সোমবার ০১ জুন ২০২০
Online Edition

লোকসানের আশঙ্কায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা

খুলনা অফিস : বছর জুড়ে ঈদের জন্য অপেক্ষা করেন ব্যবসায়ীরা। রমযান আসার আগে থেকে প্রস্তুতিও শুরু হয় জোরেশোরে। এসময়ে সারা বছরের ঘাটতি পুষিয়ে ক্রেতাদের কাছে পোশাক বিক্রি করাই ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য। কিন্তু ব্যবসায়ীদের হতাশ করে এবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঈদবাজার কলকাতামুখী। আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। সরেজমিনে খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন খুলনা থেকে বেনাপোলগামী দু’টি ট্রেনে চেপে খুলনার মানুষ কলকাতার দিকে ছুটছেন। এছাড়া প্রতি সপ্তাহে একদিন খুলনা থেকে সরাসরি কলকাতাগামী ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ এ ট্রেনের চাপ বেড়েছে যাত্রীদের। খুলনা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার বলেন, ‘রোযায় বেনাপোলগামী ট্রেনে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। প্রতিদিন ভোর ৬ টা ও বেলা ১২ টায় দু’টি কমিউটার ট্রেনেই যাত্রীদের চাপে তিল ধারণের জায়গা থাকেনা। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ট্রেন যাতায়াত করছে। বন্ধন এক্সপ্রেসেও কিছুটা যাত্রীর চাপ বেড়েছে।’ খুলনার ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘খুলনা রেলওয়ে স্টেশন ও বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার যাত্রী কলকাতায় যাচ্ছেন।’ খুলনা নিউ মার্কেটের জামদানি হাউজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল হালিম মিয়া বলেন, ‘গত ৩ বছর যাবত খুলনার বেচাকেনায় ভাটা পরেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে কলকাতার ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো ব্যবসা হচ্ছে। আরেকদিকে আমরা লোকসানের মুখে আছি।’ খুলনা নিউ মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল গাফফার বিশ্বাস বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন পোশাক এনে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বিক্রি নেই। ব্যবসায়ীরা সঠিক নিয়মে রাজস্ব দিয়ে পণ্য এনে বিক্রি করছেন, কিন্তু ক্রেতারা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কেনাকাটা করে আনছে। দেশের ঈদ বাজার এভাবে কলকাতামুখী হয়ে গেলে ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পরবে।’ তবে, ভিন্ন সুর শোনা গেল কলকাতামূখী যাত্রীদের কাছে। তারা বলেছেন, অন্যান্য দেশে ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক বা সবধরনের পণ্যের মূল্য কমানো হয়। আর আমাদের দেশে রোযা শুরুর আগে থেকেই সবকিছুর দাম বেড়ে যায় কয়েকগুণ। যে কারণে কলকাতায় স্বল্প খরচে ঈদের বাজার কেনাকাটা করা যায়। বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী খালিশপুরের বাসিন্দা আইরীন পারভীন বলেন, ‘এ নিয়ে দু’বছর ধরে কলকাতায় কেনাকাটা করতে যাচ্ছি। আমাদের এখানের সব কিছুর দাম বেশি। কলকাতায় গেলে অন্য দেশে ঘোরাও হয়, আবার কেনাকাটাও হয়। কেন ৩ গুণ বেশি দামে পণ্য কেনাকাটা করব।’ কলকাতা থেকে কেনাকাটা করে ফেরত আসা জাকারিয়া হোসাইন শাওন বলেন, ‘পরিবার নিয়ে কলকাতায় শপিং করেছি। দু’দিন ছিলাম ওখানে। তাতে যা খরচ হয়েছে তাতে দেশে কেনাকাটা হতোনা।’ বেনাপোল চেকপোস্টের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় যাওয়া আসা করে। এদিকে সাধ আর সাধ্যের সমন্বয়হীনতার মাঝেও স্বল্প আয়ের মানুষ ঈদ বাজারে সীমিত বাজেটে পুরো পরিবারের কেনাকাটা করেন। দর কষাকষিতে নিম্ন আয়ের মানুষেরা বেশ এগিয়ে থাকলেও এবার তাদের পথে বাধা হচ্ছেন বিত্তবানরা। খুলনার দরিদ্রদের অধিকাংশ মার্কেটে ধনীরা হানা দিচ্ছেন। খুলনার মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলো ঘুরে দেখা যায়, মধ্যবিত্ত ও নিন্ম আয়ের মানুষের মার্কেট হিসেবে পরিচিত নিক্সন মার্কেট, রেলওয়ে মার্কেট, বড় বাজার, হ্যানিম্যান মার্কেট, মশিউর রহমান মার্কেট, এস এম এ রব মার্কেট, কাজী নজরুল ইসলাম মার্কেট, হকার্স মার্কেট, এমনকি ফুটপাতের দোকানগুলোতেও বিত্তবানদের আনাগোনা। এতে অনেকটা বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষেরা। এসব মার্কেটে দর কষাকষি না করে উচ্চবিত্তরা জিনিস কিনে নিচ্ছেন। এতে বিক্রেতারা সহজে পণ্যের দাম কমাচ্ছেন না। এ নিয়ে বিপদে পড়েছেন নিম্নবিত্তরা। খুলনার বড় বাজারে পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে আসা দিনমজুর রহমত আলী বলেন, ‘পোলাপানগো জন্যি কিছু কিনতে আইছি, কিন্তু বাজারে কিছু কেনার উপায় নাই। যেইটা ধরি সেইটাতেই দাম! তার উপরে বড়লোকরা এহন গরিবগো বাজারে কেনাকাটা করে। মার্কেটের বাইরে গাড়ি রাইখা কেনাকাটা করে। দোকানদার আমার কাছে একটা শার্টের দাম চাইছে ১২০০ টাকা, আমি ৫০০ কইছি। পাশে এক বড়লোক ১১০০ দিয়া শার্টটা কিনে নিয়া গেছে। এমন হইলে আমরা চলমু কেমনে!’ ইজিবাইক চালক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সাধ্য নেই যার, তার মনে হয় সাধও থাকতে নেই। এবার কেনাকাটা করতে এসে তাই মনে হচ্ছে। সব কিছুর যে দাম, তাতে গরিব কিনতে পারবে না। ঈদ তো এখন বড়লোকদের।’ নিক্সন মার্কেটের ফ্যাশন হাউজের মালিক আসাদ শেখ বলেন, আগে এখানকার বিপণিবিতানে শুধু মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্তরা কেনাকাটা করতো। এ বছর দেখছি সব ধরনের ক্রেতারা আসছেন। আমাদের মার্কেটে অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে কেনাকাটা করা যায়। আমরা যা দাম চাইছি, এবার অনেকেই দর কষাকষি ছাড়াই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে কিছুটা টাকা-পয়সাওয়ালা মানুষেরা এ মার্কেটে আসছেন। কারণ, এর আগে দর কষাকষি ছাড়া বিক্রি করতে পারতাম না। প্রাইভেটকারে ঈদবাজার করতে আসা চাকরিজীবী ইমরান আহমেদ বলেন, আগে নিউ মার্কেট, সোনাডাঙ্গা আবার শিববাড়ীর শোরুম থেকে কেনাকাটা করা হতো। এবার সব মার্কেটেই প্রচ- দাম। আগে সেসব পোশাক দুই হাজারে পেতাম সেসব এবার দাম চাচ্ছে পাঁচ হাজারের মতো। তাই নিক্সন মার্কেটের দিকেও একটু আসলাম। একটু ঘুরে-ফিরে কিনলে এখানেও ভালো জিনিস পাওয়া যায়। নিম্ন আয়ের মানুষদের ঈদ উদযাপনের গল্পতে বিত্তবানরা বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে অনেকেই মার্কেট করতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। নামীদামি শপিং মল আর রঙিন বিপণিবিতান এড়িয়ে তারা কোনো রকমে নতুন পোশাক কিনতে পারলেই খুশি হতো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ