বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কৃষকের ঘরে ঈদ আনন্দ থাকবে না

জিবলু রহমান : [তিন] উৎপাদন না হলেও কৃষি যন্ত্রপাতি কিনে রাখা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, আমরা আগামীতে যে কাজটি করব, উৎপাদন হোক আর না হোক, আমরা সয়লাভ করে দেব কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য। কৃষি যন্ত্রপাতি আমরা নিয়ে এসে রেখে দেব। যখন লাগবে তখন ব্যবহার করব। কিন্তু ব্যবহার করতে হবে। আর সরকার এখান থেকে নামমাত্রে দাম নেয়।

কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, মূলত উদ্বৃত্ত চালের কারণেই ধানের দাম বাড়ছে না। ১০-১৫ দিনের মধ্যে বোরো ধান পুরোপুরি কাটা হয়ে যাবে। এর মধ্যে যদি দেশে কোনো দুর্যোগ না হয়, তাহলে সরকার চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেবে। এতে ধানের দাম বাড়তে পারে।

সরকার যেখানে চাল রপ্তানির চিন্তা করছে, সেখানে কেন চাল আমদানি হচ্ছে, এর কারণ সম্পর্কে সংবাদপত্রকে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, দেশের পাঁচ তারকা হোটেলে ও ধনীরা সুগন্ধি-সরু চাল খেতে পছন্দ করে। তাদের প্রয়োজনে এসব চাল আমদানি হতে পারে। তবে আমদানি বেশি হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণে সরকার আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে আরও বাড়ানোর কথা চিন্তা করবে। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ১৮ মে ২০১৯)

শেরপুরের নকলায় ধান কাটা শ্রমিকের আকাল পড়েছে। ২ মণ ধানের দামেও মিলছে না একজন ধানকাটা শ্রমিক। ধান কাটতে গিয়ে এখানকার কৃষক এখন পড়েছেন মহাবিপাকে। পাওয়া যাচ্ছে না পর্যাপ্ত শ্রমিক। যাও মিলছে প্রতিজনের দৈনিক মজুরি ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। যেখানে এক মণ ধানের বর্তমান বাজার মূল্য ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, সেখানে একজন ধানকাটা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বাবদ কৃষককে গুনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ টাকা। এক দিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে মানব সৃষ্ট শ্রমিক সংকটের কবলে পড়ে কৃষক দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। ধান এখন কৃষকের গলার কাটা হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ পাকা ধানের ক্ষেত বর্গা দিচ্ছেন।

বেশ কয়েকজন কৃষক তার খেতের ধান শ্রমিকের অভাবে কাটতে না পেরে, শুধু কাটা ও মাড়াই করে দিতে শ্রমিকদের অর্ধেক ধানের বিনিময়ে অর্থাৎ বর্গা হিসেবে দিয়েছেন। এতে করে কৃষকের জমি, বীজ, জমি তৈরি, চারা রোপণ, নিড়ানি, সার, কীটনাশক, সেচ ও নিজের শ্রম খরচসহ অন্যান্য খরচ করার পর যা পাচ্ছেন; শ্রমিকরা শুধু কেটে এনে মাড়াই করেই তা পাচ্ছেন। এতে সুস্পষ্ট যে আগামীতে এসব কৃষক আর ধান রোপণ করবেন না। তাই সরকারকে এ বিষয়ে এখনই নজর দিতে হবে বলে মনে করছেন সুশীলজন। যদিও কেউ কেউ বলছেন, শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়া একটি দেশের জন্য ভালো লক্ষণ। কারণ হিসেবে জানান, মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন হচ্ছে বলেই তারা শ্রম বিক্রি বন্ধ করে দিচ্ছে, ফলে দিন দিন শ্রমিক সংকট বাড়ছে।

চলতি মৌসুমে কাউনিয়ায় (রংপুর) আমন ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধান চাষাবাদে খরচের মাত্রা ২ থেকে ৩ গুণ হারে বৃদ্ধি পেলেও সে অনুপাতে ধানের দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় চাষীরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এ কারণে চাষীরা ধান চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। অনেক চাষী ধান চাষ বাদ দিয়ে লাভজনক তামাক, ভুট্টা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষে ঝুঁকে পড়ছে।

একদিকে কৃষকরা ধানে দাম পাচ্ছে না অপর দিকে হাওরের চাষিদের কাঁদাচ্ছে বিআর-২৮ ধান। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর নিয়ে বিস্তৃত আঙ্গারুলি হাওরের প্রায় ৭০ শতাংশ জমির ধান চিটায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যান্য হাওরেও অনেক কৃষক চিটার কারণে জমিতে কাঁচি লাগাতে পারেনি। কৃষি বিভাগ ধান পাকার শুরুতে যারা আগাম বিআর-২৮ ধান লাগিয়েছিলেন তাদের ক্ষেত চিটায় আক্রান্ত হওয়ার কথা স্বীকার করেছিল। এখন মৌসুম শেষে চিটার ক্ষতির পরিমাণ লুকিয়ে কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। চিটায় ক্ষতির আসল চিত্র আড়াল করায় কৃষকরা ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হবে।

চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জ জেলায় দুই লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। বিআর-২৮ ধান চাষ হয়েছে ৮৩ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে। আগাম ধান ফলে কৃষি বিভাগের এমন প্রচারণায় হাওরের কৃষকরা এ চাষ করে। ২০১৮ সালে হাওরের নদ-নদী খননের কারণে হাওরের পানি আগাম নেমে যাওয়ায় কৃষকরা মওসুম শুরুর ১০ দিন আগে বিআর-২৮ ধান লাগিয়েছিল। এ কারণেই চিটায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক, এমন কথা ধান পাকার আগে জানিয়েছিল কৃষি বিভাগ। এ বছর বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই প্রায় পুরো ফসল গোলায় তুলতে পেরেছে কৃষক। তবে দিরাই, শাল্লা ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় শিলায় বেশ কিছু জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই তিন উপজেলায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ধান শিলায় ক্ষতির কথা বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর।

কয়েকমাস পরে দেখা যাবে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলাও হবে, দেশে চালের সংকট। এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে চালের চাহিদা প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে চাল ব্যবহৃত হয় প্রায় ৯৬ হাজার টন। এ চালের এক-তৃতীয়াংশও যদি বাজার থেকে কিনে খাওয়া হয় তাতে দৈনিক চাল বিক্রি হয় ৩২ হাজার টনের মতো। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতি টন চালে গড়ে ৫০০ টাকা হারে দাম বাড়ালে দৈনিক লুট হবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা। মূলত উত্তরবঙ্গের ১৬ জন বৃহৎ চালকল মালিকের সমন্বয়ে এ সিন্ডিকেট গড়ে উঠলেও এদের প্রতিরোধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেই। মাঝে লাভবান হয় পাইকারি ও খুচরা চাল ব্যবসায়ীরাও।

সীমিত আয়তনের এ দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে এ সেক্টরের প্রসারে মনোযোগী হওয়া দরকার। কৃষককে আগামীতে রপ্তানিমুখী ধান চাষ করতে হবে। তাহলে তারা অনেকটাই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। এ জন্য সরকারকে রপ্তানিমুখী ধান চাষে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে যান্ত্রিকিকরণ ও কৃষিতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। কৃষিতে যান্ত্রিকিকরণ ও ভর্তুকি বাড়িয়ে দিলে কৃষকদের ধান চাষে ব্যয় কমে আসবে।

ঈদ মুসলমানদের জাতীয় উৎসব। আর এ উৎসব উদযাপনে সব মুসলমানের সমান অধিকার থাকলেও অবহেলিত ও বঞ্চিত থাকেন কৃষক। ঈদতো বছরে দুইবার আসে। একটি সন্তানকে শিক্ষিত করতে পারলে প্রতিদিন ঈদ আসবে-এ চিন্তা সর্বক্ষণ থাকে কৃষকের মাথায়। কৃষক পরিবার থেকে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীদের কতটা সংগ্রাম করতে হয় সেটা তারাই বুঝে। একজন সাধারণ কৃষক বাবার পক্ষে দুটি সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করা আর যুদ্ধ জয় করার মধ্য খুব কমই পার্থক্য পাওয়া যাবে। 

কৃষকের ঈদ কোনো সময়ই আনন্দময় ছিল না। তার উপর আমন ও বোরো ধান নিয়ে কৃষকের চিন্তাভাবনা যেন মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। অধিকাংশ কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের এবারের ঈদের উৎসবে নতুন জামা-কাপড় জোটবে না। তাদের ঘরে ঈদ শুধু আসবে ধমীয় বার্তা নিয়ে। কৃষকরা সারা মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিনে মহান আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন। ঈদের দিনে খুব ভোরে ওঠে ফজরের নামাজ আদায়, ঈদগাহে বিশাল জামাতে অংশগ্রহণ, পরস্পরের সাথে কোলাকুলি, আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ইত্যাদি কার্যাবলি সম্পাদন করেন তারা ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে। 

ঈদ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে কয়েক দিনের সাধারণ ছুটি দেয়া হয়। কিন্তু ঈদের দিনেও কৃষকদের কাজ করতে হয়। অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত লোকজন ছুটি ভোগ করতে পারলেও কৃষকের ভাগ্যে কোন ছুটি জোটে না। কাজ না করলে তাদের সংসার চলে না। এজন্য ঈদের নামাজ শেষে তাদেরকে মাঠে বেরিয়ে পরতে হয় রিযিকের সন্ধানে। [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ