বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি

আশিকুল হামিদ : পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি উপলক্ষে মানুষ এরই মধ্যে বাড়ি ফেরা শুরু করেছেন। কিন্তু শুরুতেই যথারীতি ঝামেলা বাধিয়েছে রেলওয়ে। দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, এবারও ট্রেনের ‘শিডিউল বিপর্যয়’ ঘটেছে। যেমন ৩১ মে রংপুর এক্সপ্রেস নামের যে ট্রেনটির সকাল নয়টায় ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল সে ট্রেন দুপুর ১২টায়ও কমলাপুর এসে পৌঁছায়নি। পরে কমলাপুর স্টেশনের তথ্য বিষয়ক ডিসপ্লেতে জানানো হয়েছে, ট্রেনটি বেলা দুইটা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে রওনা দেবে। শেষ পর্যন্ত ট্রেনটি ঢাকা ছেড়ে গেছে চারটার দিকে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের সাত ঘণ্টা পর। মাসের প্রথম দিন, ১ জুনও উত্তরবঙ্গগামী ছয়টি ট্রেন শিডিউল বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে। এমন অবস্থার অর্থ, ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনের মেঝেতে শুয়ে-বসে কাটাতে হয়েছে। ইরান থেকে ঈদ করতে আসা একটি পরিবার সদস্যদের ছবি ছাপিয়েছে একাধিক পত্রিকা। একটি খবরে জানা গেছে, রেলমন্ত্রী নাকি ‘শিডিউল বিপর্যয়’ এবং যাত্রীদের কষ্ট ও ভোগান্তির জন্য ‘মাফ’ চেয়েছেন! মন্ত্রীর এই দুঃখ প্রকাশ ও মাফ চাওয়ায় যাত্রীরা কি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সে সম্পর্কে কোনো গণমাধ্যমে অবশ্য কোনো রিপোর্ট চোখে পড়েনি।
এভাবে শুরু করার বিশেষ কারণ রয়েছে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও ঈদুল ফিতরের ছুটি উপলক্ষে মানুষের বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকে। লঞ্চ-স্টিমার, বাস ও ট্রেনের টিকেট যোগাড় করা এবং স্বজনদের জন্য নতুন জামা-কাপড় ও জুতা-স্যান্ডেল কেনা থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য যা কিছু করার সবই করেছেন মানুষ। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার এই একটি বিষয়ে বাংলাদেশের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের মধ্যেই অসাধারণ মিল রয়েছে। বাড়ি গিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি ঘর-বাড়ি নির্মাণ ও জমিজমা দেখাশোনা করাসহ পারিবারিক অন্য অনেক কাজও মানুষ এই কয়েকদিনে করে থাকেন। সব মিলিয়ে তাই ঈদের ছুটি এক বিরাট সুযোগ হয়ে আসে। ঘটনাক্রমে এবারের ছুটি বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মনে আনন্দও যে অনেক বেশি সেকথা সবাই জানেন। 
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, কোনো ঈদের ছুটিই মানুষের পক্ষে নির্বিঘ্নে ও আনন্দের সঙ্গে কাটানো সম্ভব হয় না।  ট্রেন ও বাসের টিকেট পাওয়ার জন্য রাত থেকে সারাদিন এমনকি ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা তো বিভিন্ন বয়সের নারীদেরও হচ্ছে। আজকাল তথা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু নয়, লজ্জাকর ও কষ্টদায়ক এ অভিজ্ঞতা হচ্ছে বহু বছর ধরেই। তাই বলে লাইনে দাঁড়ালেই কিন্তু টিকেট মেলে না, টাকা গুনতে হয় নির্ধারিত দামের চাইতে কয়েকগুণ বেশি। কারণ, সেখানে চলছে কালোবাজারীদের সর্বাত্মক দৌরাত্ম্য। মিডিয়ার রিপোর্ট ও জনগণের প্রতিবাদের মুখে কখনো কখনো লোক দেখানো গ্রেফতারের নাটক করা হলেও কালোবাজারীদের তৎপরতা যেমন বন্ধ হচ্ছে না তেমনি এ সত্যও প্রকাশিত হয়ে পড়ছে যে, রেলওয়ের কর্তাব্যক্তিরা তো বটেই, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকেও কালোবাজারে টিকেট কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত। এটা আসলে তাদের বার্ষিক একটি আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
ঈদের এ সময়ে বাসের টিকেটও সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যায় না। এবারও পাওয়া যায়নি। শেষদিনগুলো পর্যন্তও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। ২ জুনের একটি দৈনিকে ‘ঈদযাত্রায় চলছে ভাড়া নৈরাজ্য’ শিরোনামেও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ওদিকে মারাত্মক আশংকার সৃষ্টি হয়েছে লঞ্চ ও স্টিমারকে কেন্দ্র করে। কারণ, প্রায় তিন কোটি মানুষ যে লঞ্চ ও স্টিমারে যাতায়াত করেন সেগুলোর অবস্থাকে শোচনীয় বলাও যথেষ্ট নয়। এবারও বেশ কিছুদিন ধরেই ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা শত শত লঞ্চ ও স্টিমারকে লাল-নীল রং লাগিয়ে এবং বডিতে ঝালাই করে ‘প্রস্তুত’ করা হয়েছে। এসবের সচিত্র রিপোর্ট বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেও দেখানো হয়েছে, প্রতিদিনই দেখানো হচ্ছে। কিন্তু বিআইডাব্লিওটিএ বা সরকারের কোনো সংস্থাকেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। গণমাধ্যমে ছাদ বোঝাই করে যাত্রী নেয়ার সচিত্র রিপোর্ট দেখতে হচ্ছে এ বছরও। ফলে ধরেই নেয়া যায়, এবারের ঈদের ছুটিতেও লঞ্চ ও স্টিমার দুর্ঘটনায় মারা যাবে অসংখ্য মানুষ। কারণ, একে তো ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা লঞ্চ ও স্টিমার পুরো নৌপথ দখল করে রাখবে তার ওপর আবার ছাদেও শত শত যাত্রীকে দেখা যাবে। এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছেও। বলা যায়, লঞ্চ ও স্টিমারগুলো সদরঘাট থেকেই ডুবি ডুবি অবস্থায় যাত্রা শুরু করবে। যাত্রা আসলে শুরু হয়েছেও।
প্রসঙ্গক্রমে সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কের কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। কারণ, মুখে স্বীকার না করলেও দেখাই যাচ্ছে, সেতু ও সড়ক যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আর পেরে উঠছেন না! এর আগে কখনো তিনি সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে বলে শুনিয়ে এসেছেন। কখনো বলেছেন ঘন্টার হিসাব ধরে। কিন্তু কিছুতেই কাজের কাজ কিছু হয়নি- সবকিছু ঠিকঠাকও হয়নি। তবু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ, অন্যান্যবারের মতো এবারও তাকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ তদারকি করতে দেখেছে মানুষ। কিছুদিন আগেও গুরুতর অসুস্থ ছিলেন বলে এবার অবশ্য বেশি তৎপরতা চালাতে পারেননি তিনি। তা সত্ত্বেও বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হেলমেটহীন মোটর সাইকেল চালক ও আরোহীদের থামিয়ে জেরা করায় এবং হেলমেট পরার উপদেশ দেয়ায় মানুষকে হাসতে দেখা গেছে। কারণ, ওটা একজন মন্ত্রীর কাজ নয়। রসিকজনেরা বলেছেন, অসুস্থ থাকায় বহুদিন টিভি ক্যামেরার সামনে আসা হয়নি বলেই মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্ভবত ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ কথাটার ধার ধারেননি!
ওদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং কুমিল্লা হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নতি হয়েছে বলে প্রচারণা চালানো হলেও পর্যবেক্ষকরা আশংকা করছেন, এবারও সামান্য বৃষ্টিতেই ভেঙে পড়তে পারে প্রায় সব সড়ক-মহাসড়ক। কারণ, ‘যথাসময়ে’ সড়ক-মহাসড়কগুলোকে চালু করার ব্যাপারে তাড়া থাকায় অধিকাংশস্থানেই দায়সারাভাবে নির্মাণকাজ শেষ করেছে ঠিকাদাররা। সেজন্য  বহুস্থানে রয়ে গেছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত ও খানা-খন্দক। যানবাহন যতো বেশি চলাচল করবে ততো বেশি ইট-বালু-সিমেন্ট সরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এবড়ো-থেবড়ো হয়ে পড়বে প্রায় প্রতিটি সড়ক-মহাসড়ক। আর যদি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। বলা দরকার, অবস্থা এতটা শোচনীয় ও আশংকাজনক হতে পারতো না- মানুষের ভোগান্তি কমানোর জন্য সরকারের যদি সত্যি সদিচ্ছা থাকতো। তেমন ক্ষেত্রে সরকার অবশ্যই পবিত্র রমজানের আগেই সড়ক-মহাসড়কগুলোকে চালু করার এবং মেরামতের কাজ শুরু করতো। ঈদের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষ যে সড়ক পথে যাতায়াত করেন- এ ধারণাটুকু তো সেতু ও যোগাযোগমন্ত্রীসহ সরকারের করিৎকর্মা কর্তাব্যক্তিদের থাকা উচিত ছিল।
আমরা জানি না, ধারণা না থাকার কারণে নাকি ‘প্রাপ্তিযোগ’ ধরনের অন্য কোনো প্রশ্নসাপেক্ষ কারণে এবারও রমজান শুরু হওয়ার পরই রাস্তা মেরামতের নামে দৌড়ঝাঁপ করতে নেমে পড়েছিলেন কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু জনগণের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে তেমন কোনো সফলতাই দেখাতে পারেননি তারা। অসুস্থ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও কর্তাব্যক্তিদের দিকেই তাকিয়ে থেকেছেন। একই কারণে ঈদের ছুটির সময় দুর্ঘটনার এবং প্রণহানির আশংকাও প্রবলতর হতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছেও। একই কারণে উদ্বিগ্ন সকল মহলের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি তৎপর হয়ে ওঠার জন্য দাবি জানানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, সরকার সতর্ক না হলে এবং দ্রুত জরুরি কিছু পদক্ষেপ না নিলে এবারও ঈদের ছুটিতে জীবন হারাবেন অসংখ্য মানুষ। বস্তুত এ শুধু কথার কথা নয়, কঠোর সত্যও যে, স্বাভাবিক সময়ের পাশাপাশি বিশেষ করে পবিত্র ঈদের সময় প্রতি বছর এত বেশি প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার মতো অবস্থা বাংলাদেশের নেই। এজন্যই সড়ক-মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করার ব্যবস্থা নিতেই হবে। অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন কেউ যাতে চালকের আসনে বসতে না পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রয়েছে ত্রুটিযুক্ত যানবাহন। উৎকোচের বিনিময়ে ত্রুটিযুক্ত, এমনকি লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা অসংখ্য যানবাহনও দেশের সব অঞ্চলে চলাচল করছে। দুর্ঘটনা কমাতে চাইলে এ ধরনের কোনো যানবাহনকে মহাসড়কে চলাচল করতে দেয়া যাবে না। একযোগে ট্রাফিক আইনেরও কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। চালকরা যাতে আইন মেনে চলে এবং পাল্লা দিতে বা ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা না ঘটায় এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। নজরদারির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ, তারা আবার ঘুষ বাণিজ্যের ব্যাপারেই বেশি উৎসাহী!
এভাবে সব মিলিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হলেই সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে আসতে পারে বলে মনে করেন উদ্বিগ্ন পর্যবেক্ষকরা। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তেমন ব্যবস্থাই নেয়া দরকার। এই ব্যবস্থা  নিতে হবে সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতেÑ যার মধ্যে বাস ও ট্রেন তো বটেই, লঞ্চ ও স্টিমারসহ সব ধরনের নৌযানকেও অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, সরকার এবং মন্ত্রীসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা অন্তত একটি কথা বুঝতে ভুল এবং বিলম্ব কোনোটাই করবেন না। কথাটা হলো, বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের আশা ও আশ্বাসের পুনরাবৃত্তি শুনে এসেছে বলেই জনগণ আর শুধু মিষ্টি কথা শুনতে চায় না। তারা কাজ দেখতে চায়। বড় কথা, প্রতিবার পবিত্র ঈদের সময় শত শত স্বজনের মৃত্যু ও লাশ দেখতে চায় না তারা। এত মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার মতো ক্ষমতা নেই মানুষের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ