মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মুক্তির বাণী আমরা কতটা মানি

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের যে দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা গেছে, তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। ১৫ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ধর্ষণের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল করে দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “এই দেশে পয়সা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কেনা যায়, পয়সা দিয়ে আইনজীবী কেনা যায়, এমনকি আদালত পর্যন্ত কেনা যায়। তাই বলতে চাই, ধর্ষণের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল করে দ্রুত বিচার করুন তাহলে দেখবেন এসব অপরাধ কমে গেছে। এসব অপরাধী বিএনপি-জামায়াতের চেয়েও ভয়ঙ্কর।” পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জনাব নাসিমের আরও কিছু বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন দেখছি নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশুহত্যাÑ এসব আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। কেন ও কী কারণে সিরিজের মতো এ ধরনের ঘটনা ঘটছে ? এসব ঘটনার ক্রিমিনালরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই সামাজিক অপরাধগুলো বন্ধ করার জন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করুন। বাইরের দেশগুলোতে দেখুন তারা প্রতিটি ঘটনার দ্রুত বিচার করে। তাই তাদের অপরাধগুলো কমে আসে।
নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো নিষ্ঠুর অপরাধের ব্যাপারে সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নামি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তা ভেবে দেখার মতো। প্রসঙ্গত তিনি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। সব যদি কেনা যায় তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ, দরিদ্র মানুষ ন্যায়ের জন্য কোথায় যাবে ? তার বিশ্লেষণে দেশে সুশাসনের সংকটের কথাও ওঠে এসেছে। এসব বিষয়ে এবং ধর্ষণের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ব্যাপারে সরকার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
‘আমার মেয়েকে নিয়ে সিনেমা বানাবেন না’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ১৯ মে তারিখে মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে ফেনীর সোনাগাজীতে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার বলেছেন, আমার মেয়ে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে। নুসরাত শহীদ হয়ে গোটা বিশ্বের মানুষের মনে দাগ কেটেছে। সে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছে। সিনেমা-নাটক বানিয়ে তাকে দোযখে নিবেন না দয়া করে। শুনেছি, কে নাকি আমার মেয়েকে নিয়ে সিনেমা ও নাটক বানানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন। দয়া করে আমার মেয়েকে নিয়ে কেউ সিনেমা বা নাটক বানাবেন না। আমার মেয়ে একটি নিষ্পাপ ফুল। এই ফুলকে কষ্ট দিবেন না। আমরা অর্থের দিক দিয়ে গরিব হতে পারি, কিন্তু ধর্মের দিক দিয়ে আমরা গরিব নই। আমার মেয়েকে প্রথমে নূরানি মাদরাসায়, পরে মহিলা মাদরাসায় এবং সেখান থেকে দাখিল পাস করার পর সোনাগাজী মাদরাসায় ভর্তি করাই। নুসরাতের বাপ, দাদা, চাচা ও ভাই সবাই আলেম। দুনিয়ায় কিছু না পেলেও আখেরাতে আমার মেয়ে শহীদী মর্যাদা পাবে। নুসরাতের মা মেয়ের ব্যাপারে তার অনুভূতি সরলভাবে ব্যক্ত করেছেন। তার সরল বক্তব্যে সিনেমা-নাটক, মেয়ের সংগ্রাম ও ধর্মের মর্যাদা সম্পর্কে সঙ্গত অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। তিনি তার মেয়েকে নিষ্পাপ ফুলের সাথে তুলনা করে বলেছেন, এই ফুলকে যেন কেউ কষ্ট না দেয়। যৌন নিপীড়নের ব্যাপারে মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন নুসরাত। তার মা ন্যায়বিচারের আশায় মামলা করেন। এরপর ওদের ওপর নেমে আসে হুমকি-ধমকি ও নিপীড়ন। এমন চ্যালেঞ্জে নুসরাত ভড়কে যাননি। তিনি এবং তার পরিবার বিচারের দাবিতে ছিলেন সোচ্চার। এক পর্যায়ে দুর্বৃত্তরা নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। যার ফলে নিহত হন নুসরাত।
দুঃখের বিষয় হলো, নুসরাতের এমন পরিণতির জন্য একক কোন ব্যক্তি দায়ী নন। অধপতিত ছাত্র-শিক্ষক, পুলিশ ও সরকারি দলের স্থানীয় নেতারা অন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করায় নুসরাত হত্যার মতো নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটতে পেরেছে। এমন চিত্র আমাদের সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত। সমাজের ও মানুষের নৈতিক মান কোন পর্যায়ে অবনমিত হলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে? উপলব্ধি করা যায়, আদম শুমারির খাতায় আমরা সবাই মুসলিম নামে পরিচিত হলেও প্রকৃত অর্থে আমরা মুসলিম হতে পারিনি। নয়তো সমাজের ক্ষমতাবান ও প্রাগ্রসর এতগুলো মানুষ কী করে সম্মিলিতভাবে নুসরাত হত্যার আয়োজন করতে পারলো? এই রমযানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, আমরা অনেকেই হয়তো সকাল-সন্ধ্যা উপবাস করছি, কিন্তু তাকওয়ার চেতনায় সমৃদ্ধ হতে পারছি না। তাকওয়া তথা খোদাভীতির চেতনায় সমৃদ্ধ হলে সমাজে নুসরাত হত্যার মতো ঘটনা ঘটতে পারে না।
মানুষের আয়ু এক সময় শেষ হয়ে যায়। পৃথিবীতে ধনী-গরিব, জালেম-মজলুম, শাসক-প্রজা সবাইকেই এক সময় দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হয়। মৃত্যু মানবজীবনে এক চরম সত্য। বিষয়টি এখন বেশ ভলভাবেই উপলব্ধি করছেন এক সময়ের প্রতাপশালী সেনাশাসক নব্বই বছর বয়সী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তাইতো পত্রিকার শিরোনাম ‘কবরের জায়গা খুঁজছেন এরশাদ’। এখন তো আমলনামা নিয়ে ভাববার সময়। এ ব্যাপারে ১৮ মে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে একটি প্রতিবেদন।
পরিবারের পক্ষ থেকে রংপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত করার প্রস্তাব করলে তাতে সায় দেননি সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। রাজধানীতে শায়িত হওয়ার বাসনা জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় এই নেতার। এ জন্য রাজধানীতে এক বিঘা জায়গা কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেখানে থাকবে মসজিদ, মাদরাসাসহ স্থায়ী কমপ্লেক্স। ছোট ভাই জিএম কাদেরসহ এরশাদ অতিসম্প্রতি রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে দুটি জায়গা দেখেছেন কিন্তু এমন একটি কবরস্থান ভবিষ্যতে মেনটেইন করা কঠিন হবে জানালে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়নি। বনানী কবরস্থানে জায়গা কিনে সমাহিত করার একটি পরিকল্পনাও আছে। এছাড়া সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে চাইলেই সামরিক কবরস্থানে সমাহিত হতে পারেন। তবে ভবিষ্যতে বিভিন্ন দিবসে এরশাদের কবরে ভিড় জমানো যাবে না এমন আশংকায় সামরিক করবস্থানে যাওয়া হচ্ছে না। অনুমতি পেলে সংসদ ভবন এলাকাতেও কবর হতে পারে সাবেক এই প্রেসিডেন্টের। এ সবই অপশন। তবে এরশাদের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, এরশাদের দীর্ঘদিনের বাসনা রাজধানীতে একটু নিরিবিলি জায়গায় শায়িত হবেন। যেখানে কবরের পাশেই থাকবে মসজিদ। আর মাদরাসায় নিয়মিত উচ্চারিত হবে আল-কুরআনের বাণী। থাকবে প্রচুর গাছপালা। তবে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের শেষ ঠিকানা কোথায় হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
জায়গা চূড়ান্ত না হলেও সব মানুষের মতো এরশাদেরও শেষ ঠিকানা নির্দিষ্ট হয়ে আছে, আর তা হলো কবর। এরশাদের বাসনা তার কবরের পাশে থাকবে মসজিদ-মাদরাসা। প্রাকৃতিক পরিবেশে সেখানে নিয়মিত উচ্চারিত হবে আল-কুরআনের বাণী। আল-কুরআনের বাণীতো প্রশান্তির বাণী, মুক্তির বাণী। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনযাপনে এই বাণী তিনি এবং আমরা কতটা পড়ি, শুনি এবং মানি?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ