বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খাদ্যে ভেজাল : বাড়ছে জটিল রোগব্যাধি

খাদ্যে ভেজাল ইংরেজী হলো Adulteration/ impurity in food. যা খেয়ে প্রাণীকূল বেঁচে থাকে, দেহের ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধি সাধন ও শক্তি আহরণ করে তাকে খাদ্য/food বলে। প্রাণীর শ্রেণী বিন্যাসের উপর খাদ্যেরও শ্রেণী বিন্যাস করা হয়ে থাকে। সাধারণত ভেজাল বলতে বুঝায় খাদ্যে নিম্নমানের ক্ষতিকর অকেজো ও অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মেশানো। প্রকৃতিগত ও গুনগত নির্ধারিত মানসম্মত না হলে যে কোন খাদ্য দ্রব্যই ভেজাল যুক্ত বিবেচিত হতে পারে। খাদ্যে ভেজাল এ সংবাদটি নতুন নয়, প্রায় প্রতিদিনই এ নিয়ে জাতীয় দৈনিক গুলোতে ছাপা হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ। মাছ, মাংস, চিনি, লবণ, চাল, আটা দুধ, ঘি, মিষ্টি, ঔষধ ইত্যাদিতে ভেজাল সর্বত্রই। এমনকি মিনারেল ওয়াটার নামে বোতল বন্দি ‘বিশুদ্ধ’ পানিতেও ভেজাল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব নকল ও ভেজাল খাদ্য সামগ্রিই বিশুদ্ধ বা খাঁটি লেবেল লাগিয়ে অনায়াসে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এরূপ খাঁটি ঘি, খাঁিট মধু, খাঁিট দুধ, খাঁিট তেলের প্রচার ও সরবরাহের অভাব নেই। আসলে এসব খাঁিট লেবেলের আড়ালে আসল জিনিসটাই বোধহয় হারিয়ে গেছে। নকল ভেজালের দৌরাত্ম্যে খাঁটি কথাটাই কথার কথায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যবসায় দুর্নীতি অনুপ্রবেশ করে ইংরেজ শাসন আমলে। মানুষের লোভী মনোবৃত্তিই ভেজালের প্রধান কারণ। একদিকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কলহ, অপর দিকে অর্থনৈতিক দুর্দশা, ফলে সমাজের সর্বত্রই আজ নানা ভেজালে ছেঁয়ে গেছে। আমরা প্রতিদিন অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করি, সমাজে, সমাজ বিরোধীদের যে সম্মান, যে প্রতিপত্তি, সেখানে একজন জ্ঞানী, সৎ মানুষের মূল্য তুচ্ছ, সততা সেখানে লাঞ্ছিত, অসহায়। বিবেক সেখানে বিবর্জিত। আজ মানুষ আর সৎ পথের কথা বা সততার কথা চিন্তাও করে না। যে কোনো উপায়ে হোক তার চাই টাকা আর গদি। সে টাকা কালো পথে আসুক কিংবা সাদা পথে আসুক কিংবা কারো রক্ত ঝরিয়ে লাল পথে আসুক এবং গদি রাতের আঁধারে ভোট চুরি করে আসুক কিংবা বিনা ভোটে আসুক তা ভাববার কারো অবকাশ নেই। টাকা আর গদি হলেই হলো। এর পরিণতিতে আজ সমাজের উচ্চস্তর থেকে শুরু করে নি¤œস্তর পর্যন্ত ভেজালের ছোঁয়া লেগেছে। খাদ্যে বিষক্রিয়া পরিত্রাণের উপায় বইটি হারুন- আর-রশিদ এর সম্পাদনায় পার্ল পাবলিকেশন্স ৩৮/২ বাংলা বাজার ঢাকা-১১০০ থেকে হাসান জায়েদী কর্তৃক প্রকাশিত, যার প্রকাশকাল একুশে বই বেলা ২০১৫।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় মন্তব্য, বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট লেখকদের মতামত, উচ্চ আদালতের রায় ইত্যাদি নিয়ে ১৫৯টি শিরোনামে ৪১৬ পৃষ্ঠার বইটিতে খাদ্যে ভেজাল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও সম্ভাব্য সমাধান উল্লেখ করা আছে। বইটির সূচীর ১২ নং ক্রমিকে ৬১ নং পৃষ্ঠায় মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিল্ক ভিটা কর্তৃক লিখিত  প্রথম আলো পত্রিকার ১০-০৪-২০১৪ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত শিরোনাম ‘দুধে ভেজাল রোধের প্রযুক্তি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, এ প্রযুক্তির পূর্ণ সফলতা আসবে এর প্রয়োগকারীর দক্ষতা ও সততার উপর। সুতরাং বিশুদ্ধ দুধের জন্য প্রয়োজন বিশুদ্ধ মানুষ। ‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।’ ২০-০২-২০১৯ খ্রিঃ তারিখ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের ৩ নং পৃষ্ঠায় ইত্তেফাক রির্পোটে বলা হয়েছে,’ দেশে বাড়ছে শিশু ক্যান্সার রোগী, দায়ী ভেজাল খাদ্য ও বায়ুদূষণ, জনসচেতনতার উপর গুরুত্ব আরোপ।’ ০৯-০৫-২০১৯ খ্রিঃ তারিখে প্রকাশিত আমাদের সময় পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় লাল কালি দিয়ে হেড লাইন করা হয়েছে, ‘দুধ-দইয়ে ভয়ঙ্কর রাসায়নিক’ উহাতে বিশেষজ্ঞ ও হাইকোর্টের নির্দেশ রয়েছে। দই ও পশু খাদ্যেও ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন হাইকোর্টে। হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, ‘কারা ভেজাল মেশায় তাদের নাম ঠিকানা দিন।’ শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেছেন, ‘সিসাযুক্ত দুধ শিশু স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। রাসায়নিক যুক্ত দুধ খেয়ে শিশুরা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। আর সিসা যুক্ত দুধ বেশিদিন খেলে কিডনি ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়ার ভয় আছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেছেন, ‘দুধে ল্যাক্টিক অ্যাসিড থাকে, যা ক্ষতিকর নয়। তবে অ্যান্টিবায়োটিক অনুজীব গর্ভবতী মায়েদের জন্য ক্ষতিকর। পরীক্ষায় দুধে যে সব সমস্যা ধরা পড়েছে তা বড়দের জন্য বড় ক্ষতি কারক না হলেও গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য ক্ষতিকর।’ দামি খাবার হলেই যে সেটা ভালো এবং স্বাস্থ্য সম্মত কথাটা ঠিক নয়। Rich food বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য অধিক ক্ষতিকর। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন।’
টমাস টুসার বলেছেন, ‘ছোট্ট শিশু এবং মুরগির ছানারা সব সময় খেতে ভালোবাসে।’ ইমাম গাজ্জালি (রঃ) বলেছেন, ‘যদি প্রয়োজনের অধিক খাদ্য গ্রহণ করবে, তবে তো তোমাকে আলস্যে ডুবিয়ে দিবে এবং জ্ঞান চর্চায় অমনোযোগী করে তুলবে।’
-আবু মুনীর

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ