শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

সীমান্তে হত্যা-নির্যাতন

ভারত আমাদের বন্ধু ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র। কিন্তু বহুল আলোচিত সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। দু’দেশের সীমান্তে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর মধ্যে ঘন ঘন পতাকা বৈঠক এবং বিজিবি ও বিএসএফ-এর নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বরং বাংলাদেশিদের হত্যাকান্ড ঘটেই চলেছে। বাংলাদেশের নাগরিকরা অপহরণেরও শিকার হচ্ছে। গতকাল দৈনিক  সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের ৪ জুন পর্যন্ত বিএসএফ-এর গুলিতে অন্তত ১৪ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছে। বিগত বছর ২০১৮ সালেও মৃত্যু ঘটেছে ১৬ জন বাংলাদেশির।
উইকিপিডিয়ার পরিসংখ্যান উল্লেখ করে দৈনিক সংগ্রাম তার একই রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ।  ভারতীয় এই বাহিনীর নৃশংসতা সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে লন্ডনের দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি হত্যার ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। প্রায় সকল ঘটনায় ঠান্ডা মাথায় হত্যার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কোনো একটি হত্যার জন্যই বিএসএফসহ ভারতীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ পর্যন্ত আনা হয়নি। কাউকে শাস্তিও দেয়া হয়নি। কোনো কোনো হত্যার ঘটনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ তথা বিজিবির পক্ষ থেকে স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ জানানো হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায় তথা সরকারের নীরবতার কারণে হত্যা-নির্যাতন শুধু অব্যাহত নেই, অতীতের তুলনায় অনেক বেড়েও চলেছে। বিষয়টি নিয়ে বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে একই সঙ্গে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিজিবির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নাকি এই মর্মে অভিমত প্রকাশ করেন যে, সীমান্তের শূন্য রেখা বা দুইশ গজের মধ্যে কাউকে হত্যা করলে তাকেই শুধু হত্যাকান্ড বলা যাবে। কেউ যদি ভারতের অনেক ভেতরে গিয়ে গুলিতে বা পিটুনিতে নিহত হয় তবে সেটাকে সাধারণ হত্যাকান্ড বলতে হবে। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, মূলত বিজিবির এ ধরনের মনোভাবের সুযোগ নিয়েই বিএসএফ তার হত্যার অভিযানকে ক্রমাগত আরো মারাত্মক করে চলেছে।
আমরা বিএসএফ-এর এই হত্যা ও নির্যাতনের অভিযানকে চলমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের খেলাফ মনে করি। তিক্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা দরকার, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয়রা ক্রমাগত আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির শর্ত তো বটেই, কূটনীতি ও স্বাভাবিক সুবিচারের সীমানা মানছে না তারা।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যার প্রসঙ্গ ওঠানো হয়ে থাকে। কারণ, ক’দিন পর পরই বিএসএফ কোনো না কোনো সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা করছে। কোনো পরিসংখ্যান থেকেই অন্তত একথা বলা সম্ভব নয় যে, বিএসএফ বাংলাদেশিদের হত্যার কর্মকান্ড বন্ধ করেছে। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে এমনও জানা গেছে, প্রতি বছর গড়ে ১২৫ জনের বেশি বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ। তাছাড়া অসংখ্য বাংলাদেশি বিএসএফের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, বিএসএফ বহু বাংলাদেশিকে অপহরণ করেও নিয়ে যাচ্ছে- যাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তথ্যটি হলো, কোনো ভারতীয় বিজিবির গুলিতে মারা গেছে- এমন দাবি কিন্তু খোদ বিএসএফও কখনো করতে পারেনি। কারণ, বিএসএফ-এর মতো বিজিবি নিরীহ ভারতীয়দের হত্যা করে না।
আমরা মনে করি, সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে সাবেক বিডিআর এবং বর্তমান বিজিবির এ ধরনের নীতি-কৌশল ও মনোভাব সমর্থনযোগ্য নয়। বিজিবিকে অবশ্যই নিরস্ত্র ও নিরীহ বাংলাদেশিদের জীবন রক্ষায় বলিষ্ঠ ও আইনানুগ ভূমিকা পালন করতে হবে। কূটনৈতিক পন্থার পাশাপাশি সম্ভাব্য অন্যান্য পদক্ষেপের মাধ্যমে এমন অবস্থা নিশ্চিত করা দরকার বিএসএফ যাতে আর কোনো বাংলাদেশিকে হত্যা করতে এবং হত্যা করে বিনাবিচারে পার পেতে না পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তকে যাতে আর কখনো দক্ষিণ এশিয়ার ‘প্রধান হত্যার ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত না করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ