মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ফিলিস্তিন সংকট : ব্যালফুর ডিক্লারেশন ও ট্রাম্পের ঘোষণা

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ ভূঞা : আজকের ব্রিটেনের ছাত্রদের নিকট হয়তোবা আর্থার ব্যালফুরের নাম প্রায় অপরিচতই মনে হবে;  কিন্তু ইসরায়েলী বা ফিলিস্তিনী ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলে তাদের অনেকেই দু-চার কথা বলতে পারবে তার সম্পর্কে। কারণ ১৯১৭ সালের নভেম্বরের ২ তারিখ ব্রিটেনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা মধ্যপ্রাচ্যের ওই অঞ্চলটির ইতিহাসের মোড় বদলে দেয়। বলা যায়, সেখান থেকেই ফিলিস্তিন সংকটের সূচনা। এই ব্যালফুর ঘোষণার মধ্য দিয়েই প্রথম ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভাবনাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। যা পরবর্তীকালে পরিচিতি পায় ‘ব্যালফুর ডিক্লারেশন’ নামে।
ঊনবিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে আধিপত্যের বলয় বাড়ানো নিয়ে তিন ইউরোপীয় দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তারা নানা অপকৌশল অবলম্বন করেছিল। ফিলিস্তিনী ভূখন্ডের ওপরও তাদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। কারণ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে এই ফিলিস্তিন। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি একটি কৌশলগত অঞ্চল। সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের শাসনামলে ফিলিস্তিন  নিজের উপনিবেশে পরিণত করার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালায় ফ্রান্স।
ফ্রান্সের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি টের পেয়ে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নেয় ব্রিটেন। এ পরিকল্পনার আওতায় সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। এরই আওতায় দখল হয়ে যায় কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক ফিলিস্তিন। ওসমানীয় সাম্রাজ্য যখন ক্ষয়িষ্ণু তখন পাশ্চাত্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব চলছিল। এ অবস্থায় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন্মুখ পরিস্থিতি ইউরোপকে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়। তাদের আধিপত্য বিস্তারের  জন্য দু’টি জিনিস প্রয়োজন ছিল। এক- মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের একাংশ নিয়ে গঠিত উসমানীয় সা¤্রাজ্যকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। দুই- টুকরো টুকরো ভূখন্ডে পাশ্চাত্যের স্বার্থ সংরক্ষণকারী পুতুল সরকার বসানো।
ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও মুসলিম বিশ্বের প্রভাব ক্ষুন্ন করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৮৯৭ সালে থিয়োডর হার্জেল ও তার সহযোগীরা সুইজারল্যান্ডে এক সমাবেশের মাধ্যমে বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। হার্জেল পরবর্তীতে ইহুদিবাদের জনক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিশ্বে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তার বড় লক্ষ্য। কোথায় ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে, সে ইস্যু সামনে আসলে বিভিন্ন এলাকার নাম উত্থাপিত হয়। হার্জেল ফিলিস্তিন ইহুদিদের জন্য প্রথম রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের পক্ষে ছিলেন। ওসমানীয় সাম্রাজ্য হার্জেলের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজি না হওয়ায় হার্জেলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদীদের নানা ষড়যন্ত্রের মাঝেই শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে নয়া শক্তির সমীকরণের এক পর্যায়ে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এরপর বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে। ইহুদিবাদের প্রতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সমর্থন ফিলিস্তিনে প্রথম ইহুদিবাদী সরকার গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করে।
১৯১৭ সালে উপনিবেশবাদী ব্রিটেন ও বিশ্ব ইহুদিবাদের মধ্যে সম্পর্কের নয়া অধ্যায় শুরু হয়। ঐ বছর তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফুর ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। ব্যালফুরের চিঠিতে মাত্র ৬৭ শব্দের একটি অংশে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকার ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য ফিলিস্তিনে একটি রাষ্ট্র গঠন সমর্থন করে। তবে একই সাথে বলা হয়: সেখানে অ-ইহুদি যে জনগোষ্ঠী এখন আছে তাদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার কোনভাবেই বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। যদিও এটা ছিল এক বিরাট প্রতারণা। যেমন অটোমান শাসনাধীন আরবদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের কথা বলে প্রতারণা করেছিল ব্রিটেন। আর্থার ব্যালফুর ১৯২৫ সালে জেরুজালেম সফর করেন শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে; কিন্তু আজও আলোর মুখ দেখেনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। এখানেই ইঙ্গ মার্কিন ষড়যন্ত্রের বীজ প্রোথিত।
১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইঙ্গ-মার্কিন চাপে জাতিসংঘে ভোট গ্রহণ হয় তাতে ৩৩টি রাষ্ট্র পক্ষে, ১৩টি বিরুদ্ধে এবং ১০টি ভোট দানে বিরত থাকে। প্রস্তাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদিরা পেল ভূমির ৫৭% আর ফিলিস্তিনিরা পেল ৪৩% । তবে প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত যাতে ভবিষ্যতে ইহুদিরা সীমানা বাড়াতে পারে। ফলে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা চূড়ান্ত হলেও উপেক্ষিত থেকে যায় ফিলিস্তিন। জাতিসংঘের মাধ্যমে পাস হয়ে যায় একটি অবৈধ ও অযৌক্তিক প্রস্তাব। প্রহসনের নাটকে জিতে গিয়ে ইহুদিরা হয়ে ওঠে আরো হিংস্র। তারা হত্যা সন্ত্রাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে রাতে তাদের ফোন লাইন, বিদ্যুৎ লাইন কাটা, বাড়ি ঘরে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, জোর করে জমি দখল এবং বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতন করে মৃত্যু বিভীষিকা সৃষ্টি করতে লাগলো। ফলে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাধ্য হলো দেশ ত্যাগ করতে। অপরদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত  থেকে ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিনে নিয়ে আসা হয়। ফিলিস্তিনীদের জমি দখল করে ইহুদিবাদীদের জন্য স্থায়ী আবাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনীদের ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়।
ইহুদিদের বসতি স্থাপন ও আরবদের উচ্ছেদকরণ চলতে থাকে খুব দ্রুত। ফলে ২০ লাখ বসতির মধ্যে বহিরাগত ইহুদির সংখ্যাই দাড়ালো ৫ লাখ ৪০ হাজার।
এভাবে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সেখানে ইসরায়েলি আইন চাপিয়ে দেয় এবং হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডকে নিজেদের ভূখণ্ডে পরিণত করে। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের নাগরিকত্ব বাতিল করে, তাও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। জাতিসংঘ একাধিক প্রস্তাব পাস করে জানিয়ে দিয়েছে, ইসরায়েলের 'সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট' চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তাছাড়া ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফিলিস্তিন, ইহুদি ও আরব রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার পর জেরুজালেম বিশেষ মর্যাদা পায় এবং আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে আসে। ফলে সেখানে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের সুযোগ নেই। তথাপি আইন ভেঙ্গে ১৯৬৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েল ইহুদি নাগরিকদের জন্যে জেরুজালেমে অনেক আবাসিক প্রকল্প গড়ে তুলে এবং ১৯৮০ সালে 'জেরুজালেম আইন' পাস করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করে। দাবি করে, এলাকাটি অবিভক্ত। এর জবাবে জাতিসংঘ জেরুজালেম নিয়ে ১৯৮০ সালে সংশোধিত ৪৭৮ নম্বর প্রস্তাবে ইসরায়েলের ঐ আইনটি অকার্যকর ও বাতিল ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এখনও পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখল করা অঞ্চল বলেই মনে করে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বরাবরই মেনে আসছে যে, জেরুজালেম শহরের মর্যাদা, মালিকানা নির্ধারিত হবে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি রফার অংশ হিসেবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে তা লিখিত আকারে রয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এ অবস্থায় ৬ ডিসেম্বর (বুধবার) ২০১৭  যুক্তরাষ্ট্রের জেরুজালেমকে ইসরায়েলের একতরফা রাজধানী স্বীকৃতির ঘোষণা শান্তির প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে চরম সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। বিক্ষোভ-সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর। বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে মুসলিম বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে ফের সংঘাত উসকে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত কয়েক দশক ধরে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সঙ্কট সমাধানের নীতি সমর্থন করে আসছিল জাতিসংঘ, আরব লীগ, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু হঠাৎ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে হোয়াইট হাউজের এক সংবাদ সম্মেলনে দ্বি-রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত সমাধানের নীতি শিথিল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন- "দুই রাষ্ট্র বা এক রাষ্ট্র যেটাই হোক, দুই পক্ষ যেটা পছন্দ করবে সেটাই আমি পছন্দ করবো। যে কোনটি হলেই হয়। বিবি (নেতানিয়াহু), ইসরায়েলিরা এবং ফিলিস্তিনিরা যেটিতে খুশি, তাতে আমিও খুশি। আর আমি দেখতে চাই যে দূতাবাস জেরুজালেমে সরানো হোক। বিষয়টি আমরা খুব যতেœর সাথে দেখছি"।
এ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ঝুলে থাকা ফিলিস্তিনিদের দ্বি-রাষ্ট্র নীতির স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরানোর ঘোষণা দিয়ে রক্তাক্ত ফিলিস্তিনীদের গায়ে নুনের ছিটা দিয়ে বসলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ১৪মে ২০১৮ তারিখ সোমবার জেরুজালেমে উদ্বোধন করা হয়েছে মার্কিন দূতাবাস। এ যেন ফিলিস্তিনিদের ভূমি গ্রাস করা ও পশ্চিম তীরে ইহুদি কলোনি নির্মাণ বাড়ানোর জন্য তিনি ইসরাইলিদের হাত মুক্ত করে দিয়েছেন এবং ইসরাইলি বাহিনীকে সাহস দিয়েছেন নিষ্পাপ প্রতিবাদকারীদের হত্যা করার জন্য। তার প্রতিশ্রুত শান্তি পরিকল্পনা কোথায়? ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ‘চূড়ান্ত চুক্তি’র বিষয়ে তার প্রতিজ্ঞার ভাগ্যে বা কী ঘটেছে? যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপে বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিনিরা। নিজের পিতৃপুরুষের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়ে সেখানে প্রতিবাদ করেছে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্য করে উন্মুক্তভাবে গুলি চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। ড্রোন দিয়ে ছোড়া হয়েছে কাঁদানে গ্যাস। বিক্ষোভরত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ৬২ জন এবং আহত হয়েছে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। সাংবাদিক, ডাক্তার এমনকি শিশু পর্যন্ত ওতপেতে থাকা ইসরাইলি হামলাকারীদের বুলেটের আঘাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারেনি।
সম্প্রতি ইসলাম ও মানবতার দুশমন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামকে চিরতরে নিঃশেষ করার লক্ষে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র মূলক চুক্তি( ডিল অফ দা সেঞ্চুরি/ শতাব্দীর সেরা চুক্তি) স্বাক্ষর করেছে। যে মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ই ইউ সহ বিশ্বের প্রায় সকল পক্ষ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কে মেনে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছার জন্য তৎপর, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কতিপয় আরব রাষ্ট্রের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রকে সমূলে বিনাশ করার লক্ষ্যে ইহুদিবাদী ইসরাইল শতাব্দীর সেরা চুক্তি স্বাক্ষর করে তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।
এ চুক্তি মোতাবেক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব নেই। গাজা উপত্যকা, যিহুদীয়া পার্বত্য অঞ্চল ও পশ্চিম তীরের সামারিয়া অঞ্চল ‘নিউ প্যালেস্টাইন’ নামে পরিচিত হবে। আর বাকি সব অঞ্চল এমনকি এসব এলাকার ইহুদি বসতি গুলো সব স্বাধীন রাষ্ট্র ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জেরুজালেম ইসরায়ল ও নিউ প্যালেস্টাইন এর যৌথ রাজধানী হবে। আরবরা নিউ প্যালেস্টাইন এবং ইহুদীরা ইসরাইলের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। নিউ প্যালেস্টাইনের কোন সেনাবাহিনী থাকবেনা । হালকা অস্ত্রধারী পুলিশ থাকবে। বহিশত্রু থেকে তাদের প্রতি রক্ষার দায়িত্বে থাকবে ইসরাইল। অর্থাৎ সেনাবাহিনী অস্ত্রভা-ার সবই থাকবে ইহুদিদের ও ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরাইলি পৌরসভার হাতে। তবে শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকবে তথাকথিত নিউ প্যালেস্টাইন সরকার।
পি এলও, হামাস ও ইসরাইল এর মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তি করে এর বাস্তবায়ন করা হবে। পি এল ও যদি চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে তাদের সকল সাহায্য বন্ধ করে দেয়া হবে ।অন্যদিকে হামাস যদি রাজি না হয় ,তাহলে সরাসরি যুদ্ধ করে হামাসকে নির্মূল করে দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশগ্রহণ করবে। সৌদি আরব, মিশর, আমিরাত ও জর্ডান এ চুক্তির পক্ষে ইতিমধ্যেই প্রচারণা শুরু করেছে। সৌদি যুবরাজ পি এল ও কে বিশাল অংকের টাকা আর সাহায্যের কথা বলে চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও পি এল ও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যেই রাশিয়া ও ই ইউর প্রতি এই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিন এখন মুসলিম শিশু, নারী-পুরুষের রক্তে রঞ্জিত এক জনপথ। আজ ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ঘরে-ঘরে সন্তান হারানোর বেদনা আর আহাজারী। কাঁদতে কাঁদতে এখন যেন চোখে পানিও নেই। শোকের পাহাড় বয়ে চলছে প্রতিটি পরিবার। রক্তপিপাসু ইসরাইলের মুল লক্ষ্য এবার মুসলমানদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিঃশেষ করে দেয়া। নিহতের বেশীর ভাগই শিশু। ইসরাইলের সন্ত্রাসীরা আজ সেই জঘন্য কাজটি করছে। রাস্তার পাশে লাশের সারি! সর্বত্র মানুষের খন্ড বিখন্ড শরীরের টুকরা। রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সব জায়গায়! কোথায় তাদের বাড়ি-ঘর! কোথায় তাদের ঠিকানা! স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, হাসপাতাল সব জায়গায় চলছে অব্যাহত হামলা। পৃথিবীতে হাসপাতালগুলোতে আক্রমণ  যুদ্ধরীতি বিরুদ্ধ হলেও কোন আইন, নীতি, মানবিকতা কোন কিছুরই তোয়াক্কা করছেনা ইসরাইল। ইহুদীরা এ যেন রক্তের হোলি খেলায় লিপ্ত! এ হচ্ছে  মানবিকতার বিরুদ্ধে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় আঘাত। এ কোন অসম যুদ্ধ!! এতো কোন যুদ্ধ নয় এ হচ্ছে গণহত্যা।
ইসরাইল ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ করছে বলে অভিযোগ এনেছে আরব লীগ এবং সংস্থাটি একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান ইসরাইলকে গণহত্যায় লিপ্ত একটি ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং মুসলিম বিশ্বকে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আরব নেতারা তাদের ক্ষোভ দেখিয়েছেন; কিন্তু কতক্ষণ পর্যন্ত একে তারা কাজে লাগাবেন? তিক্ত সত্য হল, যতক্ষণ পর্যন্ত ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ছাতার নিচে সুরক্ষা ও প্রশ্রয় পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশটি সর্বোচ্চ দায়মুক্তির সঙ্গে নৃশংস আচরণ চালিয়ে যাবে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউএনএইচআরসি) গাজায় নিরস্ত্র প্রতিবাদকারীদের ইসরাইল কর্তৃক হত্যার তদন্তে স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশনের তদন্তের পক্ষে ভোট দিয়েছে; কিন্তু এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিরস্ত্র ক্ষতিগ্রস্তদেরই দায়ী করেছে এবং নিজের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। এমনকি যদি এ তদন্ত জোরালো ভিত্তি পায়ও, ইসরাইল এর সঙ্গে সহযোগিতা না করার শপথ করেছে এবং কেবল নিজেদের ইউএনএইচআরসি থেকে প্রত্যাহারের চিন্তাই করছে না, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকেও তাদের অনুসরণ করতে চাপ দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস যথার্থ বলেছেন, ’সৎ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের দাবি খুইয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য কোনো প্রশাসনই পরিপূর্ণভাবে পক্ষপাতমুক্ত নয়; কিন্তু কেউই ট্রাম্প প্রশাসনের মতো ইসরাইলের প্রতি নির্লজ্জ পক্ষপাতদুষ্টও নয়।’
যেখানে নিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক আলোচকদের মধ্যে খোদ জামাতা জারেড কুশনার ইহুদি দখলদারি বাড়াতে কলোনি নির্মাণে অর্থ দিয়েছেন এবং ট্রাম্পের আইনজীবী একজন গোঁড়া ইহুদি জেসন গ্রিনব্লাট, যিনি একসময় পশ্চিম তীরের একটি কলোনি পাহারা দিয়েছেন, সেখানে ট্রাম্প কি এ বিষয়ে আন্তরিক হতে পারবেন?
আত্মবিধ্বংসী ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু নাকের ডগায় করে বিশ্বকে ইতিহাসের কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। হয়ত সেদিন বেশী দুরে নয়, যেদিন ইসরাইল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, গোটা পৃথিবীর জন্য। তাই এখনই মুসলিম উম্মাহকে ইহুদীবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সোচ্চার হতে হবে মুসলমানদের পবিত্রভূমি পুনরুদ্ধার সংগ্রামে। আল্লাহ তায়ালা মজলুমের সহায় হোন।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ