মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

এ কেমন বর্বরতা!

এইচ এম আব্দুর রহিম : পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভির সংবাদের দিকে দৃষ্টিপাত করলে প্রায় চোখে পড়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা বিষয়ক খবর। এ সংক্রান্ত খবর পড়তে পড়তে মানুষের মন বিষিয়ে উঠেছে রীতিমতো। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃটান্তÍমূলক শাস্তি না হওয়ায় শতকরা ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ অশ্লীলতায় আইয়ামে জাহেলিয়াতের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে।
ধর্ষণের হাত থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, গৃহবধূ, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রী থেকে শুরু করে চার-পাঁচ বছরের কোমলমতি শিশু পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। আর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ও ধর্ষণ করার ঘটনা তো সমাজে অহরহ ঘটে চলেছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে সমাজ ও মান সম্মানের ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানায় না। তখন বিষয়টি লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকে। এরপর ও যে খন্ডিত চিত্র সমাজের কাছে ভেসে উঠে তা ভয়ানক।
সম্প্রতি আমাদের দেশে নারী নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শাহিনুর আক্তার তানিয়া নামের মেয়েটি  চাকরি করতেন ইবনে সিনা হাসপাতালের কল্যাণপুর শাখার সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে। বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে। বাবার সাথে প্রথম রোযা রাখার উদ্দেশ্যে সোমবার রাতে রাজধানীর বিমান বন্দর এলাকা থেকে কটিয়াদিগামী স্বর্ণলতা পরিবহণের একটি বাসে ওঠেন। কিন্তু তার স্টেশনে যাওয়ার আগে অন্য স্টেশনে যাত্রীদেরকে নামিয়ে দেয়। চালক হেলপার চালাকি করে অন্য দিকে নিয়ে গণধর্ষণ ও গলায় ওড়না পেঁচিয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে  হত্যা করে। ধর্ষণের পূর্বে মেয়ে অনেক কাকুতি মিনতি জানালে তাদের হৃদয় গলেনি। ধর্ষণের পর আঘাত দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেয়। পরে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লাশ রেখে পালিয়ে যায় ঘাতক ধর্ষকরা। রমজানের প্রথমরাতে এ রকম ঘটনা গা শিউরে উঠার মত।
 তবে তানিয়াকে পালাক্রমে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামী স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসের চালক ধর্ষক নূরুজ্জামান নূরু নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীতে বলেছে, সে নিজে ও হেলপার দ্বয় বোরহান ও লালন পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে বাস থেকে ফেলে দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
 গত ৫ই মে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ পাথরঘাটা গ্রামে দশম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ করতে না পেরে মা মেয়ে কে কামড়িয়ে জখম করে। চলতি মে মাসে প্রথম ৮দিনে সারা দেশে ৪১ টি শিশু ধর্ষণ ও ৩টি শিশু ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি মেয়ে শিশু ধর্ষণ ও ৪টি ছেলে শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ৩ জন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ৯ই মে সংবাদ সম্মেলন করে এই হিসাব দিয়েছে।
 দেশে  শিশু ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা শিশু ধর্ষণের প্রতিচলমান সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছে, বিচারহীনতার কারণে নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা অসহনীয় অবস্থায় উপনীত হয়েছে। শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গত বছর এ্যকশন এইডের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের শতকরা ৮৮ জন নারী রাস্তায় চলার পথে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের মুখোমুখি হন।এদের ৮৬ ভাগ গণপরিবহনের চালক ও হেলফারদের দ্বারা হয়রানিমূলক মন্তব্যের শিকার হয়।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যান সমিতির রিপোর্টে ১৩ মাসে গণপরিবহনে ২১ নারী ধর্ষণের কথা বলা হয়। বাস, প্রাইভেটকার,অটোরিকশা ও ট্রাকে এসব ঘটনা ঘটে।এর মধ্যে গণপরিবহনের চালক হেলপার সহ সহযোগীরা মিলে ৯টি গণ ধর্ষণ ৮টি ধর্ষণও ৪ টি শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটায়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া পরিসংখ্যান থেকে জানাযায়, গত ৫ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষনের শিকার হয়েছে। ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জন কে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশ শিশু কিশোরী। এর মধ্যে ৬ থেকে ১২ বছরের মেয়ে বেশী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। চলতি বছর জানুয়ারীর ১৮ দিনে ২৩টি  ধর্ষনের চেষ্টার খবর সংবাদ পত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন শিশু কিশোর। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয় এরাই বেশী। এছাড়া ধর্ষণের পর শতকরা ৯০ শতাংশ ঘটনা লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে প্রকাশ করে না। কি এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে আমরা দিনাতিপাত করছি। তবে আমাদের মধ্যে মস্তবড় এক গলদ রয়েছে-রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সদিইচ্ছার ভিতরে। সেই গলদের নাম বিচারহীন সংস্কৃতি। তুচ্ছ কারণে ধর্ষনের মত ঘটনা তখনই সংঘটিত হয়,যখন রাষ্ট্রে বিচারহীনতার পরিবেশ বিদ্যমান থাকে। এ সমাস্যাটি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এ কারণে যে,এই দেশে ধর্ষণের বিচার করার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতা এখন প্রকট।
আইন প্রয়োগকারীদের একটি অংশ ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি বিরুপ ধারণা প্রকাশ করেন। তারা নারীটির ব্যক্তিগত চরিত্র সর্ম্পকে সন্দেহ পোষণ করেন। ফলে ধর্ষণের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এরা আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করার জন্য যতটা আন্তরিকতার সাথে আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন,বাস্তবে তা ঘটতে দেখা যায় না। শুধু আইন প্রয়োগকারীদের মধ্যে নয়,অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। ফলে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বে ও প্রতিনিয়ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে।
চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ নারী নির্যাতনসহ গণ পরিবহনে যাত্রীকে পিটিয়ে হত্যা,গাড়ী থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে হত্যা,ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য ও যাত্রীদের জিম্মী করা সহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা পরিবহন শ্রমিকরা করছে না।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়,তাদের বিরুদ্ধে দৃটান্তমূলক শাস্তির নজীর নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় গণপরিবহণে নারী নির্যাতন ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। রুপা গণধর্ষণ-হত্যা সহ আগের ঘটনাগুলোর যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি  হতো এবং গণ পরিবহণের মালিকরা যদি শ্রমিকদের যথাযথভাবে সচেতন করতে পারতেন তাহলে এ ধরনের ঘটনা কমে আসতো।
গত বছর বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমে চলন্ত বাসে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টায় ২০টি ঘটনা পর্যালোচনা করে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ২০১৩ সালে দুটি,২০১৫ সালে চারটি,২০১৬ সালে তিনটি,২০১৭ সালে ৬টি,২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৭টি।
এখন এমন পরিস্থিতি দাড়িয়েছে, নারী শিশু বালক কেউ নিরাপদ নয়। ঘরে বাইরে মাঠে ঘাটে,অফিস আদালতে,বিশ্ব বিদ্যালয়ে,বাসে, ট্রেনে,লঞ্চে, নৌকায়,হাটে-বাজারে ধর্মালয়ে এ ধরনে ধর্ষণের ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। কোন জায়গা বাকী নেই। বয়সের কোন সীমা নেই। তবে  ভয়াবহ দিক হলো ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। মাদ্রাসার অধ্যক্ষের  যৌনাপরাধের ঢাকতে মাদরাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে মারার একটি জ্বলন্ত উদাহরন। নুসরাত মাদ্রাসা অধ্যক্ষের মনোস্কামনা পূরণ করলে এভাবে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হত না। নুসরাতের মত চরিত্রবান মেয়ে এ দেশের সম্পদ। আমরা আশা করি দেশে আর ও নুসরাতের জম্ম হবে। এই সমাজের নুসরাত-শাহিনুর তনু-মিতুর মতো অসংখ্য নারী হিংসার বলি হচ্ছেন। রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি ।
তবে আইন সালিশের জরিপে যে পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন,পুলিশ সদর দপ্তরের হিসেবে এই সময়ে ধর্ষন সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১৯ হাজারের বেশী। দেশে প্রতিদিন ১১টি করে ধর্ষণের মামলা হচ্ছে। কিন্তু মামলার নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম। নায্য বিচার থেকে অনেকে বঞ্চিত। ক্ষমতা আর অর্থের দাপটে অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে বিচার না পেয়ে আদালতের সিড়ি চোখের পানিতে ভিজাচ্ছে অনেকেই।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক এডভোকেট সালমা আলী ২০০৮ সালের ৭ই আগস্ট কর্মস্থল এবং শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশু যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য দিক নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে একটি রিট আবেদন করেন। শুনানী শেষে ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট রায় দেন। এ রায়ে হাইকোর্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ সব প্রতিষ্ঠানে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি’ নামে কমিটি গঠন করার আদেশ দেন।  হাইকোর্টের এ রায়ের পর বাংলাদেশ বিশ্ব বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন জিসিইউ একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে দেশের সরকারী বেসরকারী বিশ্ব বিদ্যালয়ে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিলে ও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এখন যৌন নির্যাতন বন্ধে মাধ্যমিক থেকে বিশ্ব বিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি কমিটি গঠনে রাষ্ট্রের কঠোর নির্দেশ প্রয়োজন।
হাই কোর্টের ওই রায়ে বলা হয়,কমিটিতে ৫ জন সদস্য থাকবে। এই কমিটির বেশীর ভাগ সদস্য হবে নারী। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে দুজন সদস্য নিতে হবে। সম্ভব হলে একজন নারী কে কমিটি প্রধান করতে হবে। যাতে মেয়েরা তাদের অভিযোগ গুলো মহিলাদের  কাছে পেশ করতে পারে।
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষা বর্ষের পাঠদান কার্যক্রমের শুরুতে এবং প্রতিমাসে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ওরিয়েন্টশনের  ব্যবস্থা করতে হবে এবং সংবিধানের বর্ণিত লিঙ্গীয় সমতা ও যৌন নিপীড়ন সম্পর্কিত দিক নির্দেশনাটি বই আকারে প্রকাশ করতে হবে। হাইকোর্টের এই নির্দেশনাটি আইনে রুপান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ নির্দেশনাই আইন হিসাবে কাজ করবে এবং সব সরকারী বে সরকারি  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। হাই কোর্টের রায়ে যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় বলা হয়, শারীরিক ও মানষিক যে কোনো  ধরনের নির্যাতন যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে। ই-মেইল, এসএমএস, টেলিফোনে বিড়ন্বনা, পর্নোগ্রাফি, যে কোন ধরনের অশালীন চিত্র,অশালীন উক্তিসহ কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সুন্দরী বলা ও যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। 
বর্তমান দেশের ৬৪ জেলায় ৫৮টি ট্রাইব্যুনালে পাঁচ বছরের বেশী সময় ধরে চলমান নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ৩৭ হাজারের বেশী। দেশের ৫৮ জেলায় পৃথক নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনাল থাকলে ও ৬টি জেলায় আলাদা কোন ট্রাইবুনাল নেই। সুতারাং ২০০০সালের আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। বিচার যত বিলন্ব হবে,তত সাক্ষীর স্মৃতিভ্রম,প্রমাণের ক্ষয় ঘটে,আবার এর মধ্যে কেউ মারা যেতে পারে। ফলে বাদী ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন আর আসামী আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ