বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পাবনায় বনাঞ্চলের জন্য জমি আছে বনাঞ্চল নেই ॥ দেখভালও নেই

মিনহাদুজ্জামান ফারুখ, পাবনা : বনাঞ্চলের জমি আছে; কিন্তু পাবনায় বনাঞ্চল নেই। বনসৃজনের দাবিও  জোরালো হয় না।  দেখভালও নেই।  কৈফিয়তের জায়গাও নেই। প্রতি বছর জাঁকজমকভাবে বৃক্ষমেলাও হয় ঘটা করে। কিন্তু ফল হয় কতটুকু। তা দেখবার যেন কেওই নেই। অথচ জেলায় প্রায় ৬২ হাজার বিঘা খাসজমি রয়েছে। এখনও অনেক খাস জমি সনাক্ত ও বন্দোবস্তের অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে। জেলাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে কেবল কিছু গাছের চারা বিতরণ করে সামাজিক বন সৃজন করা হয়। এছাড়া আর কোন জোরালো প্রচেষ্টা নেই। দুর্ভাগ্যজনক  ভৌগলিক অবস্থার কারণে বন্যা ও খরা লেগেই থাকে। ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স বলতে যা বোঝায় তা এ জেলায় নেই। এ কারণে চিরকালই গড়িমসি ভাব পরিলক্ষিত হয়। রাজনীতিকদের সদিচ্ছার অভাব এবং বন বিভাগের পুরো আগ্রহ না থাকায় আজও বনভূমি সৃজন করা হয়নি এখানে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। এছাড়া অর্পিত জমি আছে প্রায় ২ হাজার বিঘা। তবুও উদ্যোগ নেই। ধুরন্ধর প্রকৃতির কিছু মানুষ অবাধে ভোগ করছে এসকল খাস কৃষি জমি। পাবনায় বাড়ছে গড় বৃষ্টিপাত। ঘটছে দুর্যোগ। ঘূর্ণিঝড়। হচ্ছে ফসল চক্রের পরিবর্তন। বননীতি ঘোষণার ১২২ বছর পেরিয়ে গেল তবু বনাঞ্চল গড়া হল না। পরিবেশ সচেতনতার বাস্তবায়ন আচরণে দেখা যায় না। অথচ জেলায় জনসংখ্যার চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। শহরমুখি জনপ্রবাহ প্রসারিত করছে পৌর এলাকা। শহরে বৃক্ষসারির বাড় বাড়ন্তর পরিবর্তে নজরে পড়ে কংক্রিটের বাড়াবাড়ি। চারপাশে কেবলই বহুতল ভবন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। শহরে যেটুকু সবুজের চিহ্ন ছিল তাও মুছে যাচ্ছে। পানি ভরা মেঘকে আকর্ষণ করার যে সহজাত ক্ষমতা গাছপালার আছে তা কেউ আর মানতে চাইছেন না। তেমন গুরুত্ব নেই চারা রক্ষণা বেক্ষণেও। করা হয়নি বন গবেষণা। নদী অববাহিকায় বনসৃজন সম্ভব কিনা তাও দেখা হয়নি খতিয়ে। অথচ বছর বছর পালন করা হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিজ্ঞানীরা বলেন, বন বৃষ্টিপাতের সহায়ক। আকর্ষণ করে মেঘকে। তীব্রতা কমায় আবহাওয়ার। বনাঞ্চল থাকলে ভূমিক্ষয় কম হয়। কারণ বৃষ্টির ফোঁটা গুলো মেঘ থেকে ঝরে পড়ার সময় মাধ্যকষর্ণের ফলে যে বেগ সংগ্রহ করে তা গাছের পাতা ও ডালে বাধা পায়। গাছ না থাকলে বৃষ্টির চাপে মাটি আলগা হয়ে যায়। ধুয়ে যায় সার পদার্থ। বন বিভাগ কেবল গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। পশু পাখির খাদ্য হিসেবে বট ও ডুমুর গাছ তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য। এদিকে পুস্টি অভাবে ফরিদপুর উপজেলা ও ভাঙ্গুড়ায় তৃণভূমির আংশিক হলুদ হয়ে পড়ছে। গৃহপালিত প্রাণীর চারণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত ভূমি রয়েছে অবহেলায়। বেড়ায় তৃণ জাতীয় উদ্ভিদ চাষের গতি মন্থর। সব মিলিয়ে কাজ চলছে দায়সারা গোছের। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় থেকে থেকে অনুষ্ঠিত হয় সভা-সেমিনার ও কর্মশালা। বনের প্রয়োজন  সম্বন্ধে ক্রমাগত সবাই সচেতন। খেজুর এবং নারিকেল গাছ নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে তার পরেও কোনও কর্মসূচী নেই। অসময়ে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া এবং অনাবৃষ্টি রোধে বনের বিকল্প হয় না। পরিবেশের পাঁচটি উপাদানের মধ্যে একটি হল বন। এজেলায় বন না থাকার কারণে ভূগর্ভে পানি জমতে পারছে না। একারণে অগভীর নদীগুলোয় প্লাবনের আশংকা জিইয়ে থাকে। কেবল থাকে না নদীতে সারা বছর পানির নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ। আজ পর্যন্ত বনাঞ্চল গড়ার কোন চেষ্টা করা হয়নি তবে বৃক্ষরোপণ করা হয়। তাই খরা ও বন্যা এ জেলার বছর ওয়ারি চিত্র। ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স বলতে যা বোঝায় পাবনায় তা নেই। সামাজিক বন বিভাগ কেবল নিজস্ব নার্সারি থেকে বছর বছর চারা বিতরণ, ও রাস্তার দুধারে গাছ লাগিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে থাকছে। জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ১৫ একর জমির ওপর নার্সারি স্থাপন করে নাম মাত্র দামে চারা বিক্রি করে থাকে।
অবশ্য ফরেষ্ট্রি সেক্টর প্রকল্পের আওতায় হাজার খানেক নারী ও পুরুষ প্রশিক্ষিত হয়েছে। ১৯৯৩ সালে বন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় যা ১৯৯৫ সালে অনুমোদিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ২০১৫ সালে মধ্যে দেশের মোট ভূমির শতকরা ২০ ভাগ বনায়নের আওতায় আনা। এযাবত কালে সামাজিক বন বিভাগ পাবনার অধীনে নার্সারি ভূমির পরিমাণ মাত্র এক দশমিক ৯১ একর। সেখানে সিরাজগঞ্জে ২৪ দশমিক ০৩১ একর। এজেলায় ফলজ বৃক্ষ চারা রোপণে যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয় তার বেশি দেয়া হয় বনজ বৃক্ষে। অথচ পাবনায় বন নেই। বনাঞ্চল সৃষ্টির তেমন জায়গাও নেই বলে বনবিভাগ জানায়। উপজেলা পর্যায়ে শোভা বর্ধনের জন্যে বকুল, চাম্পা, নাগেশ্বর, কামিনী, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, আমলকি, ছাতিম, দেবদারু প্রভৃতি চারা রোপিত হচ্ছে। যতেœর অভাবে সেসব মারা যায়। অবশ্য আবহাওয়া মন্ডলে কার্বনডাই অক্সাইড নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ঘাসের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৃহত্তর পাবনার তৃণভূমি প্রচুর পরিমাণ কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং বাতাসে গ্যাসটির মাত্রা কমায় নিশ্চয়। এখানে বিষয়টি গবেষণার।
পাবনায় বনাঞ্চল গড়ে ওঠেনি কেন? এ প্রশ্নের জবাবে সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ খান বলেছিলেন, এ জেলায় মোট ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিভিন্ন চারা রোপণ করা হবে। এর মধ্যে বাঁধ এলাকা রয়েছে পাঁচ কিলোমিটার এবং সংযোগ সড়ক পাঁচ কিলোমিটার। আকাশমনি সহ বিভিন্ন চারা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে খেজুর চারা নেই। এক কিলোমিটার এলাকায় এক হাজার চারা রোপণ করা যায়। বন তৈরির উদ্যোগ নেই কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, জায়গার পাশাপাশি অর্থ বরাদ্দ দরকার। বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে পারলে বন তৈরি সম্ভব হবে। বনাঞ্চল গড়ে তোলার জন্যে যে জমি প্রয়োজন, তা এ জেলায় নেই। খাস জমি আছে বটে, তা অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা বেড়া ও সুজানগর উপজেলা এলাকায় (মুজিব বাঁধসহ) অসংখ্য বাগান গড়ে তুলেছি। দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। জেলায় সামাজিকভাবে সরল বাগান গড়ে উঠছে। এতে সংশি¬ষ্ট উপকার ভোগীদের সংখ্যাও বাড়ছে। এছাড়া প্রান্তিক ভূমিতেও বাগান গড়া হচ্ছে। বন বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে গত (২০১৩) বছর জেলায় প্রতিষ্ঠান বনায়ন কর্মসূচীর আওতায় ৪ হাজার চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। জেলায় পর্যাপ্ত বৃক্ষ সম্পদ না থাকায় পরিবেশ হয়ে আছে ভারসাম্যহীন। বাড়ছে তাপমাত্রা।
গত বছর ২১ মে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ঈশ্বরদীতে। ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখানকার রেল শহরে তাপমাত্রা আরও বেড়ে দাঁড়ায়। চলে তীব্র দাবদাহ। এ জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা আছে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একটা গাছ মানে অনেক রকম দহনের উৎস। তার বীজ থেকে ছাল-বাকল, ইস্তক বাণিজ্যিক নিয়মে বাধা। গাছ হলো নিরামিশ পানীয় খাদ্য। আসবাবপত্র, ঘর-বাড়ি, বাগান, প্যাকিং বাক্স, দেশলাই, রং আঠা, তেল, ভেষজ, ওষুধ, ধুপ, ধুনো, রঞ্জন, অক্সিজেন আরও কত কী। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, জেলায় মোট ১৪০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। জাতীয় বননীতি অনুযায়ী মোট ভৌগলিক আয়তনের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ বনাঞ্চল থাকা উচিত। সেখানে পাবনায় বন নেই। তাই ভূমি ক্ষয়, ভুগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া ও জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। গাছ মানুষের অশেষ উপকার করে। সৌন্দর্য বাড়াতে পলাশ, দেবদারু, বকুল, কাঞ্চন, নাগেশ্বর, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, চাম্পাফুল, ঝাউ, রাজকরই এসব কিছুই লাগানো হয়নি শহরে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে গাছ লাগানোর সুযোগ এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। জেলায় প্রায় ৬২ হাজার একর খাস জমি রয়েছে। এ সকল জমিতে বনাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব কিনা তারও কোন গবেষণা করা হয়নি। বৃক্ষছায়া এলাকায় বৃষ্টিপাতের মাত্রা যেমন বাড়ায় তেমনি তাপ নিয়ন্ত্রণেও তার সক্ষমতা রয়েছে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলেন, ৫০ থেকে ৫শ মিটার পরিমাণ একফালি বনাঞ্চল ৩ ডিগ্রি থেকে ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট উত্তাপ কমাবার ক্ষমতা রাখে। ইতিহাসে পাওয়া যায়, এ দেশে ১৮৫৫ সালে চার্টার অফ ইন্ডিয়া ফরেষ্ট্রি তৈরির পর ১৮৬৪ সালে ড. বান্ডিস ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ ফরেস্ট হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি এদেশে প্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বনভূমি রক্ষণাবেক্ষণের গোড়াপত্তন করেন।  তাঁরই পরামর্শে কতকগুলি বিশেষ অঞ্চলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টি করা হয়। এর আগে বনভূমি ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল।
১৮৮১ তে বন সম্বন্ধে শিক্ষা দান সরকারি ভাবে শুরু হয়। এর আগে বন বিভাগ ১৮৯৪ সালে বন সংরক্ষণের দায়িত্ব পেয়ে বননীতি প্রণয়ন করে। কত কিছু যোগ বিয়োগ হয়ে গেল তবু পাবনায় বনসৃজন করা হলো না। যেটুকু ছিল তাও উন্নয়নের নামে নিধন করা হয়েছে। কিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে ফলের বাগান। এঁটাই ঢেকুুর তোলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ