শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নির্বাচন এবং সংসদে যোগদান বিএনপি হাইকমান্ডের অন্তর্দ্বন্দ্ব

আওয়ামী লীগ বিএনপির যে ৬ জনকে গত সংসদ নির্বাচনে ছাড় দিয়েছিল তাদের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিএনপি হাইকমান্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। গত বুধবার ২৯মে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী  উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের  মতবিরোধ প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে। বিএনপির শীর্ষ নেতা, স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য এবং সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ বলেন যে, বর্তমান অনির্বাচিত অবৈধ সংসদে বিএনপি সদস্যদের যোগদানকে কেন্দ্র করে দলের সর্বস্তরে গভীর ক্ষোভ এবং বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। যদি এই বিভ্রান্তি দূর করা না যায় তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে না। ৩০ মে বৃহস্পতিবার ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজে’ প্রকাশিত খবর মোতাবেক ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, বিএনপির ঐ ৫ ব্যক্তি অকস্মাৎ জাতীয় সংসদে যোগদান করার ফলে সর্বস্তরের নেতা ও কর্মীদের মাঝে অসন্তোষ এবং বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। জনগণের মধ্যে সর্বস্তরের মানুষ বিএনপির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নানান প্রশ্ন তুলছেন। এসব প্রশ্নের জবাব আমাদেরকে অবশ্যই দিতে হবে। এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাবের জন্য আমাদেরকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এই উদ্দেশ্যে তিনি জাতীয় কার্যকরী পরিষদে বর্ধিত সভার আহ্বান জানান। এছাড়া সেই সভায় অঙ্গ সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দও যাতে যোগদান করেন তার ব্যবস্থা করতে হবে। তার মতে, আলোচনার মাধ্যমে এই ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হবে।
ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, বিগত নির্বাচন অর্থাৎ একাদশ পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সাথে সাথে বিএনপি সেই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। বিএনপির তরফ থেকে এই পার্লামেন্টকে অনির্বাচিত এবং অবৈধ বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি বলেন, বিএনপি হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই আমাদের দল  বর্তমান সরকারের অধীনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এই সিদ্ধান্ত লংঘন করে যারা উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমাদের অনেক নেতা এবং কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ৩০০টি আসনের অনেককে মারধর করা হয়েছে এবং জখম করা হয়েছে।
আমাদের হাজার হাজার নেতা ও কর্মীকে মিথ্যা মামলায় জড়িত করা হয়েছে এবং কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এতসব কিছুর পর এই পার্লামেন্টে যোগদানের আকস্মিক সিদ্ধান্ত দলের সর্বস্তরের নেতা ও কর্মীদের চরম ভাবে হতাশ করেছে।
তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জেলে এবং আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয় তাই এই মুহূর্তে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশ এখন এক নির্মম একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কবলে পতিত। এই পরিস্থিতিতে দলকে শক্তিশালী করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আমাদেরকেও নেতৃত্ব থেকে অপসারণ করুন এবং নতুন নেতৃত্বের হাতে দলকে তুলে দিন।
এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মওদুদের পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তৃতা করেন। কিন্তু ব্যারিস্টার মওদুদ যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেন তিনি সে ব্যাপারে একটি কথাও বলেন নি। বরং দলের নেতা ও কর্মীদেরকে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানান।
ড. কামালের সাথে ঐক্যফ্রন্ট গঠন এবং সংসদে যোগদান প্রশ্নে শুধুমাত্র ব্যারিস্টার মওদুদই প্রবল বিরোধিতা করছেন না।  আসলে নির্বাচনের কিছু দিন পর থেকেই বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের মাঝে পুঞ্জিভূত অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে । সর্বপ্রথম এই বিস্ফোরণ ঘটান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন পর ১৩ জানুয়ারি  স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, কামাল হোসেনের সাথে ঐক্য করে নির্বাচনে যাওয়াটাই বিএনপির মস্তবড় ভুল ছিল। সরকারের সাথে কামাল হোসেনের আগে থেকেই গোপন আঁতাত ছিল। তাই দেখা যায় যে, বিএনপি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও সরকার বিএনপিকে ছাড় দিয়েছে মাত্র ৬টি আসনে। আর গণফোরাম দেশের সবেচেয়ে ছোট রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও সরকার তাকে ছাড় দিয়েছে ২টি আসনে।
নির্বাচন ও সংসদে যোগদান সম্পর্কে বিএনপির ধোঁয়াশে অবস্থানের সরব প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এলডিপি নেতা কর্নেল অলি আহমেদ। তার অভিযোগ মোতাবেক, বিএনপি সরকারের সাথে গোপন আঁতাত করেছে এবং সরকারের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা খেয়ে বিএনপি নির্বাচন থেকে উইথড্র করেনি এবং শেষ মুহূর্তে সংসদে যোগদান করেছে।
জনগণ বিএনপির ব্যাপারে শুধুমাত্র বিভ্রান্ত নয়, রীতিমতো উ™£ান্ত হয়েছেন বেগম জিয়ার কথায়। তার অমতেই তাকে বগুড়া উপ-নির্বাচনের ক্যান্ডিডেট করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে নমিনেশন পেপারে সই করেননি এবং বলেছেন যে, হামলা মামলা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নেওয়া, অবৈধ সংসদে বিএনপির ৬ জন নেতার অংশ গ্রহণে তার কোনো সম্মতি নেই। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রশ্ন, বিএনপিতে খাটবে কার কথা? বেগম খালেদা জিয়ার কথা? নাকি ফখরুল এবং অদৃশ্য একটি শক্তির কথা? 
বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী আসিফ নজরুল এব্যাপারে কঠোর মন্তব্য করেছেন। গত ২৫ মে নাগরিক ঐক্যের ইফতার মাহফিলে বক্তৃতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের লজ্জা থাকা উচিত। তিনি বলেন, এতবড় একটা জঘন্য নির্বাচন হয়ে গেল, বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষ যার সাক্ষী। অথচ আমরা নির্বাচনের দিন বেলা ১১টার দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বলতে শুনলাম নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে। উনার লজ্জা হওয়া উচিত। আমরা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষ নির্বাচনের দুই তিনদিন আগে থেকে জানি কি হচ্ছে। আর উনি জানেন না নির্বাচনে কি হচ্ছে?
ঐক্যফ্রন্ট সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর মন্তব্য করেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। গত ২৫ মার্চ বিএনপির সাবেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, কেনো এই নির্বাচনে আমরা গেলাম। কথা হলো- নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না, কিন্তু তাতো হলো না। দলীয় সরকারের অধীনেই হলো। কথা হলো খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন হবে না। কিন্তু খালেদা জিয়া ছাড়া আমরা নির্বাচনে গেলাম। তারপরও কেনো সেই নির্বাচন। কেনো এই অবস্থা হলো? কেনো আজো খালেদা জিয়া জেলে? কেনো একটা দাবিও সরকার মানলো না, কী কারণে এটা হলো? এর কারণ অবশ্যই বের করতে হবে। যদি বের করতে ব্যর্থ হই তাহলে আমরা আবার  ব্যর্থ হবো। আমার অনেক প্রশ্ন আছে । আজকে এখানে করব না। দলীয় মিটিংয়ে বলব।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের নাম উল্লেখ না করে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আমি স্বাধীনতার ইতিহাস জানি। সে সময়ে কে যায় নাই ভারতে? আমরা সব চলে গেলাম। এনটায়ার কেবিনেট চলে গেলো। গভর্নর হাউজে (বর্তমানে বঙ্গভবন) ইয়াহিয়া খানের সাথে কথা বলার সময়ে যে ব্যক্তি ছিল সর্বক্ষণ, সে গেলো না। তাজউদ্দিন আহমেদ সাহেবের রিসেন্টলি একটা বই বেরিয়েছে। সেটা আপনারা পড়বেন- সেটাতে লেখা আছে তার যাওয়ার কথা ছিল আমাদের সাথে। সে যায়নি। আমি নাম বলতে চাই না এই মুহূর্তে। ১৪ জুন পর্যন্ত ঢাকা থাকলেন, তারপর জিওসিকে টেলিফোন করে বললেন, আমাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দাও। পাঠিয়ে দেয়া হলো। তার স্ত্রী একজন সিন্ধি। তিনি বলেন, আমরা তার (ড. কামাল হোসেন) ইতিহাস জানি। বাংলাদেশে তার কোনোদিন কোনো আসন ছিলো না।
এছাড়াও  আরও অনেকে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের নিষ্ক্রিয়তা এবং আন্দোলনবিমুখিতা সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন। এগুলো অতি সাম্প্রতিক বলে এখানে তার পুনরাবৃত্তি করলাম না।
তবে একটি কথা ঠিক যে বিএনপির সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে সেই বিভ্রান্তি দূর না হলে আখেরে বিএনপি দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। 
এই পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ ছিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক। সেই বৈঠকে শুধুমাত্র বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি নয়, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মওদুদ আহমেদ এবং মেজর হাফিজ উদ্দিনসহ সকলের উত্থাপিত অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলোচনা করা এবং কোনোরূপ জোড়াতালি না দিয়ে সত্যিকারের অনুযোগগুলোর একটি উভয়পক্ষের নিকট গ্রহণযোগ্য সন্তোষজনক সমাধান।
দ্বিতীয় ধাপ হলো, মওদুদ সাহেবের সুপারিশকৃত সমাধান। শুধুমাত্র স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করলে হবে না। তৃণমূলের নেতা ও কর্মীরাও যাতে খুশি মনে সেই সমাধান গ্রহণ করতে পারে তার জন্য পর্যায়ক্রমে দেশের বিভাগওয়ারী দলীয় নেতৃবৃন্দকে ঢাকায় ডাকা এবং তাদের সঙ্গে একটি উভয়পক্ষের গ্রহণযোগ্য ও সন্তোষজনক সমাধান খুঁজে বের করা। এটার প্রয়োজনের জন্যই যে এইবার শুধু নেতাদের মধ্যেই এমন ইস্যু নিয়ে মতবিরোধ শুরু হয়নি, সেই মতবিরোধ ছড়িয়ে গেছে সারাদেশের তৃণমূল নেতা ও কর্মীদের মাঝে। আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতা আজ যে কথা বলেন, আগামীকাল সে কথা তাদের তৃণমূলে প্রতিধ্বনিত হয়।
আমাদের বিশ্বাস, এখন যে মতবিরোধ বিএনপির মধ্যে শুরু হয়েছে, সময়ের আবর্তনে সেটি সেরে যাবে। কিন্তু পানির যদি স্রোত না থাকে তাহলে সেখানে শ্যাওলা পড়ে যাবে। তেমন একটি রাজনৈতিক দলের যদি গতি না থাকে তাহলে সেখানেও শ্যাওলা পড়ে যায়।  রাজনৈতিক দলে শ্যাওলা সৃষ্টি মানেই দল উপদলে দলটি বহুধা বিভক্ত হয় এবং এক সময় দলের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে।
তাই বিএনপির মধ্যে যে শ্যাওলা জমেছে সেটি দূর করার একমাত্র উপায় হলো প্রবল গণআন্দোলন সৃষ্টি করা। সেই গণআন্দোলনের তোড়ে বিএনপির শ্যাওলা তথা মতভেদ এবং উপদলীয় কোন্দল ভেসে যাবে। মনে রাখা দরকার যে, এখন দেশের মানুষের ওপর এক ব্যক্তির শাসনের এক ভয়াবহ স্বৈরতন্ত্রের জগদ্দল পাথর চেপে বসে আছে।
Email:asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ