শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

তাবাচ্ছুমের প্রথম রোজা পালন

আয়মান সওদা : “মাফরোহা তাবাচ্ছুম” একজন আদর্শ শিক্ষক আব্দুল হালীম এবং শিক্ষিকা তাহেরা হালীমের আদরের মেয়ে। বাবা-মা দু-জনই চাকুরীজীবী হওয়ায় তাবাচ্ছুমের অধিকাংশ সময় কাটে নানার বাড়ি খালা-মনিদের সাথে। দিনের শেষ বেলায় মা, আর রাতের বেলায় বাবাকে কাছে পায় সে। তারপর বাবা-মার কাছে হাজারো অভিযোগ-অনুযোগ আর মান-অভিমানের সাথে তার রাত কাটে। সকাল বেলা আবার তার আশ্রয় হয় খালা-মনিরা।
নানার বাড়িতে তাবাচ্ছুম একমাত্র ছোট্টমনি হওয়ায় তার আদরের শেষ নেই। বড়মামা তাকে ‘আলো’ বলে ডাকে, মেঝো মামা-ছোট মামা, নানা-নানু সবার কাছে সে আদরের নয়ন মনি-‘তাবা’ নামে পরিচিত। ছোট্ট ‘তাবার খেলার সাথী তার কলেজ পড়ুয়া ছোট খালামনি, তার খেলনাও খালামনির পুরনো বইখাতা, কলম, পেন্সিল ইত্যাদি।
মাত্র দু-বছর বয়সে সে নানার কাছে সূরা ফাতিহা এবং সূরা ইখ্লাস আয়ত্ব করতে সক্ষম হয়েছে, ঘুমানোর সময় ঘুমের দোয়া, খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ্ বলতেও সে ভুল করে না, আরো আশ্চর্যের বিষয়! ছোট ছোট ছড়া তো বটেই র্ফরুখ আহমদের ১৬ লাইনের বৃষ্টি ছড়া তার মুখস্ত।
খালামনির বড় বড় বই বের করে সে একাকী নিজের ভাষায় পড়তে থাকে, যেন সব বিষয়ে সে পারদর্শী। মোট কথা সার্বিক ব্যাপারে সে ছোট খালামনিকে কপি করতে পাকোয়াজ।
তাবাচ্ছুমকে খাওয়াতে গেলে গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসতে হয় খালামনিকে, বাঘ মামার গল্প, রাজা রানীর গল্প, পরীদের গল্প, আর জান্নাত-জাহান্নামের গল্প তার পছন্দ। এমন কি তার খাবারগুলোকে বলতে হবে জান্নাতের সুঁজি-জান্নাতের কমলা, ইত্যাদি। বেহেস্তের খাবার না বললে তার খাওয়া হয় না। একটার পর একটা গল্প হবে, তার সাথে তার খাওয়া  হবে। যখন খাওয়া শেষ হয়ে যাবে, খাবারের শেষটুকু সে খালামুনিকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। কখনো ভারিক্কি কায়দায় বলবে-
“তাড়াতাড়ি খাওতো ! আমার অনেক কাজ আছে, নানু বকা দিবে।
এমনিভাবে তার খাওয়া হয়।
রমযান মাসের এক বিকেলে, তাবাচ্ছুম খালামনির হতে নুডুলস খাচ্ছে, আর রমযান সংক্রান্ত হাজারো প্রশ্ন করছে। খাওয়া প্রায় শেষ, বাকীটুকু নিয়ে সে খালামনিকে বলল,
খালামনি এটা তুমি খাও, তুমি তো সারাদিন কিছু খাও নি।
খালামনি: আমি তো রোজা, আমি এখন খাব না।
তাবা: তুমি কখন খাও?
খালামনি: আমি ভোর রাতে সেহ্রী খেয়েছি, আবার সন্ধায় ইফতার করব।
তাবা: আমিও তোমার সাথে সেহ্রী খাবো আর ইফতার করব।
খালামনি: ঠিক আছে, খেয়ো।
তাবা: তুমি কি করছ?
খালামনি: ইফতার রেডী করছি, তুমি সবাইকে ডাকো।
তাবা: নানা, নানু, মামা, আম্মু-আব্বু তোমরা আস ইফতার করবে।
সবাই আসলে তাবা তার ছোট্ট মনের হাজারো প্রশ্ন, ভাবাবেগ, উচ্ছাস, সবকিছু মিলিয়ে সামনে ইফতার নিয়ে বসা সবাইকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। এসব কি হচ্ছে তার সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
তবে আযানের সাথে সাথে সে সবার এটা সেটা নিয়ে খেতে লাগলো, হঠাৎ কি হলো, সে গাল ফুলিয়ে বলল
:তোমরা সেহ্রী খেয়েছো, আমাকে দাওনি।
নানু: আচ্ছা আজ তুমি সেহ্রীও খেয়ো।
ভোর রাতে কেউ তাবাকে ডাকতে ভুল করল না, সবাই খেতে বসেছে, তাবাও মেঝো মামার কোলে করে খাবার সরে এসে দেখলো সবার সামনে ভাত, ভাজি, তরকারী, দুধ ইত্যাদি।
সে কি যেন খুঁজছে, একসময় চিৎকার করে বলে উঠল,
:এ্যাঁ-আমি এসব খাবো না, সেহরী খাব——-।
তাবার কথায় সবাই হেসে উঠলো, আর তাকে সেহরী কি বুঝাতে লাগলো।
দেখতে দেখতে তাবাচ্ছুমের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন এক রমযানে তাবা খুব করে জিদ্ করল সে রোজা রাখবে। এখন সে সেহ্রী, ইফতার, এমন কি রোজার গুরুত্ব সম্পর্কেও মোটামোটি বুঝে। তাই আর তেমন করে মানা করলাম না।
তাবাচ্ছুমের যথাসময়ে সবার সাথে সেহ্রী খেল, খালামনির সাথে ফজরের নামাজ আদায় করল, কিছুক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত শুনল, তার পর একসময় ঘুমিয়ে গেল। ছোট্ট রোজাদার তাবাচ্ছুম রোজা অবস্থায় জীবনের প্রথম সকাল এবং দুপুর অতিক্রম কলল।
বিকেল বেলায় স্থানীয় একটা স্কুলে কিছু ছাত্রীদের নিয়ে খালামনি একটা ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে। রোজাদার তাবাচ্ছুম খালামনির সহযাত্রী হলো।
বিকাল চারটা,...স্কুলে একটা বেঞ্চে অন্যান্য ছাত্রীদের সাথে বসে এই ছোট্ট রোজাদারও কোরআন তেলাওয়াত, ইসলামী গান এবং রমযানের তাৎপর্য পূর্ণ আলোচনা শুনল। সবশেষে খালামনিরা সবার হতে ইফতারের প্যাকেটগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে, তাবা শুধু নির্বিকার তাকিয়ে দেখছে, একসময় সমস্ত দায়িত্ব শেষ করে খালামনি তাবার কাছে আসলো, ঘড়ির কাটা তখন ৫ টা অতিক্রম করেছে, খালামনিকে দেখে তাবা শুধু বলল-
: ‘খালামনি পানি দাও’ বলে সে চোখ দু’টি বন্ধ করে ফেলল, আর কোন শব্দ তার মুখ-থেকে বেরুল না।
মাগরিবের আর মাত্র দশ মিনিট বাকী, খালামনি বুঝতে পারছে না এখন কি করবে, ছোট্ট তাবা-র সারাদিনের সিয়াম-সাধনা কোন দিকে যাবে?
খালামনি কোন কূল কিনারা পাচ্ছিল না, তাছাড়া স্কুল বন্ধ, মাহফিল উপলক্ষে শুধু হল রুমটা খোলা, কিন্তু এখানে কোন পানির ব্যবস্থা নেই। খালামনি কিছু না বুঝে তাবা’কে কোলে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসার দিকে রওনা দিল।
সে দ্রুত হাটতে লাগলো, বাসায় যেয়ে আদরের তাবা মনিকে পানি খাওয়াবে। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য কিছু, যা কারো বুঝার সাধ্য ছিল না। বাসার গেটে পা রাখার সাথে সাথেই মাগরিবের আযান হয়ে গেল। তাবাচ্ছুমের অবস্থা দেখে সবাই উদ্বিগ্ন, খালামনি-
“আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফ্ তারতু” বলে তাবা’র মুখে শরবত দিল, আধা গ্লাস শরবত পানি  করে তাবা মনি চোখ খুলল, যেন সাথে সে বুঝতে পারল তার  ইফতার করা হয়েছে, তৃপ্তির হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে, পাঁচ বছরের ছোট্ট তাবাচ্ছুমের আমলের খাতায় জমা হলো মহান রমযান মাসের একটি রোজা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ