মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বায়তুল মুকাররম মসজিদ হুমকিতে?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ইফার ডিজি থানায় জিডি করেছেন। ধর্মমন্ত্রণালয়েও দিয়েছেন নালিশ। কিন্তু লক্ষণ তেমন শুভ মনে হচ্ছে না। অভিযোগ অনুসারে সত্যি সত্যি কোনও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলে মহা কেলেঙ্কারি হবে এটা বলাই যায়। আল্লাহ না করুন, এমন কোনও বিপর্যয় ঘটুক। হ্যাঁ, বিষয়টা একটু খোলাসা করেই বলি:
বায়তুল মুকাররম মসজিদটি যেমন সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন, তেমনই আমাদের গৌরবময় জাতীয় স্থাপনাও। উল্লেখ্য, মুসল্লি ধারণক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের দশম বৃহত্তম মসজিদ এটি। অভিযোগ উঠেছে, জাতীয় এ স্থাপনাটির ভার বহনকারী মূল দুটো পিলারের একটি এবং এর সঙ্গে যুক্ত ১৫ ফুট দেয়াল রাতের অন্ধকারে ভেঙে সহধর্মিণীর  মালিকানাধীন দোকানটি বড় করেছেন ক্ষমতাবান দলটির স্থানীয় এক নেতা।
ঘটনাটি নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়। গঠন করা হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। এদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর গত ২০ মার্চ ধর্মমন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত রিপোর্টও পাঠানো হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।
বলা হয়েছে, মসজিদের ভার বহনকারী পিলার ও দেয়াল ভেঙে ফেলবার দরুন যেকোনও সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিযুক্ত নেতার নাম সোহরাব হোসেন গাজী। তিনি দলটির বায়তুল মুকাররম ইউনিট সভাপতি।
দোকানটির মালিকানা নেতার সহধর্মিণী শায়লা আক্তারের নামে। গত ২২ মে বুধবারও দেখা গেছে, প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের দোকানটি বহাল তবিয়তেই চলছে অভিযুক্তদের মালিকানায়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল স্বাক্ষরিত যে রিপোর্টটি ধর্মমন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়, তাতে উল্লেখ আছে, গত বছর ১৬ অক্টোবর মধ্যরাতে বায়তুল মুকাররম মসজিদ-মার্কেট কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালনকালে নৈশপ্রহরীরা ইলেকট্রনিক্স মার্কেটে বিকট শব্দ পেয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সবকয়টি গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান তাঁরা। অনেক অনুরোধ করলেও ব্যবসায়ীদের নিয়োগকৃত গার্ডরা ভেতর থেকে তালা খোলেননি। সকালে খোঁজ নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, বায়তুল মুকাররমের অভ্যন্তরে অবস্থিত মসজিদ ভবনের মূল লোড বহনকারী একটি পিলার অপসারণ করে নিউ সুপার মার্কেটের এইচ-৬ নম্বর দোকানের আয়তন বড় করা হয়। রাতের অন্ধকারেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে দোকানটির ছাদ প্লাস্টার ও চুনকাম করা হয়েছে। ফ্লোরেও বসানো হয়েছে টাইলস।
এ ব্যাপারে গত ২৪ অক্টোবর পল্টন থানায় জিডি করেন বায়তুল মুকাররম মসজিদ ও মার্কেটের সিকিউরিটি সুপারভাইজার নুরুল হক। জিডি নং ১৮৯৯। রিপোর্টে বলা হয়, উল্লেখিত দোকানটির ভেতরে ২৪.৭৭ বর্গফুট ব্যাসের একটি লোডবিয়ারিং পিলার ছিল। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে সেটি অপসারণ করা হয়।
এ পিলারের সঙ্গে সংযুক্ত ১৫ ফুট লোডবিয়ারিং দেয়ালটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। যে-পিলারটি ভেঙে ফেলা হয়েছে, সেটির সমান্তরাল উত্তর পাশে আরেকটি পিলার রয়েছে। মূলত এ দুটো পিলারের ওপরই মসজিদভবনটির লোড পড়েছে। পিলার ও দেয়াল অপসারণের ফলে মূল মসজিদভবনের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। যেকোনও সময় ঘটতে পারে বড়রকম দুর্ঘটনা। বিপর্যস্ত হতে পারে মসজিদের অবকাঠামো।
উল্লেখ্য, অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে সোহরাব হোসেন গাজী দৈনিক ‘আমাদের সময়’কে জানান, ‘বায়তুল মুকাররম মসজিদের যে পিলার ভেঙে গায়েব করবার কথা বলছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন; প্রকৃতপক্ষে আমার দোকানে এমন কোনও পিলারের অস্তিত্বই নেই। ছিলও না। একটি মহল আমার সুনাম ক্ষুন্ন করতে এমন অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ও মার্কেট বিভাগের  পরিচালক মুহাম্মদ মহীউদ্দিন মজুমদার উল্লেখিত পত্রিকাটিকে জানান, পিলার ভেঙে অপসারণের বিষয়ে দুটো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে প্রমাণ মিলেছে যে, সুপার মার্কেট নিউ এর দোকান নম্বর এইচ-৬ এর অভ্যন্তরে যে লোডবিয়ারিং পিলার ছিল, সেটি রাতের বেলা অবৈধভাবে অপসারণ করেছেন দোকান সংশ্লিষ্টরা। এতে যে কোনও সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট ধর্মমন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত এলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।
যা হোক, আমরা বলতে চাই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা এ মসজিদের সামান্য একটি লোডবিয়ারিং পিলার ও দেয়াল ভেঙে সহধর্মিণীর দোকান বাড়াতে কার তেমন কী হয়েছে! এ নিয়ে তদন্ত কমিটি, রিপোর্ট, ধর্মমন্ত্রণালয়ে ফাইল চালাচালির দরকারটাইবা কেন?
তাঁরাতো যাচ্ছেতাই করতেই পারেন। মসজিদের একটা পিলার আর সামান্য দেয়ালে কী যায়-আসে! এ জাতিটা না আসলে খুব কৃপণ। বেশি অকৃতজ্ঞ। এতোটা ছোট মন হলে কী কোনও জাতি টিকতে পারে!
বলা বাহুল্য, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের লোডবিয়ারিং পিলার ও দেয়াল কেন, সারাদেশের অনেক নদীনালা, পাহাড়-পর্বত, রাস্তাঘাট, বাজারহাট, মসজিদ-মাদরাসা, স্কুল-কলেজ, মঠ-মন্দির দখল করছেন তাঁরা। কই, তেমন হৈচৈ কি কেউ করছেন? করেন না। করে কোনও লাভও হচ্ছে না। হবেও না। তাহলে একটি পিলার আর দেয়াল নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের এতো মাথাব্যথা কী কারণে তা বোধগম্য নয়।
যিনি বা যারা জাতীয় মসজিদের লোডবিয়ারিং পিলার ও দেয়াল ভেঙে দোকানের স্পেস বাড়িয়েছেন। তাঁদের দিকে কারুর চাওয়া অনুচিত। তাঁরা কী করেন, কেন করেন, কোন পথে চলাফেরা করেন সেসব দেখা একদমই বারণ। তাঁরা জাতীয় মসজিদের পিলার ভাঙতে পারেন, দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে পারেন। নদী, বিল-ঝিল দখল করলে, হাটবাজার নিয়ে নিলে কিছু বলা যাবে না। বিনাবাধায় ভোগদখলের একচ্ছত্র অধিকার রাখেন তাঁরা। কারুর কিছু বলবার নেই। আইন, আদালত, বিচার-আচার সবকিছু তাঁদের পক্ষে থাকতে প্রায়শ বাধ্য হয়। আর থানাপুলিশ বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরতো তাঁরা যখন-তখন শাসান। দাপট দেখান। কথা না শুনতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে ট্রান্সফারের ভয় দেখান। পরিস্থিতি হচ্ছে এমনই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ