমি আশা করছি ঈদুল ফিতরের আগেই ফিলিস্তিনী জনগণ তাদের দেশকে ইসরাইলের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করবে এবং জেরুসালেমকে রাজধানী করে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা জানি, এমনটি হলেই ফিলিস্তিনীদের ঈদ পূর্ণতা পাবে। ফিলিস্তিনীদের স্বাধীন রাষ্ট্রের আকাঙ্খা যে কোন বিবেচনায় যৌক্তিক, সঙ্গত এবং অনিবার্য। এখন দেখার বিষয় হলো, বর্তমান সভ্যতা পাপ মোচনে কতটা অগ্রসর হয়।
নিজ ভূমিতে ভূমিপুত্ররা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করছে! তাদের ওপর আগ্রাসন চালাচ্ছে উড়ে এসে জুড়ে বসা ইহুদীরা। ইসরাইল আসলে বেপরোয়াভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাতে পারছে বর্তমান সভ্যতার চ্যাম্পিয়নদের ভ্রষ্টনীতি ও ঔদ্ধত্যের কারণে। ইসরাইলী সেনারা ফিলিস্তিনী বসতিতে হামলা চালাচ্ছে, চালাচ্ছে হত্যাযজ্ঞও। তারা স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনী নর-নারী ও শিশু-কিশোরদের বন্দী করছে, নির্যাতন চালাচ্ছে কারাগারে। বিশ্বের গণমাধ্যমে কখনো কখনো ওইসব নির্যাতন ও নৃশংসতার খবর প্রচারিত হয়। তখন সভ্যতার শাসকদের যেন ঘুম ভাঙে। তাদের মুখ থেকে দু’চারটি সুবচন উচ্চারিত হয়। তারপর আর কোনো অগ্রগতি হয় না। ফলে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটির ঔদ্ধত্য ও আগ্রাসনের মাত্রা বাড়তেই থাকে। তেলআবিবের বদলে তারা এখন ফিলিস্তিনী শহর জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বানাতে চাচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই আবদারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ সবাই জানে, ফিলিস্তিনীরা বহু আগেই তাদের প্রিয় ও পবিত্র শহর জেরুসালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে স্থির করে রেখেছে। ফলে বর্তমান সময়ে এই রাজধানী-দ্বন্দ্ব ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরাইলী নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমান সভ্যতা যেন ফিলিস্তিনীদের গ্রেফতার, নির্যাতন ও বন্দী রাখার ব্যাপারে ইসরাইলকে ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে। ফলে যাচ্ছেতাইভাবে ফিলিস্তিনী নাগরিকদের গ্রেফতার ও বন্দী করে চলেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। আর এই শাওয়াল মাসে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসরাইলের কারাগারে বন্দী শত-সহস্র ফিলিস্তিনী শিশু-কিশোর ও যুবককে এবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে দেয়নি দেশটির কারা-কর্তৃপক্ষ। মিডলইস্ট মনিটর-এর খবরে আরো উল্লেখ করা হয় যে, ঈদের সময় কারাগারে বন্দীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তারা। এমন ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের কারাগার বিষয়ক কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল কাদরি আবু বকর। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনী বন্দীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলেছে। ক্রমাগত অত্যাচার-নির্যাতন তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমনকি ফিলিস্তিনের মুসলিম বন্দীদেরকে এবার তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরও উদযাপন করতে দেয়া হয়নি।
মিডলইস্ট মনিটর-এর খবরে আরো উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন কারাগারে ফিলিস্তিনী বন্দীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে রুটিন মাফিক নির্যাতন করা হচ্ছে। কারাবন্দীরা যাতে স্থিরভাবে জীবনযাপন করতে না পারে সে জন্য তাদেরকে ঘন ঘন বিভিন্ন জেলে স্থানান্তর করা হচ্ছে। আর এবার ঈদুল ফিতর উদযাপনে ইসরাইলী কারা-কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা আগের সব বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। আসলে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটি তো প্রায় প্রতিদিনই ফিলিস্তিনীদের ওপর বর্বর আচরণের নতুন নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে। এতে কি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সড়ক প্রশস্ত হচ্ছে? সভ্যতার শাসকদের কাছে কি এর কোনো জবাব আছে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ