মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কোকাকোলা দুনিয়া মাতানো বিনাশী নেশা?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ১৮৩১ সালের ৮ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় জন্মেছিলেন জন পেম্বারটন। তিনি পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো ছিলেন। জন পেম্বারটন রিফর্ম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেন ফার্মেসি নিয়ে পড়ার জন্য। ১৮৫০ সালে ফার্মাসিস্টের ডিগ্রি ও লাইসেন্স পেয়ে গেলেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ওষুধ আবিষ্কার ও বিক্রি করা।
সেই লক্ষ্যে সফলভাবে এগিয়েও চলছিলেন জন পেম্বারটন। কিন্তু দাসপ্রথা নিয়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল আমেরিকায়। গৃহযুদ্ধে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলো। আমেরিকার গৃহযুদ্ধে জন পেম্বারটন লড়াই করেন জর্জিয়ার স্টেট গার্ডের পক্ষে। ‘ব্যাটল অব কলম্বাস’ এর যুদ্ধে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। ক্ষতের যন্ত্রণা কমাতে জন পেম্বারটন মরফিন নেয়া শুরু করেন। রোজ তিন চার বার করে মরফিন নিতে নিতে তিনি মরফিনের নেশায় চূড়ান্তভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন।
মরফিন যথেষ্ট দামি নেশা। পয়সায় কুলোতে না পেরেও নেশার কবল থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে জন পেম্বারটন সহজলভ্য কোকাপাতা চিবোতে শুরু করেন। এই কোকাগাছ থেকেই তৈরি হয় আরেক ভয়ঙ্কর ড্রাগ কোকেন। কোকাপাতা চিবোলে নেশা হয়। তবে কোকাপাতা স্বাদে খুব তেতো।  কোকাপাতা সেবন সামান্য উপাদেয় করবার জন্য জন পেম্বারটন নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে কোকাপাতার নির্যাসের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান মেশাতে লাগলেন নিজের নেশার তাগিদেই।
একদিন এভাবেই তিনি কোকাপাতার নির্যাসের সঙ্গে মেশালেন কোলাবাদামের গুঁড়ো। দিনশেষে বাড়ির বারান্দায় বসে সিরাপটির স্বাদ নিলেন জন পেম্বারটন। প্রথম চুমুকেই বুঝে গেলেন এই তরল পদার্থটি পৃথিবী কাঁপাতে চলেছে। ব্রেন টনিক হিসেবে বাজারে এসেছিল কোকাকোলা। একদিন সন্ধ্যায় হুইস্কিতে সোডাওয়াটার মেশাতে গিয়ে নিজের খেয়ালেই  কোকা আর কোলাবাদামের মিশ্রণটিতে সোডাওয়াটার মিশিয়ে চুমুক দিলেন। এবার নিজেই চমকে গেলেন জন পেম্বারটন। বুঝতে পারলেন সোনারখনি আবিষ্কার করে ফেলেছেন তিনি। জন পেম্বারটন পরের দিনই তাঁর বন্ধু উইলিস ভেনাবলের সঙ্গে দেখা করলেন। উইলিস একটি ওষুধের দোকানের মালিক। উইলিসকে সোডাওয়াটার সহযোগে কোকা আর কোলাবাদামের মিশ্রণের স্বাদ নিতে বললেন জন পেম্বারটন। স্বাদ নিয়ে বন্ধু উইলিস আনন্দে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠেছিলেন।
দুজনে মিলে কোকা আর কোলাবাদামের মিশ্রণকে ব্রেন-টনিক জাতীয় ওষুধ হিসেবে বাজারে আনলেন। কারণ এটা খেলে বেশ ফুরফুরে লাগে ও মানসিক অবসাদ কাটে। মিশ্রণটির এক গ্লাসের দাম ছিল ৫ সেন্ট। কিন্তু ব্রেন টনিক হিসেবে নয়, বরং সোডা ফাউন্টেন ড্রিঙ্ক হিসেবেই বাজারে হিট হয়ে গেল পেম্বারটনের আবিষ্কৃত মিশ্রণটি। কিন্তু প্রিয় বন্ধুকেও ফর্মুলা জানালেন না পেম্বারটন। রহস্যময় থেকে গেল আজও এই জনপ্রিয় পানীয়ের সূত্র।
কোকা আর কোলাবাদামের সোডা ফাউন্টেন ড্রিঙ্কটি বাজারে হিট হতেই ব্র্যান্ড নেইম এর দরকার পড়লো। বিজ্ঞাপন  কোম্পানির মালিক ফ্র্যাঙ্ক ম্যাসন রবিনসন এই সোডা ফাউন্টেন ড্রিঙ্কটির নাম প্রধান দুটি উপাদানের নামে রাখলেন। এসে গেল পৃথিবী কাঁপানো ব্র্যান্ড ‘কোকাকোলা’। পেম্বারটন তৈরি করে ফেললেন দ্য কোকাকোলা কোম্পানি। মরফিন ছাড়বার উদ্দেশ্যে জন পেম্বারটন কোকাকোলা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু আবিষ্কারের পরও মরফিনের নেশা ছাড়তে পারেননি তিনি। সেই নেশায় প্রায় দেউলিয়া হতে বসেন জন পেম্বারটন। একপর্যায়ে সংসার চালাতে এবং নেশার টাকা যোগাতে তিনি কোকাকোলার ফর্মুলা বেচতে বাধ্য হলেন। বেচে দিলেন কোম্পানির কিছু শেয়ারও।
তবে কোকাকোলা কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ার নিজের হাতে রাখলেন জন পেম্বারটন। যাতে তাঁর ছেলে চার্লি পেম্বারটন ভবিষ্যতে ব্যবসা করতে পারেন। কোকাকোলার ফর্মুলা বেচলেও তাঁর নিজস্ব ফর্মুলার পুরোটা নাকি কাউকেই জানাননি জন পেম্বারটন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এই কোকাকোলা ভবিষ্যতে একদিন আমেরিকার জাতীয় পানীয় হবে এবং গোটা দুনিয়া মাতিয়ে তুলবে।
জন পেম্বারটনের ফর্মুলা নিয়ে অন্য সফটড্রিঙ্কস কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ব্র্যান্ড এনে রমরমা ব্যবসা শুরু করলো। কিন্তু জন ও তাঁর ছেলে চার্লি তাঁদের ব্যবসা তেমন জমাতে পারলেন না। অথচ জন পেম্বারটনের ছেলে চার্লি পেম্বারটনের কাছে কোকাকোলা নামটার কপিরাইট ছিল। কিন্তু চার্লি পেম্বারটন ছিলেন অলস প্রকৃতির। ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা বা ইচ্ছে কোনওটাই ছিল না তাঁর।
‘ফর গড: কান্ট্রি এন্ড কোকাকোলা’ বইয়ের লেখক মার্ক পেন্ডারগ্রাস্ট লিখেছিলেন, জন পেম্বারটনের ছেলে চার্লিরও বাবার মতো মরফিনের নেশা ছিল। বাবাকে বুঝিয়ে দ্রুত বেশি টাকা রোজগারের জন্য ১৮৮৮ সালে চার্লি তাঁদের কোকাকোলা কোম্পানি বেচে দিলেন ধনকুবের এসা ক্যান্ডলারের কাছে।
একই বছর আগস্টে জন পেম্বারটন মারা গেলেন পাকস্থলির ক্যান্সারে। মৃত্যুর সময় তিনি নাকি কপর্দকহীন অবস্থায় ছিলেন এবং মরফিনের নেশা ছাড়তে পারেননি। ভোগবিলাস আর নেশায় সর্বস্বান্ত হয়ে জন পেম্বারটন মারা যাবার মাত্র ছয় বছরের মধ্যে মারা যান চার্লি পেম্বারটনও। অথচ ধনকুবের হবার আদর্শ সোনার খনিটি তাঁদেরই হাতে ছিল।
ইতিমধ্যে এসা ক্যান্ডলারের ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে ‘কোকাকোলা কোম্পানি’ হয়ে গেছে ‘কোকাকোলা কর্পোরেশন’। অল্পদিনের মধ্যেই এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সফটড্রিঙ্ক বিক্রেতা ও নির্মাতা কোম্পানি হয়ে উঠলো। জন পেম্বারটনের স্বপ্নই সত্যি সফল হলো।
যদি জন পেম্বারটন আমেরিকার গৃহযুদ্ধে না লড়তেন তাহলে তিনি আহত হতেন না। আহত না হলে যন্ত্রণা পেতেন না। যন্ত্রণা না পেলে মরফিন নিতেন না। মরফিনে আসক্ত না হলে কোকাপাতা চিবোতেন না। কোকাপাতা না চিবোলে মানুষ  কোকাকোলা পেতো না। তাই এসা ক্যান্ডলারের হাতে কোকাকোলা দ্বিতীয় জীবন ফিরে পেলেও এই পানীয়টির জনক হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন জন পেম্বারটন।
কিছুটা হলেও বোঝা গেল কোকাকোলা আসলে কী? এ হলো দুনিয়া মাতানো এক বিনাশী নেশা।
এই কোকাকোলা প্রতিদিন বারবার গেলে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। সফটড্রিঙ্ক হিসেবে পানীয়টি গলাধঃকরণ করলেও এটি আসলে মারাত্মক নেশা। আসক্তি সৃষ্টি করে। আর আসক্তরা ভুলতে পারে না। তাই বারবার খেতে ইচ্ছে করে মরফিনের মতোই। না খেলে শরীর ঝিমঝিম করে। মাথা ঘোরে। কাজকর্মে মনোযোগ থাকে না। আসলে এটি সফটড্রিঙ্ক নয়। স্লোপয়জন। সফটড্রিঙ্কের নামে মানুষ এই স্লোপয়জনই পান করছে। দ্রুত এগোচ্ছে মৃত্যুর হিমশীতল অন্ধ গলিপথে। কিন্তু হুঁশ হচ্ছে না কারুরই। কী কী উপাদান আছে এতে তার কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই গ্রহণকারীদের। ৎউচ্চমূল্য দিয়ে কিনছে। পান করছে। কিন্তু আসলে কী পান করছে জানে না আজও। জানতে চায়ও না কেউ। কোকাকোলা ও অন্যসব সফটড্রিঙ্ক পানে মানুষের আয়ু কমে যাচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখবার সময় ঘনিয়েছে বলেই মনে হয়। কারণ কোকাকোলা আর কোকেনের উৎপত্তি একই উপাদান থেকে। কোকেন হলো ভয়াবহ মাদক। এর যথেচ্ছ ব্যবহার মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এছাড়া এতে অন্য কোনও মারাত্মক উপাদান রয়েছে কিনা কে জানে?
নেটে একবার একটা সচিত্র নিউজ দেখেছিলাম। আর সেটা হচ্ছে কাঠবেড়ালি কোকোফল খেয়ে এর আস্তবিচিগুলো ‘হাগু’ করে। কাঠবেড়ালির এই মল থেকেই নাকি সবচেয়ে দামি কফি পাউডার প্রস্তুত হয়। প্রশ্ন হলো: দামি কফি হলে কোকোকোলা হতে বাধা কোথায়? ফারাক কেবল একটা গরম। অন্যটা শীতল। তবে মেকিং ফর্মুলা এক নয় নিশ্চয়।
কোকাকোলা তথা কোকেন আবিষ্কারের মূল স্টোরি নেয়া হয়েছে আমার বন্ধু মরহুম কাজী রফিউদ্দিনের কন্যা লিখি কাজীর টাইমলাইন থেকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ