মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কৃষকের ঘরে ঈদ আনন্দ থাকবে না

জিবলু রহমান : [দুই]
সরকারি হিসাবে এক মণ ধানের দাম হয় ১০৪০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারে এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। এতে করে প্রতি মণ ধানে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৪৪০ টাকা।
কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম বিষয়টি আরো সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘...১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় আইউব খানের আবির্ভাব। স্বৈরশাসক আইউব খানের চাইতে অত ক্ষমতাবান বাদশাহী জৌলুস আর কোনো শাসক দেখাতে পারেননি। ১০ বছরের স্বৈরশাসনে গ্রামেগঞ্জের মানুষকে আলাদা করে দিয়েছিল। যেদিকে তাকানো যেত সেদিকেই টিনের ঘরে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করত। বোঝা যেত ওটা বিডি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বাড়ি। তখন দরিদ্রতায় আমরা ছিলাম মুহ্যমান। এক পাখি জমিতে ১০-১২ মণ ধান হতো। আগেই বলেছি ধানের মণ ছিল ৫-৬ টাকা, খরচ পড়ত দুই-আড়াই টাকা। ১৯৬০-’৬২ সালে দেশে এলো ইরি ধান। ফলন হয়ে গেল দ্বিগুণ। গান বেরোল, ‘আইউব খান সোনার চান্দ, আনল দেশে ইরি ধান।’ মনে হলো এ যেন কৃষি বিপ্লব। প্রায় সব কৃষকের অবস্থা দুই-তিন বছরেই বদলে গেল। ছনের ঘর হলো টিনের ঘর।
কেউ কেউ ঢোয়া পাকা করল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক জোয়ার। পাখিতে ১২ মণের জায়গায় ২৪-২৫-৩০ মণ এ এক অকল্পনীয় ব্যাপার। মানুষের আনন্দের সীমা রইল না। যেসব খেত প্রদর্শনীর জন্য করা হয়েছিল সেখানে একরে ১০০-১১০-১১৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়েছে। এ প্রায় চলেছিল ২০ বছর। এখন তো আরও উন্নত ধরনের বীজ হয়েছে। ফসল ফলনে ঘাটতি নেই। এখনো একরে সবকিছু ঠিকঠাক মতো হলে ৭০-৮০ মণ সব সময় ফলন ফলে। কিন্তু ব্যাপার হয়েছে অন্যরকম। সবকিছুর দাম বাড়লেও কৃষি পণ্যের দাম তাল রেখে তেমন বাড়েনি। ধান ফলাতে খেতে পানি দিতে হয়। পানির সিকি ভাগ।
কৃষক সবকিছু দিয়ে যে ফসল ফলায় যার পানি দেওয়ার মেশিন আছে সে কৃষকের চাইতে খুব একটা কম লাভবান হয় না। ধান ফলাতে বীজ বুনতে হয় বা জালা ছিটাতে হয়। তারপর জমি প্রস্তুত করে সেখানে জালা গাড়তে হয়, সার দিতে হয়, কীটনাশক দিতে হয়। মাঝে নিড়ানি দিতে হয়। একজন শ্রমিক তিন-চার মণের জালা বুনতে পারে। একজন শ্রমিক ছয়-সাত মণ ধানের জালা ছিটাতে পারে। একজন শ্রমিক ৬-৭-৮ মণ ধানের খেতে নিড়ানি দিতে পারে।
একজন শ্রমিক খুব বেশি হলে তিন মণ ধান কাটতে এবং ঝাড়-বাছ করে গোলায় উঠাতে পারে। এসব হিসাব করলে ধান খেত থেকে গোলায় তোলা পর্যন্ত চারজন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। প্রতি শ্রমিকের ৫০০ টাকা মজুরি হলে চার মণ ধানে এমনিতেই ২০০০ টাকা খরচ। আর এই যে চারজন শ্রমিক, তাদের তিন বেলা খাওয়াতে না হলেও ১৫০-১৮০ টাকা খরচ। যদি ২০০ টাকা ধরা হয় তাহলে তাদের খাওয়া খরচ আরও ৮০০ টাকা। এবার বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে, ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি। ৫০০ টাকাতেও নেই, আরও বেশি হয়ে গেছে। কোনো কোনো জায়গায় অতিরিক্ত আরও দুই-তিনশ টাকা।
তাই এই মস্তবড় বিপত্তিতে গা এলিয়ে দিলে চলবে না, গবেষকদের খুঁজে বের করতে হবে ক্রটি কোথায়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এই ঢেকুর তুলে ভবিষ্যতে যাতে না খেয়ে মরতে না হয়। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কথা অনেকেই ভুলে গেছেন। ব্রিটিশ আমলে দুর্ভিক্ষে প্রায় ৭০-৮০ লাখ মানুষ না খেয়ে মরেছিল। বাংলাতেই মরেছিল ৪০-৫০ লাখ। তাই গদাই লশকরির চালে না চলে সময় থাকতে ভাবতে বলছি। ৩০০ টাকা ভর্তুকি দিলে কয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে হিসাব করে দেখবেন। অর্থমন্ত্রী একজন বিজ্ঞ মানুষ। তাকে ব্যাপারটা ভেবে দেখতে বলছি। প্রধানমন্ত্রী তো আছেনই...।’ (সূত্র : এসবের প্রতিকার কী?, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২১ মে ২০১৯)
 প্রধানমন্ত্রীর এলাকার কৃষকরা যখন বিপাকে তখন বেশি তথ্য উল্লেখ করার প্রয়োজন হয় না। চলতি বোরো মৌসুমে কোটালীপাড়া উপজেলায় ১ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। এ উপজেলার লোক সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। সারা বছর বছর খাদ্য চাহিদা (ধানের হিসেবে) ৬১ হাজার ৫ শ’ ৯৪ মেট্রিকটন। অপরদিকে এ উপজেলায় সরকারিভাবে ধান ক্রয় করা হবে মাত্র ৮ শ’ ২৪ মেট্রিক টন। প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ধান কৃষকের হাতে মজুদ থাকবে।
কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান না কেনায় সরকার নির্ধারিত মূল্য পাচ্ছে না কৃষকরা। এ বছর কৃষককে এ সংকট থেকে রক্ষা করতে সারা দেশে সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
গত দুই বছরের আমদানি করা চাল গোডাউনে থাকায় নতুন করে ধান কিনতে পারছে না মিল মালিকরা। তবে এখনও আমদানি হচ্ছে চাল। প্রশ্ন হলো কার স্বার্থে এ পদক্ষেপ? খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সরকারি-বেসরকারিভাবে গত ১০ মাসে ২ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আমদানির অপেক্ষায় রয়েছে আরও ৩ লাখ ৮০ হাজার টন চাল। অতিরিক্ত ধান উৎপাদন তার ওপর চাল আমদানি। ২০১৭ সালের মে মাসে হাওরে আগাম বন্যায় ফসলহানির পর সরকার চালের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দেয়। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, এই ক্ষতির ফলে ঘাটতি হবে ১০ লাখ টন চালের। কিন্তু গত দুই বছরে দেশে প্রায় ৬০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আমদানি করা এসব চালের অধিকাংশই এখনও অবিক্রীত রয়ে গেছে। আর এ কারণেই মিলারদের গোডাউনে ধান রাখার কোন জায়গা নেই।
২০১৮ সালের নবেম্বরে সরকার ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনর্বহাল করে। এতে চাল আমদানি কমলেও বন্ধ হয়নি। বাড়তি উৎপাদন ও আমদানির চাল বাজারে চাপ তৈরি করছে। ফলে দাম নিয়মিত কমছে।
দেশে যখন প্রচুর চাল আমদানি হচ্ছিল, তখনই ভাবা উচিত ছিল কৃষকের ধান উঠলে দাম কমে যেতে পারে। এই মুহূর্তে সরকারকে দেখানো উচিত ছিল তারা ধানের দাম বাড়ানোর জন্য তৎপর। এখন সরকারের উচিত হবে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ধান-চাল সংগ্রহ বাড়ানো। আর দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।
১৯ মে ২০১৯ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইআরডি সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী কৃষকের দুঃখ নিয়ে কথা বলেছেন। এ সময় আগামী ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে কৃষি ও এর উপখাতগুলোতে সরকারের বরাদ্দ ও বিশেষ গুরুত্ব প্রস্তাব হিসেবে অর্থমন্ত্রীর কাছে সুপারিশমালা প্রদান করেছেন কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। শাইখ সিরাজের দেয়া এবারের সুপারিশমালায় যেসব বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সেগুলো হলো :
১। ধানের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয়ের ব্যাপারে উদ্যোগকে আরো বাস্তবমুখী প্রয়োগ করা,
২। পরিবর্তিত জলবায়ু মোকাবিলা করে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে শষ্যবীমা স্থায়ীভাবে চালু করা,
৩। দেশে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী ও খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করা,
৪। কৃষিপণ্যের উন্নত ও আধুনিক বাজার ব্যবস্থা চালু করা,
৫। সরকারের বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করা এবং বীজের মান নিশ্চিত করা,
৬। কীটনাশক আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ,
৭। কৃষির যান্ত্রিকীকরণে কৃষককে আরো অভ্যস্ত করে তোলা এবং আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর ভর্তুকি ও শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং পোল্ট্রি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়ানো,
৮। বীমা ব্যবস্থা চালু করা এবং এ খাতের বিদ্যুৎ বিল ও ঋণপ্রদানে কৃষি খাতের অনুরূপ সুযোগ সুবিধা প্রদান করা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারিদেরকে বাঁচাতে পোল্ট্রি নীতিমালা মাঠ পর্যায়ে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
অর্থমন্ত্রী দেশের কৃষকদের বাঁচাতে চাল আমদানি বন্ধ এবং ভর্তুকি দিয়ে হলেও চাল রফতানি করা হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ বছর আনইউজুয়ালি আমরা অনেক বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে পেরেছি। আমাদের যেমন বেশি উৎপাদন হয়েছে, আশপাশের দেশেও তেমনি করে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে। বাইরে যদি ডিমান্ড (চাহিদা) থাকত, আমরা রফতানি করতাম। বাইরেও চাহিদা নাই। তারপরও দেশের কৃষকদের বাঁচাতে চাল আমদানি বন্ধ করা হবে।
মোস্তফা কামাল বলেন, আমাদের কৃষককে বাঁচাতে হবে। আমরা সরকার থেকে যেটা করতে পারি, সেটা হলো আমরা আমদানি রেস্ট্রিক্ট (বন্ধ) করতে পারি। সরকারিভাবে আমরা এই কাজটি করব। অবশ্যই রেস্ট্রিক্ট করব। আমরা তো এটা ব্যান্ড করে দিতে পারব না।
তিনি বলেন, আমার মন্ত্রণালয় থেকে যা যা করা দরকার, সেগুলোর প্রতিফলন আপনারা দেখতে পাবেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা অবশ্যই সুবিবেচনা করবেন। এটি তার মন্ত্রণালয়েরই কাজ। ভর্তুকি দিয়ে শবজি রফতানি করায় সবজির উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবজি অনেক হচ্ছিল। কৃষকরা দাম পাচ্ছিল না এবং এগুলা পচে যাচ্ছিল। আমরা রফতানির ব্যবস্থা করলাম। রফতানি খরচ দিতে পারে না বলে আমরা সেখানে ভর্তুকি দিচ্ছি। ভর্তুকি দিয়ে আমরা সেই কাজটি করছি। এর কারণে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চার নম্বরে। রফতানি করার কারণে এর বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। সবজিতে অন্তত দামটা পাচ্ছে কৃষকরা। একইভাবে চালও ভর্তুকি দিয়ে রফতানি করা হবে বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি বছর ধান উৎপাদন বেশি হয়েছে। কিন্তু এখন চালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারেও কম। চালও প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে রফতানি করতে পারি। সেই উদ্যোগটাও আমরা গ্রহণ করব। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করব।
অর্থমন্ত্রী জানান, শুধু সবজি নয়, যে বছর যে পণ্য বেশি উৎপাদন হবে, সেগুলোও রফতানি করা হবে। তাহলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে মিসম্যাচটা (ব্যবধান) হবে না। ন্যায্য দামটা কৃষক পাবেন। অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল বলেছেন, উৎপাদন করে তারা যদি উৎপাদনের খরচ না পায়, তাহলে একদিকে তারা নিরুৎসাহিত হবে। অন্যদিকে আমরা মনে করি, এটি সরকারের জন্য একটি অনৈতিক বিষয়। সরকারকে সবদিকেই দেখতে হবে, উৎপাদনও দেখতে হবে, উৎপাদনের জন্য সহায়ক যা আছে, এগুলোরও সমাধান দিতে হবে। এটা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। আমি মনে করি, এটা অবশ্যই করণীয়। কৃষি যন্ত্রপাতির বিষয়ে মোস্তফা কামাল বলেছেন, আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, আমরা যে কৃষি যন্ত্রপাতিগুলো দিই, সেগুলো নিতেও চায় না। আমরা অনেক ভতুর্কি দিয়ে দিতে চাই। জোর করে দেয়া লাগে। সবাইকে অবহিত করতে হবে, যদি কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন, তাহলে উৎপাদন বাড়বে। ব্যয়ও কমে যাবে। এই ব্যয় কমানোর জন্যও আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ