মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নিউ বসুন্ধরার এমডিসহ দুইজনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

খুলনা অফিস : ১১০ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ১৩৫ টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে বাগেরহাটের নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) আব্দুল মান্নান তালুকদার ও চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমানের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দীর্ঘ ৭ মাস বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের সদর থানায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক মো. শাওন মিয়া বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন। অবশ্য মামলার আসামীরা সকলেই পলাতক এবং তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলো বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এদিকে মান্নান ও আনিসুরের বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞ জারি খুব দ্রুতই করা হবে। ইতোমধ্যে দেশের সকল স্থলবন্দর ও বিমান বন্দরগুলোতে তাদের দু’জনের পাসপোর্টের নম্বরসহ সরবরাহ করে সর্তক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে মানিলন্ডারিংয়ের মামলায় আরও আসামী অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছেন।
মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে তদন্ত শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটি বাগেরহাট শহরের মিঠাপুকুর পাড়, কে, আলী রোড, সরুই, বাগেরহাটে অবস্থিত। এর চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল মান্নান তালুকদার। প্রতিষ্ঠানের মেমোর‌্যান্ডাম অব এসোসিয়েশন পরীক্ষান্তে দেখা যায় যে, কোম্পানীর অনুমোদিত মূলধন ১০.০০ কোটি (প্রতি শেয়ার ১,০০০.০০ টাকা হিসেবে ১,০০,০০০ সাধারণ শেয়ার) টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১০.০০ লক্ষ টাকা।
রেকর্ডপত্র দৃষ্টে দেখা যায় যে, কো¤পানির মোট ১০০০ শেয়ারের মধ্যে আব্দুল মান্নান তালুকদার ৮৫০টি, মো. আনিসুর রহমান ৫০টি, তার মাতা সালেহা বেগম ৫০টি ও তার স্ত্রী জেসমিন নাহার ৫০টি শেয়ারের মালিক। প্রকৃতপক্ষে নিউ বসুন্ধরার চেয়ারম্যান হিসেবে মো. আনিসুর রহমানের নাম থাকলেও আব্দুল মান্নান তালুকদারই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড এর নামে আমানত সংগ্রহ করে সিংহভাগই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান তালুকদার নিজ নামে জমি ক্রয় করেছেন ও তার পরিবারের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন।
সূত্রে আরও জানা যায়, আব্দুল মান্নান ১৯৮৪ সাল হতে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাগেরহাট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এমএলএসএস পদে চাকুরি করেছেন। ২০১০ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে যান। অবসরের পর তিনি নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড নামীয় প্রতিষ্ঠানটি রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কো¤পানিস এন্ড ফার্মস (জঔঝঈ) এর ঢাকা কার্যালয় থেকে ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর সি-৮৯১১৪/১০ নাম্বার অনুমতি গ্রহণ করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নিউ বসুন্ধরা রিয়েল এস্টেট লি. থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা মোট ২০,৫৫৫ জন এবং তাদের নিকট থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছে মোট ২৯৯ কোটি ২০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে এ পর্যন্ত উক্ত টাকার মধ্য হতে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৭৬ লাখ ৮৫ লাখ৭৪ হাজার টাকা ফেরৎ প্রদান করেন । এদিকে নামেই রিয়েল এস্টেট কো্মপানি হলেও বাস্তবে এটির কাজের সাথে রিয়েল এস্টেটের কাজের কোন মিল নেই। কোম্পানিটি এল এল এম কোম্পানির মত বিভিন্ন দালালদের সহায়তায় নিরীহ জনগণকে ভুল বুঝিয়ে অধিক মুনাফার (লাখে মাসে ২৫০০/-) লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন অংকের টাকা আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছে। সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে শুরু করে কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত বাগেরহাট ও খুলনা জেলাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঐ কো¤পানিতে রেখেছেন। এখন পর্যন্ত লাভের যে টাকা মানুষকে দেয়া হয়েছে তা মানুষের কাছ থেকে নেয়া আমানত থেকেই দেয়া হয়েছে। বাস্তবে ব্যবসা থেকে কোম্পানির কোন মুনাফা হয়নি।
দুদকের অনুসন্ধানকালে আব্দুল মান্নান, তার পরিবার ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এখন পর্যন্ত ৩০টি ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে। হিসাবগুলোতে ১১০ কোটি ৪৬ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪৩ টাকা ৬২ পয়সা জমা হয়েছে এবং উঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন ব্যাংক হতে তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাবগুলোতে ১১০ কোটি টাকার উপর লেনদেনের তথ্য পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে যে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে তাতে মালিক হিসেবে আব্দুল মান্নান-এর নাম লেখা আছে। এতে প্রতীয়মান হয় তিনিই উক্ত টাকা লেনদেনের সহিত জড়িত। উক্ত ব্যাংক হিসেবে বর্তমান ব্যালেন্স মোট ৬২ লাখ ৪ হাজার ৯৪২ টাকা। হিসাবসমূহ যাচাই করে দেখা গেছে টাকা জমা হওয়ার সাথে সাথেই তিনি তা উঠিয়ে নিয়েছেন। যেদিন টাকা জমা হয়েছে সেদিনই বা তার পরদিন টাকা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় গ্রাহকগণ বিভিন্ন শাখায় টাকা জমা করেছেন তা সাথে সাথেই উক্ত শাখা হতে তা তুলে নেয়া হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২ (য) ধারা অনুযায়ী এটি সন্দেহজনক লেনদেন। যে টাকার হিসাব পাওয়া গেছে তা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকার হিসাব। এর বাইরেও আরও শতকোটি টাকার উপরে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে সরাসরি হাতে হাতে জনগণের কাছ থেকে নিয়ে মানিলন্ডারিং এর মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানকালে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে বাগেরহাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহাতাব উদ্দিন বলেন, দুদকের মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে নিউ বসুন্ধরা রিয়েলএস্টেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল মান্নান তালুকদারের মুঠোফোনে (০১৭১২১০০৬৪৩) যোগাযোগের চেষ্টা করে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ