শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আসন্ন বাজেটেও জনগণের ওপর করের বোঝা কমছে না

এইচ এম আকতার : ব্যাংক ও ভ্যাট আইনের ব্যাপক সংস্কারের মধ্য দিয়েই নতুন বাজেট আসছে। অর্থবছরের শুরুতেই নতুন ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন (২০১২)’ কার্যকরের ঘোষণা থাকছে। সংস্কারের আওতায় থাকবে ব্যাংকসহ পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসুচি খাতও। তবে পরোক্ষ কর কমছে না। অর্থাৎ জনগণের করের বোঝা কোনভাবেই কমছে না।
ইতিমধ্যে বাজেটের সব ধরনের কার্যক্রম শেষ। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খসড়া বাজেট তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ দিকনির্দেশনা নিয়েই এটি চূড়ান্ত করা হবে। আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর চলতি মেয়াদের প্রথম বাজেটে প্রাথমিকভাবে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা।
এবারের বাজেটে বড় আকারের ব্যয় মেটাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৩ দশমিক ১ শতাংশের সমান। চলতি বছর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি ধরা হয়েছে।
এছাড়া প্রতি বছরের মতো এবারও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশের মধ্যেই বাজেটের ঘাটতি রাখা হয়েছে। নতুন বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। চলতি বাজেটের ঘাটতি হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আসন্ন বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এসব প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে বাজেটে বরাদ্দ বেশি রাখা হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ও ভ্যাট খাতে সংস্কার করা হবে। করের হার নতুন করে বাড়ানো হবে না। তবে পহেলা জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরে ঘোষণা থাকবে।
আসন্ন বাজেটে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জন হবে এমন প্রত্যাশা থেকেই আগামী অর্থবছরের এ লক্ষ্য স্থির করা হয়। সার্বিকভাবে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি রফতানি ও রাজস্ব আয়ের গতিশীলতার কারণে এ প্রবৃদ্ধি অর্জন সহায়ক হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। যা প্রবৃদ্ধি অর্জনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।
নতুন বাজেটে ভ্যাট খাতে বড় সংস্কার হবে। এটা করতে ১ জুলাই থেকে বহুল আলোচিত ভ্যাট আইন কার্যকর করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে এটি কার্যকর হলে আগামী বছরে রাজস্ব আয়ে গতি আসবে। তবে নতুন আইনে কোনো পণ্যের ওপর ভ্যাট ও কর হার বাড়বে না। বরং কমতে পারে। আইনটি বাস্তবায়নে কাউকে হয়রানি ও কষ্ট দেয়া হবে না এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই।
এবার ব্যাংক খাতেও বেশ কিছু সংস্কারের ঘোষণা থাকবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ে গঠন করা হবে এসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। সংশোধন করা হবে বেশ কিছু আইন। সুদের হার কমানো হবে। এসব ঘোষণা থাকবে বাজেটে।
আসন্ন বাজেটে ব্যক্তি আয়কর সীমা কমানো হবে না। তবে কর্পোরেট কর হার কিছুটা কমানো হবে। নতুন করে কোনো পণ্য বা সেবার ওপর কর চাপানো হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্তির ঘোষণা থাকবে। এটি একসঙ্গে ঘোষণা না দিয়ে পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তি করা হবে। এজন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ২ লাখ ৭ হাজার ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রার পরিমাণ ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। আর প্রকল্প সাহায্য হচ্ছে ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১০টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় প্রথম স্থানে রয়েছে। যার বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এরপরই বিদ্যুৎ বিভাগে ২৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে আছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বরাদ্দের পরিমাণ ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমান বাড়ছেই। একই সাথে রিজার্ভ থেকে টাকা ব্যয় করছে সরকার। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। গত ৮ই মে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের পর এবারই প্রথম ৩১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামলো রিজার্ভের পরিমাণ। আমদানির বিপুল ব্যয় পরিশোধ করতে দুই বছর ধরেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি ডলার বিক্রি করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে সাধারণত গ্রস ও নিট, এ দুই ধরনের পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়। এর মধ্যে সম্পদ থেকে দায় বাদ দিয়ে নিট রিজার্ভ হিসাব করা হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময়ই গ্রস রিজার্ভের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো রিজার্ভের নিট হিসাবকে প্রকৃত রিজার্ভ হিসেবে গণ্য করে। আইএমএফের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ বিলিয়ন ডলার। এ পরিমাণ নিট রিজার্ভ দিয়ে দেশের ৫ মাসের কম সময়ের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করা যাবে। আইএমএফের পর্যবেক্ষণেও আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে দেশে রিজার্ভের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এরপর রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন পর্যন্ত উঠেছিল। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকেই রিজার্ভের অর্থে টান পড়তে থাকে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় দেশের চলতি হিসাবের ব্যালান্স নেমে আসে নেতিবাচক পর্যায়ে। অস্বাভাবিক আমদানি ব্যয় পরিশোধ করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-মে) রিজার্ভ থেকে ২১৫ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও রেকর্ড ২৩১ কোটি ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল।
২০১৮ সালের ৮ই মে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ৩০শে এপ্রিলও রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ১২ বিলিয়ন। এরপর গত সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মার্চ-এপ্রিল মেয়াদের ১২৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে রিজার্ভের পরিমাণ নেমে আসে ৩০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ- এ ৯টি দেশ বর্তমানে আকুর সদস্য। আকুর অন্যান্য সদস্য দেশ থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির বিল দুই মাস পরপর সংস্থাটির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।
এদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে এক হাজার ৩৩০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগের অর্থবছরে এ সময়ে এসেছিল এক হাজার ২০৯ কোটি ডলার। একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১২১ কোটি ডলার। শতকরা হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক০১ শতাংশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ