বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

তাকওয়া অর্জন ও নৈতিক বৃত্তির পবিত্রতার অনুশীলনে মাহে রমযান

তাসলিমা মুনিরা : কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে ব্যক্তির সংশোধন, পুনর্গঠন ও পূর্ণতা বিধানের জন্যে সমাজ ও সমষ্টির সংশোধন ও পুনর্গঠন একান্তই জরুরী। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটি প্রায় অসম্ভব। অধিকাংশ ব্যক্তিসত্ত্বার সংস্কার সংশোধন ও পূর্ণত্ব বিধান গোটা সমাজের সংশোধন ও সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই প্রচেষ্টা হতে হবে যেমন ব্যক্তি কেন্দ্রিক যেমন, সমাজ কেন্দ্রিক তেমনি।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোযা ৩য় স্তম্ভ। পবিত্র রমযান মাসের রোযা সবার জন্য ফরজ। শরীয়তের এই ফরজ বিধানটি সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য একটি সামষ্টিক প্রশিক্ষণ। সঠিক উপলব্ধি ও মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র।
“রমযান মাস ঐ মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। যা মানুষের জন্য পুরোটাই হেদায়াত, যা এমন স্পষ্ট উপদেশপূর্ণ যে, তা সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। তাই এখন থেকে যে ব্যক্তি এ মাস পায় তার অবশ্য কর্তব্য, সে যেন পুরো মাস রোযা রাখে। (সূরা আল বাকারা: ১৮৫)
আরবী শব্দ রমজ থেকে রমযান শব্দটি এসেছে। রমজ শব্দটির অর্থ জ্বালিয়ে দেয়া বা পুড়িয়ে দেয়া। পবিত্র রমযান মাসে মুমিনদের গুনাহখাতা রোজা রাখার মাধ্যমে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সাফ করে দেয় বিধায় এ মাসটির নাম রমযান মাস। আরবি ক্যালেন্ডারে রমযান মাসটি নবম মাস। শা’বান মাসের পরই রমযান মাস শুরু হয়। রমযান শব্দটির প্রতিশব্দ হলো সাওম। এটি আরবি শব্দ। এর বহুবচন সিয়াম। এটি আরবি শব্দ। এর বহুবচন ‘সিয়াম’। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে যে কোন কাজ থেকে বিরত থাকা।
এর ফারসী শব্দ রোযা যার অর্থ বিরত থাকা, কঠোর সাধনা, অবিরাম চেষ্টা, আত্মসংযম। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে রোযা বা সাওমের সংজ্ঞা হচ্ছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যাবতীয় ইন্দ্রিয় তৃপ্তি হতে বিরত থাকার নাম সিয়াম বা সাওম অথবা রোযা।
এটা রোযার মৌলিক সংজ্ঞা। কিন্তু ব্যাপক অর্থে রোযা মানে হলো সুবহে সাদিক থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী সম্ভোগ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন- হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ, মস্তিষ্ক ইত্যাদিসহ দেহ ও মনকে অন্যায় অপরাধ ও সকল প্রকার মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার নাম রোযা।
প্রত্যেক মুসলিম প্রাপ্ত বয়স্ক, স্বাধীন, সুস্থ, বিবেকবান, নর-নারীর ওপর পবিত্র রমযান মাসের ত্রিশটি রোযা রাখা ফরযে আইন।
রোযার মূল উদ্দেশ্য : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন, “রোযা ও কুরআন রোযাদার বান্দার জন্য শাফায়াত করবে, রোযা বলবে, হে আল্লাহ! আমি এ ব্যক্তিকে দিনে খাবার ও অন্যান্য কামনা বাসনা থেকে ফিরিয়ে রেখেছিলাম। আপনি আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, হে আল্লাহ! আমি এ ব্যক্তিকে রাতের নিদ্রা থেকে ফিরিয়ে রেখেছি। আপনি আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাদের সুপারিশ গ্রহণ করবেন।” (বায়হাকী)
রোযার মূল উদ্দেশ্য শুধু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকাই নয়। এটা ইবাদতের বাহ্যিক অনুষ্ঠান মাত্র। বরং এ অনুষ্ঠান পালনের উদ্দেশ্য হল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি তৈরি করা, যেন এ শক্তির প্রভাব রমযান মাস সহ অন্যান্য মাসেও এতটা প্রবল ও বিস্তৃত হয় যে, তারা বড় বড় লাভজনক কাজকেও কেবল আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়ে পরিত্যাগ করে। আর কঠিন বিপদের কাজেও যেন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিজের মনকে শক্ত করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এ শক্তি মুসলমানদের মধ্যে তখনই আসতে পারে, যখন রোযার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারবে এবং রমযানের পুরো মাস আল্লাহর ভয় ও ভালবাসায় নিজের মনকে নফসের খাহেস হতে ফিরিয়ে রাখবে, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রস্তুত হবে।
রমযান মাসের প্রকৃত শিক্ষা
১. তাকওয়া অর্জন : “হে ঐসব লোক, যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের উপর রোযা ফরয করে দেওয়া হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের নবীগণের উম্মতের ওপর ফরয করা হয়েছিল। এর ফলে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি হবে।” (আল বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াতে রোযা ফরয করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার বলা হয়েছে। রোযার মূল উদ্দেশ্য হল তাকওয়া। তবে আল্লাহ তাআলা রোযার হুকুম দেয়ার পর এই আয়াতে বলেছেন, আশা করা যায় তোমরা মুত্তাকী ও পরহেযগার হতে পারবে। আল্লাহ পাক একথা বলেননি যে, রোযা রেখে নিশ্চয়ই তোমরা পরহেযগার ও মুত্তাকী হতে পারবে। কারণ রোযা হতে যে সুফল লাভ করা যায় তা রোযাদারের নিয়ত, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা ও আগ্রহের ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে। যে ব্যক্তি এর উদ্দেশ্য জানতে ও ভাল করে বুঝতে পারবে এবং তা দ্বারা মূল উদ্দেশ্য লাভের চেষ্টা করবে সে তো কম বেশি মুত্তাকী নিশ্চয়ই হবে।
নবী করীম (সা.) বলেছেনÑ “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করবে না তার শুধু খানাপিনা পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই।”
অন্য হাদীসে রাসূলে করীম (সা.) এরশাদ করেছেন, “অনেক রোযাদার এমন আছে কেবল ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া যার ভাগ্যে অন্য কিছুই জোটে না। তেমনি রাত্রিতে ইবাদতকারী অনেক মানুষও এমন আছে, যারা রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছু লাভ করতে পারে না।”
তাকওয়া সৃষ্টি করার জন্য রোযা, কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে অধিক কার্যকর কর্মসূচী আর কিছু হতে পারে না, আর এই কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য পবিত্র রমযান মাসই সবচেয়ে মোক্ষম মাস। রোযা ও রাতে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত উভয় কাজকে রমযান মাসে একত্রিত করে আল্লাহ তাআলা প্রকৃতপক্ষে এ তাকওয়া অর্জনের পথ আমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন।
তাকওয়া হচ্ছে একজন মুমিনের কাম্য গুণ। এই গুণ না থাকলে মুমিন হওয়ার কোন অর্থ নেই।
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেছেন, “তাকওয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করা, তাঁর নাফরমানী না করা, আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁকে ভুলে না যাওয়া এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ও তাঁর কুফরী না করা।”
ওমার বিন খাত্তাব (রা.) মৃত্যুর সময় নিজ পুত্র আবদুল্লাহকে অসীয়ত করেন, “তুমি তাকওয়া অর্জন করো, যে তাকওয়া অর্জন করলে আল্লাহ তোমাকে বাঁচাবেন, যে আল্লাহকে ঋণ দেবে (দান করবেন) তিনি তাকে বিনিময় দেবেন, যে তাঁর শুকরিয়া আদায় করবে, আল্লাহ তাকে বাড়িয়ে দেবেন।”
তাকওয়া অবলম্বন করলে দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক ফায়দা আছে যা আল কুরআনের অসংখ্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। “জনপদবাসীরা ঈমান ও তাকওয়ার অনুসরণ করলে আমরা তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দেবো।” (সূরা আ’রাফ: ৯৬)
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করার মানদ- দান করবেন।” (সূরা আনফাল: ২৯)
“যে আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অনুসরণ করে, আল্লাহ তাকে সংকট থেকে উদ্ধার করবেন এবং তাকে অভাবিত রিযিক দান করবেন।” (সূরা তালাক: ২০)
সুতরাং আল্লাহ তা’আলা পবিত্র রমযান মাসে রোযা ফরয করে যে তাকওয়া অর্জন করার শিক্ষা দিয়েছেন তা অনেক বড় নেয়ামত। এটা সেই নেয়ামত যার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সামষ্টিক পর্যায়ে এ রমযানে নাযিল হওয়া কুরআন মাজীদের শিক্ষাকে পূর্ণ করার এবং এর হক আদায়কারী উত্তরসূরী হতে পারি।
২. ঈমান বৃদ্ধি : রমযান মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার আরো একটি অন্যতম দিক হল ঈমান বিল গায়েব এর বাস্তব প্রশিক্ষণ, যা আর কোন ইবাদতের মাধ্যমে এত কার্যকর হয় না। একজন রোযাদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পানাহার ও যৌন আচরণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পরিহার করছে, নির্জন নিরালায় সুযোগও পায়ে ঠেলে দিচ্ছে কিসের জন্যে, আল্লাহ হাযির-নাযির তার দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব নয়। আজকে কিছু না হলেও আখেরাতে এটা ফাঁস হবে এই অনুভূতি উপলব্ধিই এর প্রধান কারণ।
নবী করিম (সা.) বলেছেন- “ঈমান ও এহতেসাবের সাথে যে ব্যক্তি রোযা রাখবে তার অতীতের গুনাহ-অপরাধ মাফ করে দেয়া হবে।”
ঈমান : অর্থাৎ আল্লাহ সম্পর্কে একজন মু’মিনের যে ধারণা ও আকীদা হওয়া উচিত তা স্মরণ থাকা চাই আর এহতেসাব এর অর্থ এই যে, মুসলমান সব সময়েই চিন্তা-কল্পনা করবে, নিজের কাজ-কর্মের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে ও ভেবে দেখবে যে, আল্লাহর মর্জির খেলাফ চলছে না তো। এ দু’টি জিনিসের সাথে যে ব্যক্তি রমযানের পূর্ণ রোযা রাখবে, সে তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারবে। হাদীসে উল্লেখিত আছেÑ “গুনাহ থেকে যে তাওবা করে, সে একেবারে নিষ্পাপ হয়ে যায়।”
৩. আত্মসংযম : মানুষের চাহিদার কোন শেষ নেই। মানুষের এই চাহিদা বাড়তে বাড়তে পশু প্রবৃত্তিকেও হার মানায়। আর এই লাগামহীন চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই মানুষ সকল ধরনের অন্যায় ও গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। মানুষের এই চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার মধ্যে আনতে না পারলে, কখনও মানুষের মর্যাদার অবস্থান করতে পারে না। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমাদের এই চাহিদাসমূহের গলায় নিয়ন্ত্রণের লাগাম অত্যন্ত স্বাভাবিক ও কার্যকর পন্থায় পরিণত হয়।
হাদীসে বর্ণিত আছে: “রোযা একটি ঢালের ন্যায়। (ঢাল যেমন দুশমনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, তেমনি রোযাও শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ)। সুতরাং যে ব্যক্তি রোযা রাখবে, তার (এ ঢাল ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়) দাঙ্গা-ফাসাদ থেকে ফিরে থাকা উচিত। কেউ তাকে গালি দিলেও কিংবা তার সাথে লড়াই-ঝগড়া করলেও পরিষ্কারভাবে বলা উচিত যে, আমি রোযা রেখেছি, তোমার সাথে এ অন্যায় কাজে আমি যোগ দেব এমন আশা করতে পারি না।”
৪. ধৈর্য্যরে প্রশিক্ষণ : ধৈর্য্য মুমিনের সাফল্যের চাবিকাঠি। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে সবর করে আল্লাহ তাকে সবর ধারনে সাহায্য করেন। আল্লাহ সবরের চাইতে উত্তম ও প্রশস্ততা কাউকে দান করেন না।” (বোখারী, মুসলিম)
দাওয়াতে দ্বীন ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর কষ্ট সহ্য করার জন্য ধৈর্য্যরে ভীষণ প্রয়োজন। তাছাড়া বাস্তব জীবনেরও প্রতিটি পদে ধৈর্য্য একটি অপরিহার্য গুণ। যার ধৈর্য্য বেশি, তার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি বেশি। তাই আল্লাহ রমযানকে ধৈর্য্যরে একটি বিজ্ঞানসম্মত কর্মসূচী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রোযার অপর নাম হচ্ছে সবর। সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত, এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রমযান হচ্ছে ধৈর্য্য ও সংযমের মাস। আর সবরের পুরস্কার হচ্ছে বেহেশত।” (ইবনে খোযাইমাহ)
অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রোযা ধৈর্য্যরে অর্ধেক।” (তিরমিযি)
ধৈর্য্য তিন প্রকার : ১. আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের কষ্ট স্বীকারের ধৈর্য্য, ২. আল্লাহর নিষিদ্ধ ও হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য যে কষ্ট হয় সে ব্যাপারে ধৈর্য্য, ৩. তাকদীর বা ভাগ্যের কষ্টদায়ক জিনিসের মোকাবেলায় ধৈর্য্য ধারণ করা।
রমযানের মধ্যে তিন ধরনের ধৈর্য্যই পাওয়া যায়। তাই ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক জীবনকে সুখ সমৃদ্ধ করতে পবিত্র রমযান বছরে একবার আমাদের দুয়ারে হাজিরা দেয়।
৫. ইহসান বা সহানুভূতির গুণ অর্জন : মাহে রমযানে মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টির চারিত্রিক গুণ অর্জিত হয়। যাদের তিনবেলা পূর্ণভাবে খাওয়ার সামর্থ্য আছে তারা যখন রমযান মাসে দীর্ঘ একমাস রোযাব্রত পালন করে তখন দিনের বেলা না খেয়ে থাকার যে কষ্ট তা তাদের উপলব্ধিতে আসে, ফলে তাদের মধ্যে ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। মানুষের প্রতি মানুষের এমনকি আল্লাহর যে কোন সৃষ্ট জীবনের প্রতি ইহসান বা সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। আর এই মহৎ মানবীয় চারিত্রিক গুণটি সৃষ্টি করে মাহে রমযানের সিয়াম বা রোযা।
৬. দানশীলতার গুণ অর্জন : মাহে রমযানের বিশেষ মর্যাদা এবং বেশি বেশি সওয়াব বা নেকীর আশায় মানুষ এই মাসে বেশি বেশি দান-খয়রাত এবং আল্লাহর পথে খরচ করে। কেননা হাদীসে উল্লেখ রয়েছেÑ “রমযান মাসের একটি নফল ইবাদত অন্য মাসের ফরয আদায়ের সমান মর্যাদা।” (বায়হাকী) সুতরাং মাহে রমযান মানুষকে বেশি বেশি দান-খয়রাত এবং ইনফাকের মাধ্যমে তার দানের হাতকে সম্প্রসারিত করার বিশেষ ট্রেনিং দেয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা দান করতে থাকো। কত দান করলে তা গুণতে যেও না। তাহলে আল্লাহও তোমার বিপক্ষে (গুনাহ) গণনা করে রাখবেন।”
৭. সততার গুণ অর্জন : মাহে রমযানে মানুষের মধ্যে সকল প্রকার অন্যায়-অসততার গুণগুলো দমন করে সততার গুণের উন্মেষ ঘটায়। হাদীসে বর্ণিত: মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ ত্যাগ করতে পারলো না, তার খানাপিনা ত্যাগ করায় (রোযা রাখায়) আল্লাহর কাছে কোনই মূল্য নেই।” (সহীহ বুখারী)
সুতরাং রোযাদার তার রোযা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকার সাময়িক হলেও চেষ্টা করে। একজন মুমিন মাহে রমযানে দীর্ঘ একমাস মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকার প্রশিক্ষণ পায় এবং এই প্রশিক্ষণই তাকে মিথ্যাচারিতা ত্যাগ করে সত্যবাদিতা বা সততার অনন্য মহৎ চারিত্রিক গুণটি অর্জন করতে সহায়তা করে।
৮. কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুণ সৃষ্টি : মহান আল্লাহ বলেন, তিনি রমযান মাসব্যাপী রোযা রাখার বিধান দিয়েছেন কুরআন নাযিলের শোকর আদায় করার জন্যে। “এবং যেনো তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।” (সূরা আল বাকারা: ১৮৫)
৯. আল্লাহমুখীতা : রমযান মাস সামনে এলেই মুমিনরা মানসিকভাবে আল্লাহমুখী হতে শুরু করেন। আর রমযান মাস এসে গেলে তারা নিজেদেরকে পুরোপুরি আল্লাহমুখী করার চেষ্টা করেন। আর এই আল্লাহমুখীতার গুণ অর্জন করার চেষ্টা করেন নামায এর মাধ্যমে।
- এ মাসে প্রত্যেক রোযাদার নিয়মিত ও সময়মত নামায আদায় এর চেষ্টা করেন।
- বেশি বেশি সুন্নত ও নফল নামায পড়ার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের চেষ্টা করেন।
- প্রতিটি মুহূর্তে যিকির-আযকার এর মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণে ব্যয় করার চেষ্টা করেন।
- এ মাসে মুসলমানগণ আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি দোয়া প্রার্থনা ও ফরিয়াদ করেন।
- বেশি বেশি দান সাদকা করেন।
রমযানের এই অভ্যাসগুলো যদি সারা বছর জারি রাখতে পারি, তবে আমরা হতে পারবো আল্লাহওয়ালা। কুরআন মাজিদে এ অবস্থাকেই বলা হয়েছে ‘রব্বানিয়্যন’, এর অর্থ: প্রভুওয়ালা বা আল্লাহওয়ালা।
১০. কুরআনমুখীতা : মাহে রমযান কুরআন নাযিলের মাস। কুরআন নাযিলের কারণেই এ মাসের এতো বড় মর্যাদা। রমযান মাসের আগমনের সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় কুরআনের মওসুম। মুমিনগণ কুরআনের ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠেন। এ মাসে মুমিনরা-
- বেশি বেশি কুরআন পাঠ করে অনেকে কুরআন খতম করেন। অনেকে একাধিকবার কুরআন খতম করেন।
- তারাবির নামাযের মাধ্যমে রাত জেগে জেগে কুরআন তেলাওয়াত শুনেন।
- যারা কুরআন পাঠ করতে জানেন না, তারা এ মাসে কুরআনের পাঠ শেখার উদ্যোগ নিয়ে থাকেন।
- আল কুরআনের শিক্ষা অনুধাবন করার জন্য অর্থসহ কুরআন অধ্যয়ন করেন অনেকে।
- এ মাসে বেশি বেশি কুরআনের দারস  তাফসীর অনুষ্ঠিত হয়।
এভাবে প্রত্যেক মুসলমান রমযান মাসে নিজেকে কুরআনমুখী করার প্রয়াস পায়। আল কুরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করার পরিবেশ তৈরি হয় এবং নিজেদের জীবন এর গাইডেন্স হিসেবে অনুসরণ করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করার দরুন সুযোগ তৈরি হয় এই পবিত্র মাস মাহে রমযানে।
সব মিলে আমরা রমযান মাসটি একটি কর্মমুখর ইবাদতের ভিতর দিয়ে অতিবাহিত করি। ফলে মাসটি সমগ্র মুসলিম জাতির জন্যে একটি অবিরাম প্রশিক্ষণ এর মাস।
রাসূল (সা.)-এর সিয়াম সাধনা : “তোমাদের জন্যে সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে আল্লাহর রাসূলের (জীবন চরিত্রের) মধ্যে তাদের জন্যে যারা কামনা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতের জীবনের সাফল্য আর স্মরণ করে আল্লাহকে বেশি বেশি করে।” (সূরা আহযাব: ২১)
রমযান মাস আগমনের পূর্বেই প্রত্যেক মুসলমান যে যার সাধ্যমত পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পবিত্র এই ক্ষণকে স্বাগত জানানোর জন্যে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে স্পষ্টই সিয়াম সাধনায় আত্মনিয়োগের সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আমাদের চেষ্টা সাধনা তখনই পূর্ণতা পেতে পারে যখন আমরা উন্নত চরিত্রের আদর্শ আল্লাহর রাসূল (সা.) এর অনুসরণে সিয়াম সাধনায় মনোনিবেশ করবো।
রাসূল (সা.)-এর রমযানপূর্ব প্রস্তুতি : রাসূল (সা.)-এর জীবন চরিত বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই রমযান মাস আগমনের পূর্বেই শুরু হয়ে যেত রাসূল (সা.) এর রমযান পালন প্রস্তুতি।
রমযান মাস আগমনের পূর্বেই রাসূল (সা.) পরিবারের সদস্য ও সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে এ মাসের মহত্ব এবং বরকত সম্পর্কে আলোচনা করতেন। এ মাসের বরকতের ভা-ার থেকে নিজেদের পরিপূর্ণ অংশ গ্রহণের জন্যে ব্যাপক পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার তাগিদ ও উৎসাহ দিতেন।
রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, আমার উম্মতকে রমযান মাসে পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করা হয় যা তাদের পূর্বের কোন উম্মতকে দেয়া হয় নি।
পাঁচটি বৈশিষ্ট্য হলো: রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধি হতেও উত্তম যতক্ষণ না ইফতার করে, ফেরেশতাগণ তাদের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকে। আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক দিন জান্নাতকে সুসজ্জিত করেন। অতঃপর (জান্নাতকে সম্বোধন করে) বলতে থাকেন: আমার নেক বান্দাদের বৈষয়িক শ্রম, দায়িত্ব ও কষ্ট নির্যাতন শীঘ্রই দূর করা হবে। তারা তোমার নিকটই পরিণতি পাবে।
এ মাসে প্রধান দুষ্কৃতিকারী শয়তানকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হবে। অত:পর তারা মুক্ত হবে না। যেমন তারা মুক্ত রমযান ছাড়া অন্য সময়ে। আর নেক বান্দাহদের জন্যে শেষ রাতে মাগফেরাত কামনা করা হবে। প্রশ্ন করা হলো হে রাসূল (সা.)! এটা কি ক্বদরের রাতের কথা? বললেন না, কিন্তু আমলকারী যখন তার আমল সম্পূর্ণ করবে তখন তার প্রতিফল তাকে পুরোপুরি আকারে দেয়া হবে। (মুসনাদে আহমদ)
রাসূল (সা.) এর রমযান : রাসূল (সা.) এই বিশেষ সময়টিতে বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকতেন এবং তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবীদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। এই সময় তিনি বিশেষ কিছু ইবাদত করতেন। যেমন-
১. কুরআন তিলাওয়াত : রমযান মাসে রাসূলে কারীম (সা.) অন্যান্য সময়ের তুলনায় কুরআন তিলাওয়াতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। এ মাসে তিনি জিবরাঈল (আ.) এর কাছে কুরআন শিখতেন। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, এই সময় তিনি জিবরাঈল (আ.)-কে কুরআন পড়ে শুনাতেন।
২. কিয়ামুল লাইল : পবিত্র রমযান মাসে রাসূল (সা.) দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ, আল্লাহর কাচে ক্ষমা চাওয়ার কাজকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। এজন্যে তিনি দু’টি সময়কে বেছে নিতেন। তা হলো রাতের প্রথমাংশে বা মধ্যভাগে, তারাবি নামাযে দাঁড়ানো এবং মধ্যরাতের পর বা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়ানো।
৩. তারাবীহ্র সালাত : হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় তারাবীহ সালাত আদায় করবে আর পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন।” (বুখারী)
তারাবীহ সালাত ফরয না হলেও রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ বিশেষ গুরুত্বসহকারে নিয়মিতভাবে দীর্ঘ কুরআন তেলাওয়াত সহকারে তা পড়তেন।
৪. তাহাজ্জুদ নামায : আবু সালামাহ ইবনু আব্দুর রহমান (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করেন যে, রমযানে (রাতে) রাসূল (সা.) নামায কেমন ছিল? তিনি জবাব দিলেন, “রমযানে এবং রমযান ব্যতীত অন্য সময় এগার রাকাআতের বেশি তিনি পড়তেন না। প্রথমত তিনি চার রাকাআত পড়তেন। এ চার রাকাআতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্বন্ধে তুমি কোন প্রশ্ন করোনা। তারপর আরো চার রাকাআত পড়তেন। এর সৌন্দর্যও দীর্ঘতা সম্বন্ধে (আর কি বর্ণনা দিব, কাজেই কোন) জিজ্ঞাসাই করো না। এরপর পড়তেন বিতরের তিন রাকাআত। আমি (আয়শা রা.) বলতাম, “হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনি বিতর আদায়ের আগে ঘুমিয়ে যাবেন। তিনি বলতেন, হে আয়শা আমার দুচোখ ঘুমায় বটে কিন্তু আমার কালব নিদ্রাচ্ছন্ন হয় না।” (বুখারী)
তিনি নামাযে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তার ফুলে যেতো। আয়শা (রা.) বলতেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আল্লাহ তো আপনাকে ক্ষমা করেই দিয়েছেন, তাহলে এতো কষ্ট করছেন কেন? রাসূল (সা.) বলতেন, ‘আমি কি আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা হবো না।
৫. রমযানের শেষ দশ দিনের আমল : হযরত আয়শা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রমযানের শেষ দশ দিন আগত হয় তখন নবী (সা.) তার কাপড় কষে বেঁধে নিতেন। বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন এবং রাত জাগতেন ও পরিবার-পরিজনকেও জাগিয়ে দিতেন। তিনি এই শেষ দশ দিন অধিক পরিমাণ ইবাদতে মশগুল হয়ে যেতেন। এই দিনগুলোর ইবাদতের দুটি বিশেষ ধরন হচ্ছেÑ ১. শবে ক্বদর বা লাইলাতুল ক্বদর অনে¦ষণ, ২. ইতেকাফ।
লাইলাতুল ক্বদর অনে¦ষণ ও ইতেকাফ : মাহে রমযানের এই নাজাতের অংশের দশ দিনের মধ্যে রয়েছে মহিমানি¦ত রাত। সে রাতটি তালাশ করার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.) প্রতি রমযানের শেষ দশ দিনই ইতেক্বাফ করতেন। লাইলাতুল ক্বদর তালাশের ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) এর অনুসৃত এই নিয়মই উৎকৃষ্ট নিয়ম। লাইলাতুল ক্বদরের মুহূর্তেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজাতের ফায়সালা আসে। বিশেষ কারণেই আল্লাহ তা’আলা সেই রাতটি কবে তা উল্লেখ করেননি। আল্লাহর রাসূল (সা.) ও উল্লেখ করেননি। সম্ভবত কারণ এটাই যে, আল্লাহর রাসূলের (সা.) জীবনে প্রথম এ রাতটি যে পেরেশানীর পরে এসেছিলো। যে সাধনার পর এসেছিল অনুরূপ পেরেশানী কারো অন্তরে সৃষ্টি হলেই এ রাতের কল্যাণ তার নসীবে জুটবে, তাই হৃদয় মনের অস্থিরতা নিয়ে শেষ দশ দিনের প্রতিটি রাত বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে আল্লাহর কাছে ধরনা দেয়া। রাসূল (সা.) তাই রমযানের শেষ দশ রাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত থাকতেন এবং বিরামহীন ইবাদত করতেন। এই সময় একটি বিশেষ দোয়া বেশি করে পড়তেন-“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন তুহীব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।” (আহমদ)
অর্থ: হে আল্লাহ তুমি মহান ক্ষমাশীল, ক্ষমা প্রার্থনা তোমার নিকটে খুবই প্রিয়, অতএব আমাকে ক্ষমা করে দাও।
৬. দান-সাদকা : রাসূল (সা.) রমযান মাসে সবচেয়ে বেশি দান করতেন। রমযানে জিবরাঈল (আ.) যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। হাদীসে উল্লেখ আছে জিবরাঈল (আ.) যখন তার সাথে সাক্ষাত করতেন তখন তিনি রহমতসহ প্রেরিত বায়ু চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন। (বুখারী)
৭. রাসূল (সা.) এর সাহরী ও ইফতার : রাসূল (সা.) অনেক সময় না খেয়েও রোযা রাখতেন। তবে সাহরী খাওয়ার ব্যাপারে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন- তোমরা সাহরী খাও, কেননা সাহরীতে বরকত রয়েছে। (বুখারী)
তিনি সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করতেন ও দ্রুত ইফতার করতেন এবং মাগরিবের নামাযও তাড়াতাড়ি পড়তেন। একা ইফতার করতেন না। অভাবীদের ইফতার করাতে পছন্দ করতেন। রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে তার গুনাহ মোচন ও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি অবধারিত।” ইফতারে পানি, খেজুর বা সহজ লভ্য এমন কিছু দিয়েই রোযা ভঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন।
৮. রোযা অবস্থায় যে সব কাজ করাকে রাসূল (সা.) বিশেষভাবে অপছন্দ করতেন : রোযার আর এক অর্থ হলো ‘বিরত থাকা’। মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার প্রশিক্ষণই আমরা রমযান থেকে পাই। রাসূল (সা.) বলেছেন, পাঁচটি ব্যাপারে রোযাদারের রোযা বরবাদ করে দেয়। যথাÑ ১. মিথ্যা বলা, ২. চোগলখুরী বা কূটনামী করা, ৩. গীবত বা পিছনে নিন্দা করা, ৪. মিথ্যা কসম করা, ৫. কামভাব নিয়ে দৃষ্টিপাত করা।
এছাড়া রোযা অবস্থায় ঝগড়া করা, গালিগালাজ করা, আল্লাহর রাসূল (সা.) অত্যন্ত গর্হিত কাজ হিসেবে বলেছেন।
এভাবেই সিয়াম সাধনার প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর রাসূল (সা.) রমযান মাসের প্রতিটি মুহূর্তকেই আল্লাহর ইবাদতে কাজে লাগাতেন। আমরাও যেন আল্লাহর রাসূলের (সা.) অনুসরণে রমযান মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতে পরিণত করে আমাদের রমযানকে করতে পারি আলোকিত। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সেই তাওফিক দান করুন।
রমযান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত
১. রমযান তাকওয়ার মাস।
২. রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধের চাইতেও উৎকৃষ্ট। (বুখারী ও মুসলিম)
৩.রোযাদারের ইফতার না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তার জন্য গুনাহ মাফের দোয়া করতে থাকে।
৪. রোযাদারের সম্মানে বেহেশতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি বিশেষ দরজা খোলা হবে। ঐ দরজা দিয়ে তারা বেহেশতে প্রবেশ করবে। (বুখারী, মুসলিম)
৫. আল্লাহ ঈদ পর্যন্ত প্রতিদিন জান্নাতকে সাজাতে থাকেন এবং বলেন, সহসাই আমার নেককার বান্দারা এখানে প্রবেশ করে নিজেদের দুঃখ-কষ্ট দূর করবে।
৬. এই মাসে বড় বড় শয়তানদেরকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
৭. বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং দোজখের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
৮. রমযানের প্রতি রাতে রোযাদার মোমিনদেরকে দোজখ থেকে মুক্তি দেয়া হয়। রমযানের শেষ এক রাতেই সারা মাসের সমান সংখ্যক লোককে মুক্তি দেয়া হয়।
৯. এই মাসে ক্বদরের রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চাইতেও উত্তম।
১০. এই মাসে প্রথম ১০ দিন রহমত, দ্বিতীয় ১০ দিন ক্ষমা এবং শেষ ১০ দিন দোজখ থেকে মুক্তির দিবস।
১১.  অন্য মাসে যে কোন নেক কাজের বিনিময় ১০ থেকে ৭শ গুণ। কিন্তু রমযানের রোযার প্রতিদান এর চাইতেও অনেক বেশি। আল্লাহ নিজ হাতে সেই সীমা-সংখ্যাহীন পুরস্কার দান করবেন। (বুখারী ও মুসলিম)
১২. এই মাস দান-সাদকার মাস। এই মাসে রাসূল (সা.) সার্বক্ষণিক দান করতেন।
১৩. রমযান মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে তাই এটি কুরআনের মাস।
১৪. রমযান মাস হচ্ছে জিহাদের মাস। এই মাসে মুসলমানদের বড় বড় ঐতিহাসিক বিজয় সাধিত হয়েছে। তাই এটাকে কুরআন বিজয়ের মাসও বলা হয়েছে।
১৫. ইফতার রমযানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়।
১৬. এই মাসে নফল ইবাদত অন্য মাসের ফরয ইবাদতের সমান এবং একটি ফরয ইবাদত অন্য মাসের ৭০ ফরযের সওয়াবের সমান।
১৭. এই মাসের ওমরার হজ্বের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। (বুখারী, মুসলিম)
১৮. কোন রোযাদারকে ইফতার করালে রোযাদারের রোযার সমান সওয়াব পাওয়া যায়, যদিও রোযাদারের সওয়াবের কোন ঘাটতি হয় না।
১৯. শ্রমিক কর্মদিবসের শেষে যেমন পারিশ্রমিক পায়, রোযাদারও তেমনি রমযানের শেষ দিন ক্ষমা লাভ করে। (বায়হাকী)
২০. রমযানের পরের মাসে অর্থাৎ শাওয়ালের ৬ রোযা রাখলে পুরো বছর আল্লাহর কাছে রোযাদার হিসেবে গণ্য হবে এবং রোযার সওয়াব লাভ করবে।
২১. এই মাসে সাহরী খাওয়া হয়। সাহরীতে রয়েছে অনেক বরকত।
২২. রমযান রাত্রি জাগরণের মাস। এই মাসে সালাতুল কেয়াম অর্থাৎ তাহাজ্জুদসহ তারাবীহর নামায পড়া হয়। তারাবীহর নামায দ্বারা অতীতের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
২৩. রমযানে সাদাকাতুল ফিতর দিতে হয়। এর মাধ্যমে রোযার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর হয়।
২৪. রমযান হচ্ছে তাওবার মাস। তাওবার মাধ্যমে গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
২৫. ঈদুল ফিতরের খুশী রমযানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পরিশেষে আমাদের আকাক্সক্ষা : ইসলামের প্রচার, প্রচেষ্টা, হেফাযত ও বিজয়ের মানবীয় দায়িত্বটা যখন আল্লাহ মুসলমানদের দিয়েছেন সেহেতু তাদের প্রশিক্ষণের জন্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র রমযান মাসের সিয়াম সাধনা দান করেছেন। আমরা রমযান মাস থেকে সেই তাকওয়া, শক্তি এবং যোগ্যতা অর্জন করতে চাই, যার মাধ্যমে আমরা কুরআনের আমানতের হক আদায় করার অধিকারী হতে পারি। আমাদের ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনের সাফল্য শুধুমাত্র এ কুরআনের উপরেই নির্ভরশীল। আমাদের পারলৌকিক মুক্তি ও কল্যাণ নির্ভর করবে কুরআনের সাথে আমাদের আচরণের উপর। সুতরাং এক মাস সিয়াম সাধনার মূল লক্ষ্য যেন হয় আল কুরআনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও পথের দিশারী হিসেবে আল কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ। মহান রাব্বুল আ’লামীন আমাদের চেষ্টাকে কবুল করুন, আমীন॥

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ