বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বেকারত্ব ভয়ংকর পর্যায়ে

দেশে শিক্ষিতসহ বেকারের সংখ্যা যখন লাখের অংকে বেড়ে চলেছে তেমন এক সময়ে বিভিন্ন কোম্পানিতে শুরু হয়েছে ঢালাও ছাঁটাই। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি ছাঁটাই কার্যক্রমের পেছনে বিভিন্ন কোম্পানির যুক্তিরও উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তি দেখাতে গিয়ে কোম্পানিগুলো বলেছে, তাদের মুনাফা তথা আয় কমে যাচ্ছে অস্বাভাবিক হারে। যেমন একটি কেবলস কোম্পানি জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটি যেখানে ১১৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা আয় বা মুনাফা করেছিল, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থাৎ প্রথম তিন প্রান্তিকে সেখানে আয় হয়েছে মাত্র ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর ফলে এক বছরের ব্যবধানেই কোম্পানিটির আয় বা মুনাফা কমেছে ৭৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই কোম্পানিকে কর-পরবর্তী লোকসানও গুনতে হয়েছে ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অথচ পূর্ববর্তী বছরের এই সময়ে লোকসানের স্থলে মুনাফা হয়েছিল এক কোটি ২১ লাখ টাকা। তারও আগের অর্থবছরে কর-পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ ছিল দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

অন্য সব দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির অবস্থাও প্রায় একই রকম। এসবের মধ্যে বেশি বিস্ময়ের কারণ ঘটিয়েছে ‘রমরমা’ বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠা রবি ও গ্রামীণ ফোনসহ বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানিগুলো। গ্রামীণ ফোনের বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক টেলিনর দু’বছর আগেই ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল। বর্তমানে সেই ঘোষণা অনুযায়ী ছাঁটাই করা হচ্ছে।

ব্যাংক-বীমাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও ছাঁটাই কার্যক্রম চলছে পাল্লা দিয়ে। দেশি কাম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই করা হচ্ছে বিশেষ একটি বীমা কোম্পানিতে। কোম্পানিটি ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট একটি গ্রুপের মালিকানায় যাওয়ার পর গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দু’ হাজারের বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। শুধু ছাঁটাইয়ের জন্য নয়, অভিযোগ উঠেছে অনৈতিকভাবে ঢালাও ছাঁটাই করার কারণেও। ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়ায় বীমা কোম্পানিটি শ্রম আইন লংঘন করেছে এবং কাউকেই আগে নোটিস দিয়ে জানায়নি। 

প্রায় সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানতে পেরেছেন অফিসে ঢুকতে যাওয়ার সময়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন তাদের আঙুলের ছাপ গ্রহণ করেনি। ফলে তারা অফিসেও ঢুকতে পারেননি। পরে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, তাদের চাকরি নেই। অর্থাৎ বিনা নোটিসে তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। জানা গেছে, ওই বীমা কোম্পানিতে এখনো ছাঁটাই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মালিক পক্ষ নাকি লোকসানের যুক্তি দেখাচ্ছেন। অথচ সরকার সমর্থক বিশেষ গ্রুপটির মালিকানায় যাওয়ার আগে পর্যন্ত বীমা কোম্পানিটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল।

এভাবেই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বিচারে চলছে ছাঁটাই কার্যক্রম। ফলে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার মানুষ। একযোগে ভিড় বাড়ছে বেকার তথা চাকরি প্রত্যাশীদের বাজারে। বিআইডিএস ও সিপিডিসহ অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের জরিপ রিপোর্টের ভিত্তিতে জানিয়েছে, বেকারের সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় চাকরির সুযোগ যেমন বাড়ছে না তেমনি চাকরিও পাচ্ছে না বেকাররা। বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি আইআইটিএম জানিয়েছে, দুই বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে তাদের মাধ্যমে নিয়োগ কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে চাকরি প্রত্যাশীদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে অবিশ্বাস্য হারে। 

অন্য বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও এ ধরনের পরিসংখ্যানের সত্যতা পাওয়া গেছে। যেমন রাষ্ট্রীয় গবেষণা সংস্থা বিবিএসÑ বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্সের পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, দেশের প্রতি তিনজন যুবকের মধ্যে একজন বেকার। ওদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আইটলুকÑ২০১৮’ শীর্ষক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আইএলও’র একই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে কেবল পাকিস্তান।  

এভাবে বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট ও পরিসংখ্যানের উল্লেখে যাওয়ার পরিবর্তে এককথায় বলা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেয়ার এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর গালগল্প শোনানোর পাশাপাশি দেশকে কানাডার মতো উন্নত ও ধনি রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে দেশ এখনো পেছনেই পড়ে আছে। তীব্র বেকারত্বের তথ্য-পরিসংখ্যানই এর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। 

অর্থনীতিবিদ ও তথ্যাভিজ্ঞরা এমন অবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে বিনিয়োগ না বাড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, বিশেষ করে শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে বিনিয়োগের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছেন বলেই চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা শুধু বেড়েই চলছে না, তাদের মিছিলও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সিপিডির হিসাবে দেশের শ্রম বাজারে প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে প্রায় আট লাখ বেকারÑ যাদের মধ্যে শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

উদ্বেগের কারণ হলো, দেশে যেখানে চাকরিই পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো নতুন কাউকে চাকরি দেয়ার পরিবর্তে উল্টো ঢালাওভাবে ছাঁটাই কার্যক্রমকে জোরদার করেছে। হাজার হাজার চাকরিজীবীকে নীরবে ছাঁটাই করা হচ্ছে। প্রায়  কোনো ক্ষেত্রেই শ্রম আইন পর্যন্ত মানা হচ্ছে না। 

আমরা এই ছাঁটাই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই এবং মনে করি, সরকারের উচিত ছাঁটাই বন্ধ করার জন্য কোম্পানিগুলোকে চাপ দেয়া। প্রয়োজনে ছাঁটাই বন্ধ করতে বাধ্য করা। সরকারকে একই সঙ্গে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করার ব্যাপারেও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। 

এ ব্যাপারে বিশেষ করে বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট ও উৎসাহিত করতে হবে। কথাটা বলার কারণ, বর্তমান সরকারের আমলে নিকট অতীতেও দেখা গেছে, শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য জমি কেনা ও তার রেজিস্ট্রেশন করা থেকে গ্যাস-পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে প্রধানত ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসা বহু শিল্প উদ্যোক্তা মাঝপথে থেমে পড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেকে এমনকি ভারত ও ইন্দোনেশিয়াসহ আশপাশের অন্য দেশগুলোতে গিয়ে বিনিয়োগ করেছেন।

চলমান এ নেতিবাচক অবস্থার অবশ্যই অবসান ঘটাতে হবে এবং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে বিদেশিরা যাতে আস্থার সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। সব মিলিয়ে শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে দেশে একদিকে শিল্পায়ন যেমন ঘটবে অন্যদিকে তেমনি বেকার সমস্যারও সমাধান হবে অনেকাংশে। আমরা মনে করি না যে, বড় বড় ফ্লাইওভার এবং মেট্রোরেল লাইন নির্মণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বাইরে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।  ক্ষমতাসীনরা লোক দেখানো উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেয়ার চলমান কর্মকান্ড কমিয়ে ও বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে অবিলম্বে উদ্যোগী হয়ে উঠবেন বলেই আমরা আশা করতে চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ