বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শিশুদের সঙ্গে আচরণ

আমাদের দেশে সালাতের সময় শিশুরা মসজিদে এলে প্রায়শ অশোভন আচরণ করা হয় ওদের সঙ্গে। মসজিদ থেকে শিশুদের বের করেও দিতে দেখা যায়। কখনও কখনও জোর করে সবার পেছনে ধাক্কা মেরে ঠেলে দেবার ঘটনাও ঘটে। অথচ শিশুদের সঙ্গে এমন নির্দয় আচরণ করা অমানবিক এবং অপ্রত্যাশিত। এতে তারা বড়দের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন যেমন হয়, তেমনই মসজিদে আসতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, যারা তুরস্ক সফর করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই দেখেছেন, মসজিদের দেয়ালে লেখা থাকে, ‘সালাত আদায়ের সময় যদি পেছনের সারি থেকে শিশুদের হাসির আওয়াজ না শোনা যায়, তাহলে পরবর্তী বংশধরদের ব্যাপারে ভয় করুন।’ কী দারুণ হুঁশিয়ারী! ওমানের মসজিদেও সালাত আদায়ের সময় দেখা যায়, শিশুরা মোটামুটি উপস্থিত থাকে। তারা মসজিদে খেয়াল-খুশী মতো কাতারে দাঁড়ায়। বড়রা কিছু বলেন না। বকা দিয়ে তাড়িয়ে দেন না। এমনকি সালাতের সময় শিশুরা পেছনে বা সামনে কোনও কোনও কাতারে হৈচৈও করে। সালাত শেষে ওদের ইমাম অথবা কোনও মুসল্লি কেউ কিছু বলেন না।
মসজিদে শিশুদের আনা প্রসঙ্গে তুর্কীরা বলেন, শিশুরা হলো ফেরেস্তার মতো। এরা এখানে আসবে। একটু দুষ্টুমি করবে। এভাবেই দেখতে দেখতে সালাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। দুষ্টুমির ব্যাপারটা বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়। তাই সেটা কোনও ব্যাপারই না। কিন্তু এখন যদি ওদের মসজিদে বকাঝকা ও মারধর করা হয় তাহলে তারা তো আর এখানে আসতেই চাইবে না। শিশুরা একটা ভয় নিয়ে বেড়ে উঠবে। এমন করা আদৌ ঠিক নয়। কী মানবিক চেতনা এবং চমৎকার যুক্তি! আর এর ঠিক বিপরীত চিত্র চোখে পড়ে আমাদের এদেশে। এখানে এমনও দেখা যায় যে, শিশুকে মসজিদে নিয়ে আসবার কারণে দাদা-নানা অথবা মামা-চাচার সঙ্গে একশ্রেণির মুসল্লির মারামারিও ঘটে। কী দুর্ভাগ্য আমাদের!
বলা বাহুল্য, আমাদের দেশে সামনের কাতারে ছোটদের দাঁড়াতে দেয়া হয় না। শিশুরা মসজিদে আওয়াজ করলে চড়থাপ্পর দেবার ঘটনা ঘটে। ইমাম ও মুয়াজ্জিন সাহেব বিষয়টা এড়িয়ে যান। শিশুদের মসজিদে আনতে মানা করেন। কিন্তু বুখারী শরীফের হাদিস হচ্ছে, রাসুল (স) তাঁর শিশু নাতনি হযরত উমামাহ বিনতে যায়নাব (রা) কে কোলে কিংবা কাঁধে নিয়ে সালাত আদায় করতেন। যখন তিনি দাঁড়াতেন তখন শিশুটিকে উঠিয়ে নিতেন। আবার সিজদায় গেলে নামিয়ে রাখতেন।
একদিন যোহর অথবা আসর সালাতের জন্য বেলাল (রা) আযান দিলেন। আল্লাহর রাসুল (স) তাঁর নাতনি হযরত উমামাহ (রা) কে কাঁধে করে নিয়ে আসলেন। রাসুল (স) ইমামতির জন্য সালাতের স্থানে দাঁড়ালেন। অন্যরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে গেলেন। অথচ উমামাহ (রা) তার স্থানে অর্থাৎ রাসুল (স) এর কাঁধেই থাকলো। রাসুল (স) সালাতের তাকবির দিলেন। অন্যরাও তাকবির দিলেন। রাসুল (স) রুকু করবার সময় তাকে পাশে নামিয়ে রেখে রুকু ও সিজদাহ করলেন। সিজদাহ শেষে আবার দাঁড়াবার সময় তাকে আগের স্থানে উঠিয়ে নিলেন। এভাবে সালাতের শেষপর্যন্ত প্রত্যেক রাকাতেই তিনি এমনটি করেন। এটা সুনানে আবু দাউদের ৯২০ নং হাদিস।
এ ছাড়া রাসুল (স) এর খুতবা দেবার সময় তাঁর নাতি হাসান (রা) এবং হুসাইন (রা) কাছে এলে তিনি খুতবা দেয়া বন্ধ রেখে তাদের জড়িয়ে ধরে আদর করতেন। কোলে তুলে নিতেন। চুমু খেতেন আর বলতেন, ‘খুতবা শেষ করা পর্যন্ত আমি ধৈর্য ধারণ করতে পারবো না। তাই, আমি খুতবা দেয়া বন্ধ করেই এদের কাছে চলে এসেছি।’ ---নাসায়ী। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) নিজে শিশুদের সঙ্গে রেখে সালাত পড়িয়েছেন। ইমামতি করেছেন। আর আমাদের এখানকার প্রায় মসজিদে শিশুদের উপস্থিতি সহ্যই করা হয় না। দুরদুর করে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এটা সুন্নতের স্পষ্ট খেলাফ। রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘যে ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দিতে জানে না সে আমার দলভুক্ত নয়।’ --- আবু দাউদ, তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ।
তাই এ ব্যাপারে আমাদের ইমাম সাহেব ও মুসল্লিদের সতর্ক হওয়া জরুরি। জুমার খুতবায় বিষয়টি স্পষ্ট করা খুব দরকার। তাহলে মুরুব্বিদের প্রতি বিরূপ মানসিকতা থেকে যেমন সরে আসবে শিশুরা। তেমনই মসজিদমুখী হতে আগ্রহী হবে। উল্লেখ্য, তালিমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা এ নিয়ে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট ইন্টারনেটে ছেড়েছিল কিছুদিন আগে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনেক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ