বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আমদানি চালের চালবাজিতে নিঃস্ব কৃষক

কৃষিভিত্তিক দেশ বাংলাদেশ। তাই কৃষকের খোঁজখবর রাখা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কৃষকের সমস্যা ও সম্ভাবনা কোথায় তার বিচার বিশ্লেষণ করা গবেষক ও রাজনীতিবিদদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই দায়িত্ব কমই পালিত হচ্ছে। ফলে কৃষকের দুঃখের মাত্রা কমছে না। আমরা জানি, বাংলাদেশের জনগণের প্রধান খাদ্য ভাত। আর এই ভাতের জন্য ধান উৎপাদন করতে হয় কৃষককে। কিন্তু এই ধান উৎপাদন করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে কৃষককে। এটা আমাদের জন্য কোন সুখবর নয়।
ধান ও কৃষকের অবস্থান নিয়ে ২৫ মে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। প্রতিবেদন থেকে উপলব্ধি করা যায়, ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষক এমনকি চাল ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকরাও ভাল নেই। ব্যবসায়ীরা জানান, এবার ধানের রাজধানী নওগাঁর ৯০ শতাংশেরও বেশি কৃষক সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ থেকে কোন সুবিধা পাচ্ছে না। মূলত আমদানির চাল কৃষকের বাম্পার উৎপাদনের খুশিকে ম্লান করে দিয়েছে। প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে জানতে পারেন এক মণ ধান ফলাতে খরচ হয়েছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। আর তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। নওগাঁ সদরের হাপানিয়া এলাকার একটি সড়কের দুই পাশের শ’ দেড়েক চাল কলের মধ্যে প্রতিবেদক মাত্র একটি চালকল খোলা পান। মেসার্স আতিক রাইস মিল নামের এই চালকলটির মূল মালিক তা চালাতে না পেরে ইজারা দিয়ে দিয়েছেন। আর তা নিয়েছেন স্থানীয় চাল ব্যবসায়ী মোতাহার হোসেন। ধান-চালের দাম তো কম, আপনাদের ব্যবসা তো ভালই হচ্ছে, এমন প্রশ্নে তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘দাম তো কম বুঝলাম, কিন্তু চাল বিক্রি না হলে কী হবে? ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গত আমনে ধান কিনেছি, এখনও ৭০ শতাংশ ধান রয়ে গেছে। বোরো কীভাবে কিনবো। এদিকে সুদের টাকা দিতে দিতে ফতুর হয়ে গেলাম।’ ধান কেন বিক্রি হচ্ছে না তা জানতে প্রতিবেদক গেলেন তেঁতুলিয়া হাটে। ব্যবসায়ী হাসান আলীকে প্রশ্ন করা হলো, কৃষকের কাছ থেকে তো কম দামে ধান কিনছেন। আর সরকারি গুদামে এই ধান ১ হাজার ৪০ টাকা মণ দরে দেবেন। লাভ তো ভালই থাকছে। এমন প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে হাসান আলী বললেন, সরকার একজনের কাছ থেকে এক টনের বেশি কিনছে না। আর সরকারি তালিকায় নাম লেখাতে কত জায়গায় কত টাকা দিতে হয় সেই খবর রাখেন? তার কথায় খাদ্য অধিদফতরের ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম ও দুর্নীতির ইঙ্গিত বুঝতে পেরে প্রতিবেদক আর কথা বাড়াননি। নওগাঁ সদরের দুবলার কাঠি থেকে ধান নিয়ে আসা কৃষক আইনুল হক জানান, তার জমিতে ধান হয়েছে ২৩০ টন। আর সরকার তার কাছ থেকে ১ হাজার ৪০ টাকা দরে নিচ্ছেন মাত্র ১ টন। বাকি ধান তিনি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করছেন জানিয়ে বলেন, ‘সরকারি গুদামে ধান দেওয়া আর কৃষকদের লোকসানের সাগর থেকে এক বালতি পানি সরানো একই।’
আমদানি চালের কারণে ধানের বাজার পরিস্থিতি ভাল নয় বলে জানান নওগাঁ চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার। তিনি বলেন, ‘বছরে নওগাঁ জেলার ধানের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ১২ লাখ টন আশপাশের জেলাগুলোতে সরবরাহ করি। সেখানে ১ হাজার ২০০ চাল কলের মধ্যে বড়জোর ২০০টি চালু আছে। এক বছর ধরে বাজার দখল করে ছিল আমদানি করা চাল। ওই চালের চালবাজিতে আমরা সব নিঃস্ব। প্রায় সব মিল দেনার দায়ে বন্ধ। ব্যাংক নতুন করে আর ঋণ দিচ্ছে না। কিন্তু আমদানিকারকরা ঠিকই ঋণ পাচ্ছে। এভাবে চললে নওগাঁর কৃষক ধান ছেড়ে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো আম আর লিচুতে চলে যাবে। আর আমরা ধান-চালের ব্যবসা বাদ দিয়ে ফল ব্যবসা করবো। কৃষক ও চাল কলের মালিকদের এমন অবস্থায় রেখে কীভাবে দেশের মানুষকে তিনবেলা ভাত খাওয়াবে সরকার?’ চাল কল মালিকদের নেতা যা বললেন, তা সংশ্লিষ্ট মহল বিবেচনা করে দেখতে পারেন। কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য দিতে হলে তো সরকারকে কৃষকদের কাছ থেকে আরও অধিক পরিমাণে সরাসরি ধান ক্রয় করতে হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় বন্ধ করতে হবে দুর্নীতি। এছাড়া আমদানির চাল আমাদের ধান উৎপাদন, চালের ব্যবসা ও কৃষকের উপর কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলছে তাও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দেখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ