শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মানবাধিকার, সুশাসন ও  রাষ্ট্রের দায়

ইবনে নূরুল হুদা : গণমানুষের সকল অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারে না বরং তা সুশাসনের জন্য অপরিহার্য অনুষঙ্গ। একথা ঠিক যে, ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা শুধু আমাদের দেশে নয় বরং এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটটা অনেকটাই ব্যতিক্রমী। সম্প্রতি এক সেমিনারে প্রকাশিত তথ্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যা আমাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আইনের শাসন সম্পর্কে ধারণা পেতে সহায়তা করে। কিন্তু এ বিষয়ে রাষ্ট্র বা সরকার বরাবরই নির্লিপ্ত থাকছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।  

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে চার মাসে দেশে (জানুয়ারি থেকে ১৪ মে) ৩৪৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময় ১ হাজার ৪৯০ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার। এর মধ্যে ৪৭০ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সম্প্রতি ‘শিশু অধিকার সুরক্ষা ও অগ্রগতি শীর্ষক’ সেমিনারে এই তথ্য জানানো হয়। সেমিনারে জানানো হয়, সাড়ে ৪ মাসে ৩৪৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়। প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২২টি এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। ১০ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করে। এ ছাড়া ৩৮ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ১৫টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে সেমিনারে। ফলে ধরে নেয়া যায় যে, আমাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আইনের শাসনের অবস্থা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয় বরং উদ্বেগজনকই বলতে হবে।

মানুষের সর্বজনীন, সহজাত, অহস্তান্তরযোগ্য এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকারই হলো মানবাধিকার। মানবাধিকার সব মানুষের জন্য একই ধরনের; যা জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য। তবে এর চর্চা অন্যের ক্ষতিসাধন ও প্রশান্তি বিনষ্টের অনুষঙ্গ হবে না। কিন্তু এসব কথা কেতাবে থাকলেও বাস্তব প্রতিফলনটা গৌণ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। মানুষের অধিকার আঞ্চলিক যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানি, শ্রেণি বিশেষের উচ্চাভিলাস ও স্বার্থপরতার কারণে প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হচ্ছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো স্ব স্ব ক্ষেত্রে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। সকল ধর্মে মানবাধিকারকে উচ্চকিত করার কথা বলা হলেও ধর্মের যথাযথ অনুশীলন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার অভাবেই এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। 

জাতিসংঘের ‘Universal Declaration of Human Rights’ এর ১ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘All human beings are born free and equal in dignity and rights.’ অর্থাৎ ‘জন্মগতভাবে সকল মানুষ স্বাধীন, সমান সম্মান ও মর্যাদা লাভের অধিকারী।’ মানবাধিকার বিষয়ক ধারণাটি অলঙ্ঘনীয় হলেও সভ্যতার প্রারম্ভিক কাল থেকেই এ নিয়ে চলছে বাক-বিতন্ডতা ও দ্বন্দ¦-সঙ্ঘাত। একদিকে মানবাধিকারের সংজ্ঞা ও সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাধর শাসকরা দেশে দেশে নাগরিকদের স্বীকৃত অধিকারগুলো অবলীলায় হরণ ও দমন করে চলছে।

মানবাধিকার বিষয়ক ধারণাটি বেশ প্রাচীন। জানা যায়, ৫৩৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পারস্যের রাজা দ্বিতীয় সাইরাস (সাইরাস দ্য গ্রেট) ব্যাবিলন আক্রমণ করেছিলেন। এই আক্রমণের পর তিনি ব্যাবিলনীয়দের দ্বারা নির্যাতিত দাস জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এরপর সাইরাসের নির্দেশে একটি সিলিন্ডার তৈরি করা হয়। যা ‘সাইরাস সিলিন্ডার’ নামে অভিহিত। এতে সা¤্রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহিষ্ণুতা ও মানবাধিকার বাস্তবায়রে কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দাবী করছেন, এটিই বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার সনদ।

বস্তুত মানবাধিকারের প্রধান ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক মদীনা সনদ ঘোষণার মাধ্যমে। মদীনা সনদকে পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ সনদে মোট ৪৭ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে যেগুলোতে মানবাধিকারের বিষয়গুলো সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করা হয়েছে। এ সনদের উল্লেখযোগ্য অনুচ্ছেদ হচ্ছে-

# সনদে স্বাক্ষরকারী সকল সম্প্রদায় একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে এবং সব সম্প্রদায় সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে।

# সব নাগরিক পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

# নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।

# সকল প্রকার রক্তক্ষয়, হত্যা ও ধর্ষণ নিষিদ্ধ।

# কোনো লোক ব্যক্তিগত অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে। তার কারণে অপরাধীর সম্প্রদায়কে দায়ি করা যাবে না।

# দুর্বল ও অসহায়দের সর্বোতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে হবে।

মানবাধিকার বিষয়ক ধারণার ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে ‘ম্যাগনা কার্টা’  মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এটি ছিলো ইংল্যান্ডের রাজা জন ও বিত্তশালী ব্যারনদের মধ্যে ১২১৫ সালে সম্পাদিত চুক্তি। এতে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পূর্ব অনুমতি ব্যতিরেকে স্বেচ্ছাচারিভাবে জনগণের উপর করারোপ করা যাবে না। রাজকর্মকর্তারা যথেচ্ছভাবে জনগণের ভূ-সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারবে না। কোনো স্বাধীন মানুষকে বিচারিক রায় বা আইনানুযায়ী ব্যতীত গ্রেফতার, কারারুদ্ধকরণ, সম্পত্তিচ্যুত, দীপান্তরিত বা নির্বাসিত কিংবা হয়রানির শিকার করা যাবে না।

বস্তুত, ‘ম্যাগনা কার্টা’ মধ্য দিয়েই সংসদীয় গণতন্ত্রের পাশাপাশি আইনের শাসনের ধারণার সূচনা হয়। এই সনদেই সর্বপ্রথম ঘোষণা করা হয়, রাজাসহ সে দেশের সকলেই রাষ্ট্রীয় আইনের অধীন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রজাদের অধিকার ও রাজার ক্ষমতা হ্রাসের যৌক্তিক এ দলিল পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহুদেশে মানবাধিকার ও জনগণের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।

ষোড়শ শতকে বৃটিশ জনগণের আন্দোলনের ফলে প্রথম যে তাৎপর্যপূর্ণ দলিলের সৃষ্টি হয় তা ‘পিটিশন অব রাইটস’ নামে অভিহিত। ১৬২৮ সালে ‘পিটিশন অব রাইটস’ সংসদ কর্তৃক আইনের আকারে গৃহীত হয়েছিলো। পার্লামেন্টের সম্মতি ছাড়া করারোপ, বিনা অপরাধে কারারুদ্ধকরণ, ব্যক্তিগত বাসস্থানে স্বেচ্ছাচারী অনুপ্রবেশ এবং সামরিক আইনের প্রয়োগ থেকে জনগণকে সুরক্ষা প্রদান করেছিলো মানবাধিকারের এ গুরুত্বপূর্ণ দলিলটি।

১৬৮৯ সালে ‘বিল অব রাইটস’ ব্রিটিশ পার্লমেন্টে গৃহীত ও বিধিবদ্ধ আইনে রূপান্তরিত হয়। প্রখ্যাত ফরাসী দার্শনিক ভল্টেয়ারের মতে, ‘বিল অব রাইটস’ প্রত্যেক মানুষকে সেই সমস্ত  প্রাকৃতিক অধিকার পুনরুদ্ধার করে দিয়েছে, যেগুলো থেকে তারা দীর্ঘদিন ধরে শাসকগোষ্ঠী থেকে বঞ্চিত ছিলো। যেমন, জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার পূর্ণ স্বাধীনতা, লেখনীর অধিকার, স্বাধীন লোকদের দ্বারা গঠিত জুরি ছাড়া ফৌজদারী অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন না হওয়ার স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা। শুধু তাই নয়, ‘বিল অব রাইটস’ বলা হয়, পার্লামেন্টের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে রাজা যদি কোনো আইনকে স্থগিত বা ভঙ্গ করেন অথবা রাজা তার খরচের জন্য ইচ্ছেমত করারোপ করেন বা রাজ-কমিশন বা রাজ-আদালত গঠন করেন তাহলে এগুলো হবে বেআইনী ও ধ্বংসাত্মক।

গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ ও  প্রগতিশীলতার সঙ্গে মানবাধিকার ও সুশাসনের সম্পর্ক যেমন অবিচ্ছেদ্য, তেমনি তা প্রযোজ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রেও। সাম্প্রতিককালে বিশেষ উদ্দেশ্যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চেয়ে উন্নয়নকেই গুরুত্ব দেয়া জরুরি বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র ও  মানবাধিকারের বোধবর্জিত উন্নয়ন কখনো অর্থবহ হয়ে ওঠে না। মানুষ যেখানে অধিকার বঞ্চিত, আতঙ্কিত, অনিরাপদ ও অরক্ষিত বোধ করে সেখানে উন্নয়নও হয়ে যায় নিষ্ফলা। তাই শুধুই উন্নয়ন উন্নয়ন বলে গলা ফাটানোকে কেউই স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না বরং এসবকে মহল বিশেষের রাজনৈতিক চালাকি বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এগুলোই শুধু মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সাবলীল করে না। স্বাধীন ও স্বাচ্ছন্দ্যে মত প্রকাশের অধিকার, নির্বিঘেœ চলাফেরার অধিকার, নিজের সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষার অধিকার, জীবনধারণের অধিকার, শান্তিতে বসবাস করার অধিকার, জুলুম-অত্যাচার ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার অধিকার, মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা থেকে বাঁচার অধিকার, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার পরিবেশ পাবার অধিকার সহ আরও অনেক কিছুই মানবাধিকারের আওতাভুক্ত।

মানবাধিকারের বিষয়ক ধারণাটি অতিপ্রাচীন হলেও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তা আরও পরিশীলিত হয়েছে। আমাদের সংবিধানেও অবাধ গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘The Republic Shall be a democracy in which fundamental human rights and freedoms and respect for the dignity and worth of the human person shall be guaranteed......’ অর্থাৎ ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি প্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে....’। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী বিশ্বের ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র প্রায় সকল দেশ এখন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আন্তঃরাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং আমাদের সংবিধানে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হলেও এক্ষেত্রে আমাদের অর্জন ও অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়।

আমাদের দেশে আইন ও সাংবিধানিক শাসন এবং মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্নটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বস্তুত রাজনৈতিক সঙ্কট ও স্থিতিশীলতার অভাব, আইনের শাসনের দুর্বলতা, শ্রেণিবিশেষের আইন মানার বিষয়ে অনীহা, আইনের অপপ্রয়োগ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই আমাদের দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রম অবনতিশীল। রাষ্ট্র ও সরকার নাগরিকদের অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। 

মানবাধিকার সংস্থারগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধুমাত্র  গত ২০১৭ সালেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রায় ৮শ নারী। ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের পরিসংখ্যানে আরও ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে বলা হয়, ২০১৭ সালে ২ হাজারেরও অধিক নারী শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। অপরাধীরা শাস্তির আওতায় এসেছে হাজারে দু’জনেরও কম। বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ হয়েছে বলে সরকারের পক্ষে দাবি করা হলেও সে সময় প্রতিদিনই ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালে এসে সে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে বলে দাবি করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) দাবি করেছে, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোর অগ্রগতির ধারা  ২০১৮ সালে অব্যাহত থাকলেও মানবাধিকারের সূচকে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি বরং বড় ধরনের অবনতিই ঘটেছে।

এতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, বিশেষ করে ক্রসফায়ার, কথিত বন্দুকযুদ্ধ ও গুম-গুপ্তহত্যার ঘটনা অব্যাহত ছিল। বিশেষত গত বছরের মে মাস থেকে শুরু হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধে দেশজুড়ে ২৯২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। ২০১৮ সালের আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বেআইনি আটক, গণগ্রেফতার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো ঘটনা।

আসক দাবি করেছে, ২০১৮ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, গুলিবিনিময়, নিরাপত্তা হেফাজতে মোট ৪৬৬ জন নিহত হয়েছে। এর সংখ্যা ২০১৭ সালে ছিল ১৬২। ২০১৮ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে গুম হন ৩৪ জন। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ১৯ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে। যাদের অধিকাংশই বিভিন্ন মামলায় আটক আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

এমনকি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। ২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন। ধর্ষণপরবর্তী হত্যার শিকার ৬৩ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাতজন। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন। আর ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭২৪। মূলত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড আগের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী ও শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত নির্যাতনও বেড়েছে একই ভাবে। ২০১৮ সালে সারাদেশে ৪৩৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ২২ শিশু। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে মারা গেছে ২৭১ শিশু। বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ সম্প্রতি এসব তথ্য জানিয়েছে।

ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন উদ্বেগজনক পর্যায়েই পৌঁছেছে। কিন্তু রাষ্ট্র বা সরকার এসবের প্রতিবিধান করতে পারছে না বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। গত বছরের শেষ দিক থেকে বিরোধী মহলগুলো জোরলো অভিযোগ করে আসছে যে, সরকার ভিন্নমতকে দমনের জন্য রাজনৈতিক নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। এজন্য বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দেয়া হয়েছে। প্রতিটি মামলায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(৩) এবং ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩(ক) ধারায় রুজু করা হচ্ছে। মৃত, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তি, অসুস্থ হয়ে বাড়িতে বা হাসপাতালে রয়েছে তাদেরকেও মামলার আসামী করে এজাহারভুক্ত করা হয়েছে। যা শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘনই নয় রাষ্ট্রাচারেরও চরম বিচ্যুতি বললে অত্যুক্তি হবার কথা নয়।

গ্রীক দার্শনিক এরিষ্টটলের মতে, ‘রাষ্ট্র হলো কয়েকটি পরিবার ও গ্রামের সমষ্টি, যার উদ্দেশ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন।’ কিন্তু রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য সে স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তাই রাষ্ট্র সম্পর্কে নাগরিকদের অনিহা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মূলত রাষ্ট্র একটি চিরস্থায়ি  প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু তাই বলে বিনাশ হয় না। তাই রাষ্ট্রকেই গণমানুষের সকল অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রের কার্যকারিতা ও উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ