মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০
Online Edition

রমজানে গর্ভবতী মায়েদের রোজা

ডা. সাইয়েদ রাশীদুল হাসান জাহাঙ্গির : গর্ভবতীর রোজা নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এ ব্যপারে ইসলাম প্রায় পনেরশত বছর পূর্বেই সঠিক নির্দেশনা দিয়েছে। এ বিষয়ে করণীয় পরিষ্কার করে দিয়েছে পবিত্র কুরআন। এখন দেখবো বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান এ বিষয়ে কি বলে। গর্ভকালীন সময়কে তিন ভাগে ভাগ করে রোজা পালনের বিষয়ে পরামর্শ এসেছে।
প্রথম তিন মাস : বলা হয়েছে গর্ভকালীন প্রথম তিন মাস রোজা না রাখা উত্তম। এতিন মাসে গর্ভস্থ শিশুর সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরি হয়। এ সময়ে মায়ের শরীরে পুষ্টি, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, পানি ইত্যাদির অভাব ঘটলে বাচ্চা ও মা উভয়েরই ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে যায়। এর খারাপ প্রভাব পরবর্তি জীবনে মা ও শিশু উভয়ের উপর মারাত্মকভাবে বর্তাতে পারে। এছাড়াও গর্ভকালীন প্রথম তিন মাস গর্ভিনী নানা উপসর্গ যেমন, বমি ও বমি বমি ভাব, অরুচি, ক্ষুধামন্দা, মাথা ঘুরানি, ওজন হ্রাস পাওয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়। কাজেই প্রথম তিন মাস রোজা পালন না করাই উচিৎ।
দ্বিতীয় তিন মাস: গর্ভকালীন মধ্যবর্তী তিন মাস গর্ভবতী  কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন। এ সময়ে বাচ্চার অবকাঠামো তৈরি হয়। বিশেষ কোনো অসুবিধা না থাকলে এ সময়ে গর্ভবতী ইচ্ছে করলে রোজা রাখতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে শীতকাল বেশি অনুকূল। বর্তমান উচ্চ মাত্রার গরমে গর্ভবতীর রোজা রাখা বিবেচ্য।
শেষ তিন মাস : সতর্কতার পিরিয়ড শেষ তিন মাস। গর্ভবতী মাকে সতর্ক হয়ে চলতে হয় এ তিন মাসে। এ সময় বাচ্চা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই দুজনের পুষ্টি নিশ্চিত করতে মাকে খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। এ অংশে গর্ভবতী রোজা না রাখাই উচিৎ।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের আলোকে গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুন ক্যালরির প্রয়োজন। তাই একজন গর্ভবতী মাকে দিনে ছয়বার বা তারও বেশি খেতে বলা হয়। এখন গরমকাল। সাধারণত শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে রোজা রাখলে দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। এই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য কষ্টকর ব্যাপার। তা ছাড়া গরমে গর্ভবতী মা প্রচুর ঘেমে (উবযুফৎধঃরড়হ) বা পানিশূন্যতায় ভুগতে পারেন। তাছাড়া  রোজা রাখার ফলে অনাগত শিশুটি অপুষ্টি ও কম ওজন নিয়ে জন্মাতে পারে। আবার মা মূত্রনালির ইনফেকশনসহ নানা উপসর্গে ভুগতে পারেন।
এখন দেখুন ইসলাম গর্ভবতীর রোজার বিষয়ে কি বলে: সূরা বাকারার ১৮৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ্পাক বলেন,“(রমজানের) রোজা নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনের জন্যে। কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময়ে সমসংখ্যক দিন রোজা রাখবে। আর রোজা রাখা যার জন্যে খুব কষ্টকর, তাদের সামর্থ থাকলে ফিদিয়া (বিনিময়) অর্থাৎ একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদান করবে।....” এখানে অসুস্থদের বিষয়ে বলা হয়েছে যে তারা রোজা ছাড়তে পারবে। আর অসুস্থদের রোজার বিধানের মধ্যেই গর্ভবতীরা থাকছেন। বলা হয়েছে অসুস্থ হলে, সফরে থাকলে কষ্ট হলে রোজা ছেড়ে তার পর নিকটবর্তী সময়ে তা কাযা আদায় করবে যে কয়টি রোজা ছাড়া হয়েছে। আর গর্ভবতীরাও স্বাস্থ্য বিষয়ক কারণে রোজা ভাঙ্গলে সুস্থ হয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক রোজা কাযা হিসেবে আদায় করবে।
যেসব কারণে রমজানে রোজা ছাড়া যাবে: ০১) মুসাফির অবস্থায়; ০২) রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলে; ০৩) গর্ভের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে; ০৪) ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কারণে মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দিলে; ০৫) শক্তিহীন বৃদ্ধ হলে (ফিদিয়া আদায় সাপেক্ষে); ০৬) কোনো রোজাদারকে সাপে দংশন করলে; ০৭) নারীদের হায়েজ নিফাস চলা কালে।
গর্ভবতীর সাহরি : গর্ভবতী সাহরিতে স্বাভাবিক খাবার খাবেন। বিশেষ করে গরমে পানিশূন্যতা ও শরীরে লবণের পরিমাণ কমে যাবার সম্ভাবনা বেশি। সে দিকে খেয়াল রেখে খাবার গ্রহণ করতে হবে।  তবে ক্যালরি ও আঁশযুক্ত খাবারের দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। তা ছাড়া সাহরির সময় যেসব খাবারে গ্যাস হয় বা বুক জ্বালা করে, ওই খাবারগুলো এড়িয়ে যেতে হবে। খাবারে যোগ করুন আপেল, টমেটো, গাজর, খেজুর ইত্যাদি।
গর্ভবতীর ইফতার: কয়েকটি খেজুর, এক-দু গ্লাস পানিই হতে পারে আপনার জন্যে একটি আদর্শ ইফতার। মাগরীবের আগে এ ছাড়া আর কোনো খাবার না খেলে এ সময়টুকুর ভেতরে পানি ও খেজুর পাকস্থলীতে একত্রিত হয়ে একটি এনজাইম (ঊহুরস) হযমে সহায়ক পদার্থ তৈরি করে। যা এক দিকে হযমশক্তি বৃদ্ধি করে অন্য দিকে গ্যাস্টিক নিরাময় করে। মাগরীবের পর অন্য খাবার যেমন ভাত, চিড়া, সব্জির স্যুপ, সালাদ, ফলফলাদি খেতে পারেন।  তাছাড়া ফলের জুস, ডাবের পানিও রাখতে  পারেন।
সতর্কতা ও পরামর্শ: ০১) গর্ভাবস্থায় ভারি, গুরুপাক, ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত ও বাসি খাবার সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন। ০২)  ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করুন। ০৩)  সাহরি না খেয়ে রোজা রাখার চেষ্টা করবেন না। এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে। ০৪)  আঁশযুক্ত খাবার, প্রোটিন ও ফ্যাটসম্পন্ন খাবার গ্রহণ করুন। এসব উপাদান ধীরগতিতে পরিপাক হয় বলে ক্ষুধা কম লাগবে। ০৫) খেতে পারেন পরিমিত চিনিযুক্ত ও জাউভাত জাতীয় খাবার। ০৬) রোজার সময় বেশি বিশ্রাম নিন। দুশ্চিন্তা এড়িয়ে চলুন। ০৭) বেশি সময় রোদে বা গরমে অবস্থান করবেন না। বেশির ভাগ সময় বাতাস বা খোলামেলা পরিবেশে থাকার চেষ্টা করুন। ০৮)  রাতে খাবারের পর বিশ্রাম নিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ