শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পানির অভাবে রান্না ওযু ও গোসল বন্ধের উপক্রম

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ‘আপনারা যারা নামাজ পড়তে আসবেন তারা অবশ্যই বাসা থেকে ওজু করে আসবেন’। প্রায় প্রতি ওয়াক্ত নামাজের আগে ও পরে এভাবেই মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানান মোহাম্মদপুরস্থ শেকের টেক তিন নাম্বার রোডের শেষ মাথায় অবস্থিত প্রমিন্যান্ট হাউজিং মসজিদ কর্তৃপক্ষ। তীব্র পানি সংকটের কারণে হাউজিংয়ের অনেকেই ওজু পর্যন্ত করতে পারছেন না। অবস্থা এমন যে, পানি সংকট সমাধানে প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে এক হাজার টাকা চাঁদা ধার্য করেছে প্রমিন্যান্ট হাউজিং ফ্ল্যাট মালিক কল্যাণ সমিতি। তারা ফ্ল্যাটবাসীকে দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ‘প্রমিন্যান্ট হাউজিং মালিক সমিতি ওয়াসার পানি সমস্যা ভোগ করছে। তাই হাউজিংয়ে পানির স্থায়ী সমাধানকল্পে ওয়াসার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেকটা অগ্রসর হয়েছি। পানির স্থায়ী সমাধান আমাদের একান্ত প্রয়োজন। এ কাজে আমাদের বেশ কিছু টাকার প্রয়োজন। অতএব আপাতত ফ্ল্যাট প্রতি এক হাজার টাকা প্রদানের জন্য ফ্ল্যাটবাসীকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হলো’। জানা গেছে, এই হাউজিংয়ে তিন শতাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এই টাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে (ঘুষ) দিয়ে পানির লাইন সংষ্কার এবং আভ্যন্তরীণ লাইনের মেরামত করা হবে।
জানা গেছে, পানির সংকট রাজধানীর অনেক এলাকাতেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেকের টেক, জুরাইন মাদ্রাসা রোড, পূর্ব দোলাইরপাড়, দনিয়াবাজার এলাকার মানুষ ভোর রাতে সেহরি শেষে পানি পান না করেই রোজা রাখছেন। শুধু তাই নয়, সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে অন্যসব এলাকার মানুষ যখন ঘুমাতে যান ঠিক তখন এসব এলাকার মানুষ বাড়ি থেকে বের হন মগ-বালতি নিয়ে। ওয়াসার পাম্পের রিজার্ভ ট্যাংক থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তারা পানি সংগ্রহ করেন। সেই পানি দিয়েই চলে সারাদিনের খাওয়া, গোসল, ওযুসহ সকল দৈনন্দিন কাজ।
সূত্র মতে, ঢাকায় গ্রীষ্ম মওসুম শুরুর আগেই পানির জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের এই শহরে বিশুদ্ধ পানি পাওয়াটা দুষ্কর হয়ে পড়ছে। রাজধানীতে পানির সংকট নতুন কোনো বিষয় না হলেও গরমের শুরুতেই এমন সংকট ভাবিয়ে তুলেছে নাগরিকদের। বিশেষ করে পবিত্র মাহে রমযানে তীব্র পানির সংকটে দিশেহারা ধর্মপ্রাণ মানুষ। অথচ ওয়াসা বলছে, পানি উৎপাদনে ঘাটতি নেই।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা প্রতিদিন ২৪৫ থেকে ২৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করতে সক্ষম। আর বর্তমানে ২৪০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে রাজধানীতে। সেই অনুযায়ী রাজধানীতে পানি সংকট থাকার কথা না। বরং কিছু পানি অতিরিক্ত থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর অনেক স্থানেই পানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ওয়াসা নিয়ে গণশুনানিতেও পানি সংকটের কারণে গ্রাহকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর পূর্ব রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় পানি মিলছে না। মগবাজার এলাকায়র কিছু অংশে দিনে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য পানি আসে। পরবর্তীতে সারা দিনই দেখা মেলে না পানির। একই অবস্থা রাজধানীর জোয়ার সাহারা, কালাচাঁদপুর, নতুন বাজার, বাউনিয়া বাঁধ, উত্তর ইব্রাহিমপুর, মিরপুর-১০, পীরেরবাগ, বড়বাগ, কাজীপাড়া, আগারগাঁও, আরামবাগ, মানিকনগর, কালাপানি, কালশী, পশ্চিম মনিপুর, মুরাদপুর, কেদার নাথ দে লেন, বাড্ডাসহ অনেক এলাকার। মাসের পর মাস দিনে একবার পানি দেওয়া হয় এসব এলাকায়।
বড়বাগ এলাকার পপুলার হাউজিংয়ের বাসিন্দা মারুফ বিল্লাহ বলেন, গত দেড় মাস ধরে এই সমস্যা চলছে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। পূর্ব রামপুরা এলাকার বাসিন্দা ইয়াকুব জানান, এক সপ্তাহ যাবৎ পানি নেই পূর্ব রামপুরা এলাকায়। একবার পানি দিলেও সেই পানি দিয়ে কোনো কিছুই ভালো ভাবে করা যায় না। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের রিপোর্টার ফারজানা আক্তার ফেসবুকে লিখেছেন, গরম আসতে না আসতেই ঢাকায় শুরু হয়েছে ওয়াসার পানি সংকট। মগবাজার এলাকায় দিনে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য পানি দেওয়া হচ্ছে।
 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির অভাবে রান্না, গোসল, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে একদিকে প্রচণ্ড গরমে নাগরিক জীবনে হাঁসফাঁস, অন্যদিকে রোজা। তার ওপর নেই পানি। ফলে চরম ভোগান্তিতে আছেন রাজধানীবাসী। নিরাপদ পানির দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন তারা। জুরাইন, কদমতলী ও শনির আখড়া, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার পানি সংকটের ভুক্তভোগী নাগরিকরা পদযাত্রা করেছে। নগরজুড়ে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চললেও সেবা সংস্থা ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বীকার করছে না বরং তারা দাবি করছে, ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় এবং বিশুদ্ধ। পানি ফুটিয়ে খেতে হয় না। ওয়াসার এমন বক্তব্যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
পূর্ব রামপুরা হাইস্কুল এলাকার চিত্র একটু ভিন্ন। সেখানে বাসিন্দারা ওয়াসার পানি পায় ঠিকই। কিন্তু তা ব্যবহার অযোগ্য। ওয়াসার লাইনে হলুদ রঙের পানি আসে। পানিতে দুর্গন্ধ। মুখে নেওয়া যায় না। এমনকি ফুটিয়েও পান করা যায় না। ওই এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম জানান, তারা গত দুই বছর ধরেই ওয়াসার লাইনের পানি ফুটিয়েও পান করতে পারছেন না। ফলে পানির জার কিনে ফুটিয়ে তা পান করছেন। ওই এলাকার অনেক মানুষই বাড়তি টাকা খরচ করে জারের পানি কিনে ফুটিয়ে পান করছেন। তিনি জানান, লাইনের পানি সংগ্রহ করে তা বালতিতে রাখার ছয় সাত ঘণ্টা পর পানিভর্তি বালতির তলায় ওই ময়লা পরিষ্কার বুঝা যায়। ফুটানোর পরও পানিতে গন্ধ থাকে।
অন্যদিকে সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অবধি নানা কায়দা কৌশলে পানির জন্য নিরন্তর চেষ্টা চলছে উত্তর কাফরুল এলাকায়। ২৪ ঘণ্টায় মধ্যরাতে একবার দেখা মেলে পানির। কখনো কখনো ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিতে এত বেশি ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে যে, তা পান করা তো দূরের কথা, ধোয়ামোছার কাজেও ব্যবহার করা যায় না। তারপরও মানুষ বাধ্য হয়ে এ ময়লা পানিই ব্যবহার করেন। এসব পানি ব্যবহার করে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, জন্ডিস, জ্বর, সর্দি, কাশিসহ নানা পানিবাহিত রোগে ভুগছে মানুষ। আইসিডিডিআরবিসহ বিভিন্ন হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।
পানির সংকটকে কাজে লাগিয়ে ওয়াসার এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী রমরমা ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ আছে। যেসব এলাকায় ওয়াসার লাইন অকেজো হয়ে পড়ে বা সংস্কারের কাজ চলে সেসব জায়গায় ওয়াসার গাড়িতে পানি দেওয়ার কথা। তবে এক্ষেত্রে এক গাড়ি পানির দাম ৫০০ টাকা হলেও এর জন্য কোনো কোনো সময় নাগরিকদের গুণতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১২ শ টাকা পর্যন্ত। অতিরিক্ত টাকা যাচ্ছে ওয়াসার কর্মচারীদের পকেটে। এছাড়া পানির লাইন মেরামত বা নতুন লাইন বসানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। অনেক এলাকাতে টাকা দিয়েও পানি পাওয়া যাচ্ছেনা।
এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা ওয়াসাকে দুই ভাগে ভাগ করবার প্রস্তাবও এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াসাকে দুই ভাগ করলেই সেবার মান বাড়ানো যাবে না। সেবার মান বাড়াতে হলে দক্ষ জনবল, কার্যকরী পরিকল্পনা দরকার। নগরপরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ওয়াসার ৮৫ থেকে ৮৭ ভাগ নির্ভরশীলতা ভূগর্ভস্থ পানির উপর। শুষ্ক মওসুমে ভূগর্ভস্থ পানি নিচের দিকে যাচ্ছে। ভূউপরিস্থ পানির উত্সগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। পুকুর, নদী ও নিচু জমিগুলো ভরাট হয়ে গেছে। টেকসইভাবে পানি সরবরাহ করতে হলে, ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ঢাকার ভিতরে ভূউপরিস্থ উৎসগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে।
পানি সংকটের বিষয়ে ওয়াসার এমডি তাকসিন এ খান বলেন, আমরা পানির লাইনের সমস্ত নেটওয়ার্ক পরিবর্তন করছি। যেখান থেকে অভিযোগ আসে সেখানে আমরা শর্ট টাইমে পাইপ পরিবর্তন করে দিচ্ছি। তবে পুরো নেটওয়ার্ক পরিবর্তন করলে তখন আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বিভিন্ন এলাকায় পানি সংকটের বিষয়ে তিনি জানান, এসব সমস্যা সাময়িক। খুব শীঘ্রই এসবের সমাধান হবে।
এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে পুরান ঢাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, তাদের এলাকায় ওয়াসার পানিতে ময়লা আর দুর্গন্ধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছে তারা। এই পানি খাওয়া তো দূরের কথা, অনেক সময় গোসল বা অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করা যায় না। তাই পানি আনতে যেতে হয় বাসা থেকে অনেক দূরে। নয়তো পানি কিনে এই সমস্যার সাময়িক সমাধান করতে হয়। ওয়াসার খামখেয়ালিতেই ময়লা পানির সমস্যা সমাধান হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছে এলাকাবাসী। আর ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, এলাকার কিছু মানুষ অবৈধভাবে পানি নেওয়ার জন্য রাস্তা কাটতে গিয়ে পানির লাইন ছিদ্র করে ফেলেছে বলেই এমনটা হচ্ছে।
রাজধানীর ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওয়াসা ঠিকমতো নজর দিচ্ছে না বলেই ময়লা পানি আসছে। এটি হয়তো এক দিন-দুই দিন হতে পারে। কিন্তু মাসের পর মাস কী করে পানির এই অবস্থা হয়। তারা কোনো খবর নিতেও আসে না। আর মাঝে মাঝে তো পানি থাকেই না। কাউন্সিলরকে জানালেও কোনো কাজ হয় না। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রঘুনাথ দাস লেনের গলির ভেতরে পানি নিতে আশা নারী-পুরুষের ভিড়। ৭/৫ রঘুনাথ দাস লেনের বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ওয়াসার পানি প্রায়শ থাকে না। আর যখন থাকে তখনো ব্যবহার করা যায় না। কারণ পানিতে ব্যাপক দুর্গন্ধ থাকে। অনেক সময় ময়লাও পাওয়া যায়। এমন অবস্থায় পান করা তো দূরের কথা, অনেক সময় অন্য কাজেও ব্যবহার করা যায় না। জানা যায়, এখানে পানি নিতে আসে কলতাবাজার, নাসির উদ্দিন সরদার লেন, কারকুনবাড়ীসহ আশপাশের এলাকার স্থানীয় মানুষ। এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ির ওয়াসার পানিতে ময়লা আর দুর্গন্ধের কারণে সবাই পানি নিতে এখানে আসে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রিতম। কয়েকজন বন্ধু মিলে থাকেন পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকার লবণের গোডাউন গলির পেছনে এক বাসায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনব্যবস্থা না থাকায় এখানেই কাটিয়েছেন পাঁচ বছর। ছয় মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি এনে খেতে হচ্ছে তাদের। প্রিতম বলেন, বাসার পানিতে এত বেশি সমস্যা যে খেতেই পারি না। তাই কয়েক মাস ধরে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পানি নিয়ে আসি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি সেলিম বলেন, কিছু জায়গার পানি সংকট রয়েছে এটি সত্য। একইসাথে পানিতে দুর্গন্ধও রয়েছে। শুনেছি ওয়াসা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
পানি সমস্যার বিষয়ে কথা বললে ওয়াসা ঢাকা দক্ষিণ জোন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আল-আমীন বলেন, পুরান ঢাকার পানির লাইনের পাইপগুলো পুরনো হওয়াতে বিভিন্ন জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। যার কারণে ওয়াসার পানির চাপ যখন কম থাকে তখন ড্রেনের ময়লা পানি ঢুকে যায়। এ ছাড়া এলাকার কিছু মানুষ না জানিয়ে রাস্তা কাটতে গিয়ে পাইপ নষ্ট করে ফেলে। আবার কেউ কেউ অবৈধভাবে পানি সরবরাহ করতে গিয়ে পাইপ নষ্ট করে দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ