শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

খুলনার পাঁচ উপজেলায় ২৫ খাল খননে ব্যাপক দুর্নীতি

খুলনা অফিস : মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় খুলনা জেলার পাঁচটি উপজেলায় এলসিএস (ভূমিহীন সমন্বয় সংস্থা) কমিটির মাধ্যমে খাল খনন কর্মসূচীতে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যেনতেনভাবে খাল কেটে দূরে মাটি না ফেলায় বর্ষা মওসুমে আবারো খাল ভরাট হওয়ারও আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে খুলনার ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, রূপসা ও তেরখাদা উপজেলায় ১৭ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ২৫টি খাল খনন কর্মসূচীতে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হলেও তার অধিকাংশই লুটপাট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে খাল খনন কর্মসূচী চলছে তা’ বাস্তবায়ন না হওয়ারও আশংকা করছেন অনেকে।
সরোজমিনে রূপসা ও তেরখাদা উপজেলার সীমান্তবর্তী লাইনের খালের দু’পাড়ে দেখা যায়, খুলনা-তেরখাদা সড়কের কিছু অংশের একেবারে পাশ দিয়ে খাল খননের ফলে রাস্তাটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এতে বর্ষা মওসুমে ওই রাস্তাটি ধ্বসে গিয়ে খুলনা-তেরখাদা সড়কের যান চলাচল বিচ্ছিন্ন হতে পারে এমন আশংকাও সংশ্লিষ্টদের। খুলনা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় এ খাল খনন কর্মসূচী চলছে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের মাধ্যমে। কিন্তু রূপসা ও তেরখাদার সীমান্তবর্তী লাইনের খালের একাংশে পাটা দিয়ে সেখানে মৎস্য চাষ করছেন এলসিএস কমিটির দলনেতা মনির মল্লিক। অর্থাৎ যিনিই খাল কাটার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনিই আবার সেখানে মাছ চাষ করছেন।
সরোজমিনে পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা হলে তারা জানান, খাল খননের পর থেকেই পানি তুলে প্রথমে কতটুকু খনন করা হয়েছে তা বুঝতে না দেয়ার জন্য যেমন পানি তোলা হয়, তেমনি সেখানে মাছ চাষের নামে অন্য কাউকে নামতেও দেয়া হয় না। যদিও খালটির মাঝেমধ্যে পানি এতোই কম দেখা যায় যে, খননের চিত্র সেখান থেকেই ফুটে উঠে। লাইনের খালটির আজগড়া অংশের সবচেয়ে বেশি পানি যেখানে সেখানে মেপে দেখা যায় ৪ ফুট পানি আছে। তাছাড়া খাল খননের পর মাটি এতোই কাছে রাখা হয়েছে যে, সামান্য বর্ষা হলেই তা’ আবারো খালে গিয়ে ভরাট হয়ে যেতে পারে।
খালে মাছ চাষ সম্পর্কে জেলা মৎস্য অফিসের প্রকৌশলী মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রথমে খাল খননের পর পাঁচ বছরের মেয়াদে লীজ দেয়া হবে এলসিএস কমিটির কাছে। এলসিএস কমিটির সদস্যরা সেখানে মাছ চাষ করে নিজেরা স্বাবলম্বী হবে।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু ছাইদ বলেন, খাল খননের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জলাশয়ের পার্শ্ববর্তী কৃষক, গরীব মৎস্যজীবী ও সাধারণ জনগণ সেচ সুবিধাসহ মৎস্য চাষের মাধ্যমে আমিষের ঘাটটিত মিটাতে পারবে। সেই সাথে বিলুপ্ত অথবা বিলুপ্তপ্রায় মৎস্য প্রজাতি ফিরে পাওয়া যাবে। প্রোটিন খাটতি পূরণসহ গরীব জনগণ আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে পাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পক্ষান্তরে স্থানীয় গরীব কৃষক (নাম প্রকাশে ভয় পান) বলেন, খাল যিনি খনন করেছেন তিনিই অর্থাৎ আজগড়ার মনির মল্লিক মাছ চাষ করছেন। তিনি নাকি ওই খাল ইউএনও অফিস থেকে লীজ নিয়ে এনেছেন এমনটিও এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। যদিও মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, উপজেলা নির্বাহী অফিসের লীজ দেয়ার কোন এখতিয়ার নেই। খাল লীজ দেবে মৎস্য অধিদপ্তর।
আবার তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. লিটন আলী বলেন, যে খালগুলো খনন করা হয় সেগুলো ইজারা দেয়ার কোন সুযোগ কারও নেই। এমনকি মৎস্য অধিদপ্তরও সেগুলো লীজ বা ইজারা দিতে পারবে না। উপজেলা নির্বাহী অফিস থেকেও এমন কোন খাল কাউকে ইজারা দেয়া হয়নি বলেও তিনি জানান।
রূপসা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইলিয়াছুর রহমান বলেন, মৎস্য অধিদপ্তর থেকে যে খালগুলো খনন করা হচ্ছে তার সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের কোন সম্পৃক্ততা নেই।
অপর একটি সূত্র বলছে, মৎস্য অধিদপ্তরের সাথে আঁতাত করে নাম সর্বস্ব এলসিএস (ভূমিহীন সমন্বয় সংস্থা) কমিটির মাধ্যমে খালগুলো খনন করা হচ্ছে। যে কমিটির দলনেতা ও উপদলনেতাদের সাথে মৎস্য অফিসারদের সাথে দহরম মহরম সম্পর্ক রয়েছে। যে কারণে এ কাজগুলো যেনতেনভাবে করা হলেও সেদিকে নজর দেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এমনকি সম্প্রতি এ সংক্রান্ত তথ্য চাইতে গেলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নানাভাবে সময়ক্ষেপন করেন। এক পর্যায়ে গত ১৩ মে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলেও ১৫ দিন পর গত ২৮ মে আংশিক তথ্য দেয়া হয়। তাছাড়া তথ্য না দিয়ে এ প্রতিবেদককে বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করারও চেষ্টা করা হয়। অফিসিয়াল তথ্য পাওয়ার পর বুধবার সরোজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু ছাইদের দেয়া তথ্য মতে ১৭ হেক্টর আয়তনের কাজের ৮০% অগ্রগতি হয়েছে। আগামী জুন মাস নাগাদ খাল খনন কর্মসূচি শেষ হবে বলেও সূত্রটি উল্লেখ করে। পাঁচ উপজেলায় ২৫টি খাল খনন হচ্ছে বলেও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান।
রূপসা-তেরখাদা সীমান্তবর্তী লাইনের খাল খনন কাজে নিয়োজিত এলসিএস কমিটির দলনেতা মনির মল্লিক বলেন, এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ করতে গেলে অনেকের গাত্রদাহ হয়। তেমনটি তার ক্ষেত্রেও হয়েছে। তিনি কাজটি যথেষ্ট ভাল করেছেন উল্লেখ করে বলেন, এর স্বাক্ষী স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মূশেদিও। সংসদ সদস্য একদিন ওই পথ দিয়ে যাবার সময় খাল খনন কর্মসূচি নিজে প্রত্যক্ষ করেন। সুতরাং তিনি রাজনীতি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাই তার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে খননকৃত খালে মাছ চাষের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, এখনও খাল খনন চলছে, মাছ চাষের কোন সুযোগ নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ