মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ইসলামে সমরনীতি ও গুপ্তহত্যা প্রসঙ্গ

মুহাম্মদ আবদুল করিম : ১৭  রমযান। দিনটি ইসলামের ইতিহাস ও মুসলমানদের নিকট চিরস্মরণীয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনা হিযরতের পরের বছর অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে সংঘটিত এ যুদ্ধের রয়েছে বিশ্বমানবতার জন্য মহান আদর্শ। মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যকার সংঘটিত এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য সংখ্যার স্বল্পতা ও যুদ্ধ সরঞ্জামের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও অনাকক্সিক্ষত বিজয়ের পেছনে রয়েছে মহানবীর (সা.) অসাধারণ সামরিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আর ইসলাম শান্তি-শৃঙ্খলা, মনবতা ও আনুগত্যসর্বস্ব জীবনবীধান। উৎকণ্ঠা আর বিশৃঙ্খলা ইসলামের গোড়াপত্তনের পর থেকে আজ অবধি এতে বৈধতা পায়নি। জোরপূর্বক অপরের প্রতি চড়াও হওয়া, ধন-সম্পদের ক্ষতি সাধন করা এবং প্রাণনাশ কিংবা জনমনে ভীতি সঞ্চার করার বিধান আদৌ অনুমোদন দেয়নি ইসলাম। প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় হাজারো শক্তি, সাহস-সামর্থ্য সঞ্চিত থাকা সত্ত্বেও ন্যায়সঙ্গত পন্থায় সম্মুখ প্রতিহত ব্যতীত তার অজান্তে গুপ্তভাবে হামলা করা কিংবা প্রতিশোধ গ্রহণ করা চিরতরে নিষিদ্ধ মানবতাবান্ধব এই জীবনবীধানে। আর এর রয়েছে ইসলামের প্রামাণিক সোনালি ইতিহাস।
ইসলামের শৈশবকাল থেকেই প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গী-সাথীদের এর করণীয়-বর্জনীয়াদির চর্চায় একটি অনুপম শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদায় সমাসীন করেন। মহানবীর (সা.) অতুলনীয় জীবন চরিতে উজ্জীবিত সাহাবীগণও পরিচয় দিয়েছেন ইসলামের অন্যতম অনুসারী হিসেবে। ইবাদত-বন্দেগী, সামাজিক জীবন পরিচালনা, রাষ্ট্রীয় ও সামরিক জীবনব্যবস্থা কেমন হবে সবকিছুর সর্বাধুনিক ও মার্জিত রূপরেখা সাহাবীগণ পেয়ে যেতেন মহানবীর (সা.) জীবনাদর্শ থেকে। যার প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইসলামের ইতিহাসে ঘটা ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ উল্লেখ্যযোগ্য। হিজরি সনের ২য় বর্ষের ১৭ রমযান সংঘটিত এই যুদ্ধ মুসলমানদেরকে একটি সুশৃঙ্খলাবদ্ধ নমনীয় শান্তিকামীর পাশাপাশি বিশ্ববিজয়ে দুরন্ত-সাহসী হিসেবে বেড়ে উঠার প্রেরণা জুগিয়েছে।
৬২৩ খ্রিষ্টাব্দ। হিজরীর ২য় বর্ষের সমাপনী পর্ব পার করছে মদিনার শান্তিপ্রিয় আনসার-মুহাজিরগণ। ইসলামের জয়জয়কার পরিস্থিতি বিরাজমান। ইতোমধ্যে মদিনা সনদের মধ্যদিয়ে মহানবী (সা.) বৃহত্তর একটি আনুগত্যশীল জাতিসত্তার ভিত্তি দিয়ে মদিনাকে ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের প্রয়াস পান। তাঁর দূরদর্শিতা দিয়ে একসময়কার ইয়াসরিবের আউস-খাযরাজ গোত্রের মধ্যকার চলমান গোত্রীয় দ্বন্দ্ব নিরসন করে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি ও স্থায়ীভাবে হানাহানি-মারামারি বন্ধ করায় তাঁর প্রভূত্ব মেনে দিতে স্বতঃস্ফূর্ত বাধ্য হলেন তারা। আর মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মহানবীর (সা.) শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল ওহি-প্রত্যাদেশের মর্মবাণী।
শান্তকর এরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে মুসলমানদেরকে মদিনার ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত বদর নামক উপত্যকায় গিয়ে যুদ্ধে উপনীত হওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে এই প্রথম। তবে মুসলিম সৈন্যদল ও মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশদের মাঝে এ যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ নিহিত রয়েছে। যেমন-এক. মদিনার শাসন-শৃঙ্খলা, শক্তি প্রতিষ্ঠা এবং মহানবীর (সা.)কৃতিত্ব ও সফলতার সংবাদে কুরাইশদের মনে হিংসা ও শত্রুতার উদ্রেক, মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবাগণকে আশ্রয় দেয়ায় মদিনাবাসীদের উপর ক্রোধান্বিত হওয়া আর ইসলাম ও মুসলমানদেরকে জগতের বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার কুরাইশদের দৃঢ় সংকল্পবদ্ধতা। দুই. মদিনায় মহানবী (সা.) যুগের পূর্বের শাসক ছিল আবদুল্লাহ বিন উবাই। মহানবীর (সা.) সফলতার জন্য মদিনায় তার শাসন ক্ষমতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে গোপনে মক্কার কুরাইশদেরকে মহানবীর (সা.) বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে থাকে। মহানবী (সা.) ও ইসলামকে সমূলে বিনাশ করার মানসে মোনাফিকদের সমন্বয়ে মদিনায় একটি দল গঠন এবং কুরাইশদের সাথে সখ্যতার মধ্যদিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রকরণ। তিন. মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইহুদীদের মুসলিম বিদ্বেষ ও তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। চার. মদিনা ছিল সিরিয়া, মিশর এবং অন্যান্য দেশের সাথে মক্কার বণিকদের অন্যতম বাণিজ্যিক পথ। মদিনায় মহানবীর (সা.) হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হলে কুরাইশদের বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকায় তাদের রণ প্রস্তুতি গ্রহণ। পাঁচ. মদিনার সীমান্তবর্তী এলাকায় মক্কার কুরাইশদের অত্যচার ও লুটতরাজ- এভাবে নাখলার খ- যুদ্ধ এবং ঐশী নির্দেশনাসহ বেশ কটি কারণ ঐতিহাসিকগণ চিহ্নিত করেছেন। তবে যে কারণটি মদিনা আক্রমণের জন্য মক্কার কুরাইশদেরকে অত্যাধিক উদ্বুদ্ধ করেছে তা হলো- কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান মদিনার মুসলমান কর্তৃক আক্রান্তিত হওয়ার অপপ্রচার। মূলত এ কুরাইশ দলপতি বাণিজ্যের অজুহাতে অস্ত্রসংগ্রহের জন্যই সিরিয়া গমন করে [পরে তিনি ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবীর মর্যাদায় সমাসীন হন]। সিরিয়া থেকে মক্কা অভিমুখে যাত্রাকালে মদিনা উপকণ্ঠে এসে জানতে পারল যে, মদিনাবাসীরা তার পথরুদ্ধ করবে। সে তখন পথ পরিবর্তন করে অন্য পথে মক্কা গমন করে। আর মক্কায় সংবাদ পৌঁছল যে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশ কাফেলা মক্কায় প্রত্যাবর্তনকালে মদিনা উপকণ্ঠে মুসলমান কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছে। এটি ছিল মূলত মুসলমানদের বিরুদ্ধে ছড়ানো গুজবমাত্র। তবে ঐতিহাসিক মুহাম্মদ আলী কর্তৃক চিহ্নিত কারণটিও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ইসলামের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ধ্বংস সাধন করার কুরাইশদের উদ্বেগই বদর যুদ্ধের অন্যতম কারণ।” 
গুজবের সত্যতা যাচাই না করেই মক্কার কুরাইশ দলপতি আবু জেহেল আবু সুফিয়ানকে সাহায্যের পাশাপাশি মহানবী (সা.) ও মদিনাবাসী মুসলমানদেরকে ধরাধাম থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে এক হাজার পৌত্তলিক সৈন্যসহ মদিনা অভিমুখে রওয়ানা করে। মক্কার বিখ্যাত গোত্রপতি ও কাফির সর্দার উতবা, শায়বা, ওয়ালিদ, খাকনা, উবাইদা, মুনাব্বা, নওফিল প্রমুখ এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহানবী (সা.) কুরাইশ বাহিনীর যাত্রার সংবাদ যথাসময় পেয়ে গেলেন; মক্কাজীবনে তেরো বছরব্যাপী যুদ্ধের বিধান অবতীর্ণ হয়নি ; বরং কুরাইশদের মদিনা আক্রমনে রওয়ানার পরই এ বিধান অবতীর্ণ হয়। অধিকাংশ নও মুসলিম আবার এঁদের অনেকে এমনও আছেন, যাঁরা পারিবারিক সূত্রে সম্ভ্রান্ত হওয়ায় যুদ্ধবিগ্রহে উপনীতি হওয়ার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাহসীকতার দীক্ষার্জন করার সুযোগ পাননি। এমনকি মুসলমানরাও ইতিপূর্বে কাফেরদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে মুখোমুখি হননি। সর্বোপরি ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে মদিনা এখনো শৈশব পার করছে। জনবলের একটি ব্যাপক ঘাটতি রীতিমতই। তবে, মহানবী (সা.) এসব পিছুটান পেছনে রেখে ঐশীবাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মদিনার শিশু ইসলাম রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন- “আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো সাথে বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আল্ বাক্বারা- ১৯০)
মহান আল্লাহর ওহী নির্দেশে মহানবী (সা.) মক্কায় সহায় সম্বল রেখে আসা ৬০ জন মুহাজির এবং তাঁদেরকে মদিনায় সাহায্যকারী ২৫৩ জন আনসার- সাকল্য হিসেবে ৩১৩ (তিনশত তেরো) জনের একটি ছোট্ট কাফেলা নিয়ে হিজরতের ঊনিশতম মাস ৮/১২ রমযানের ফরয রোযা রাখা অবস্থায় বদর উপত্যকায় রওয়ানা হন। ইসলামের ইতিহাসে এটিই “বদর যুদ্ধ” নামে পরিচিত। পৃথিবীর ইতিহাসে আনসার-মুহাজিরের যৌথ অংশগ্রহণে মুসলমান এবং কাফেরের সাথে সংঘটিত প্রথম সম্মুখযুদ্ধ এটি। মক্কার বৃহত্তর কুরাইশ বাহিনীর তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল এক-তৃতীয়াংশ; কিন্তু যুদ্ধ সরঞ্জামের দিক থেকে মুসলমানরা তাদের একশতাংশও ছিলেন না। কুরাইশ কাফেরদের সবাই ছিলো বর্ম পরিহিত এবং প্রত্যেকে বয়সে ছিলো যুবক। পক্ষান্তরে মুসলমানদের সাধারণ অবস্থা ছিলো তাঁরা রোযাদার, ক্ষুধায় কাতর, দুর্বল, অসুস্থ ও ক্ষীণকায়। সকলের কাছে মামুলী হাতিয়ারও পুরোপুরি ছিলো না। কারো কাছে হয়ত তলোয়ার আছে, কিন্তু বল্লম বা ধনুক নেই, কারো কাছে বল্লম আছে, কিন্তু তলোয়ার নেই। অপরদিকে কুরাইশ বাহিনীতে ছিলো ৭০০ উষ্ট্রারোহী, ১০০ অশ্বারোহী এবং ২০০ পদাতিক সৈন্য। আর মুসলমানদের ছিলো মাত্র ৭০টি উট এবং ৩টি ঘোড়া। প্রতিটি উট-ঘোড়ায় ছিলেন তিন-তিনজন চার-চারজন আরোহী। মহানবী (সা.) যে উটটিতে আরোহণ করেছিলেন, তার পিঠে আরো দু’জন সাহাবী আরোহী ! (আসাহহুস সিয়র-৮৪ পৃ.)
যুদ্ধ সরঞ্জাম জনবল কাফেরদের তুলনায় অপ্রতুলতাকে উপেক্ষা করেই মহানবী (সা.) মহান প্রতিপালকের দরবারে ফরিয়াদ করে তাঁর সঙ্গী-সাথীদের শুনিয়েছেন আশার বাণী, জুগিয়েছেন তাঁদের অন্তরে একরাশ সাহস-উদ্দীপনা। দিয়েছেন অভয় ও সান্ত্বনার অমোঘ ঘোষণা। শিখিয়ে দিলেন যুদ্ধনীতি। যুদ্ধে প্রস্তুত করে দিয়েছেন অপ্রস্তুত কোনো শান্তিপ্রিয় নিরীহ জাতিসত্ত্বাকে। আর মহানবীর (সা.) দেয়া প্রেরণায় মুসলমানগণ উদ্বুদ্ধ হয়ে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ঝেঁপে পড়েছেন কাফের বাহিনীর বিরুদ্ধে।
চিরাচরিত নিয়ম-অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হয় দ্বন্দ্বযুদ্ধ বা মল্লযুদ্ধ। সর্বকালের সেরা সমরনায়ক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নির্দেশে মল্লযুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হন হযরত আমীর হামযা (রা.), হযরত আলী (রা.) ও হযরত আবু ওবাইদা (রা.) এবং কাফেরদের পক্ষ থেকে কুরাইশ নেতা উতবা, শায়বা এবং ওয়ালিদ বিন উতবা। ভাগ্যক্রমে প্রাথমিক পর্যায়ের এ যুদ্ধে কুরাইশ নেত্রীবৃন্দ পরাজিত ও নিহত হয়। উপায়ান্তর না দেখে কুরাইশ সেনাপতি আবু জেহেল তার বাহিনীসহ মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের ময়দানে দুপক্ষই বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। একপর্যায়ে কুরাইশরা মুসলমানদের প্রচ-ভাবে আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু প্রতিকূল অবস্থায়ও সংঘবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করা কুরাইশদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনি। যার ফলে কুরাইশদল তাদের ৭০ জন বীরের শবদেহ এবং আরো ৭০ জনকে বন্দী অবস্থায় ফেলে রণে ভঙ্গ দিয়ে মুসলমানদের নাগাল থেকে পালায়ন করে। আর এই যুদ্ধে মক্কার বিখ্যাত কাফের সর্দার আবু জেহেল, উতবা ও শায়বাসহ আরো অনেকেই নিহত হয়। অপরদিকে মাত্র ১৪ জন মুসলিম সৈন্য শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
অল্পসংখ্যক মুসলমানদের মোকাবেলায় কুরাইশের বিশাল বাহিনীর পরাজয় বিস্ময়ের অন্যতম প্রকৃষ্ট নিদর্শন। মহানবীর (সা.) সামরিক অভিজ্ঞতা, দূরদর্শী বিচক্ষণতা, কাফেরদের প্রতি উত্তম ব্যবহারের নির্দেশনা এবং মুসলিম বাহিনীকে সাহস ও হিম্মত দান ছিল এ যুদ্ধে মুসলিম বিজয়ের অন্যতম প্রেরণা শক্তি। সবিশেষ মহান আল্লাহর অদৃশ্য শক্তির বহিঃপ্রকাশও মুসলমানদেরকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। পবিত্র কুরআনের বাণী : “বস্তুত: আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার। হে রাসূল (সা.)! আপনি যখন বলতে লাগলেন মুমিনগণকে- তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের সাহায্যার্থে তোমাদের পালনকর্তা আসমান থেকে অবতীর্ণ তিন হাজার ফেরেশতা পাঠাবেন? অবশ্য তোমরা যদি ধৈর্যধারণ কর এবং বিরত থাক আর তারা যদি তখনই তোমাদের উপর চড়াও হয়, তাহলে তোমাদের পালনকর্তা চিহ্নিত ঘোড়ার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা তোমাদের সাহায্যে পাঠান। বস্তুত এটি তো আল্লাহ তোমাদের সুসংবাদ দান করলেন, যাতে তোমাদের মনে এতে সান্ত্বনা আসতে পারে। আর সাহায্য শুধুমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহরই পক্ষ থেকে। যাতে ধ্বংস করে দেন কোনো কোনো কাফেরকে অথবা  লাঞ্চিত করে দেন- যেন ওরা বঞ্চিত হয়ে ফিরে যায়।”(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১২৩-১২৭)।
বিশাল কুরাইশ বাহিনীর উপর এ বিজয় কুরাইশদের গগণচুম্বী দম্ভ চূর্ণ এবং ইসলাম আত্মরক্ষায় যেমনটি শঙ্কামুক্ত হয়, তেমনি মুসলমানদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করত পরবর্তী বিজয়ের দ্বার উন্মোচন করে। পি. কে হিট্টি মন্তব্য করেছেন-“এই সম্মুখ যুদ্ধে মুসলমানগণ যে নিয়মানুবর্তীতা ও মৃত্যুর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের নজীর স্থাপন করেছিলেন তাতেই ইসলামের পরবর্তী ও মহত্তর বিজয়ের বিশেষ লক্ষণসমূহ পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছে।”
মুসলমানদের বিশ্ববিজয়ের অনুপ্রেরণা লাভের প্রথম সূত্রপাত ঘটে বদরের যুদ্ধে বিস্ময়কর জয়ের মধ্যদিয়ে। মদিনাকে ইসলামি রাষ্ট্রের শক্তিধর প্রাণকেন্দ্র রূপে গড়ে তোলে। মক্কা বিজয় থেকে শুরু করে আরব-অনারব তথা গোটা দুনিয়াব্যাপী ইসলামের বিজয় নিশান উড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। একসময়কার শক্তিশালী দুই পরাশক্তি রাষ্ট্র রোম ও পারস্য বিজয়ের মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে কর্ডোভা, স্পেন, গ্রানাডা, মালাখা ও সেভিলসহ তৎকালীন বিশ্বের ইউরোপ-আফ্রিকার পরাশক্তিগুলো জয় করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের গ-িতে আবদ্ধ করতে বদর যুদ্ধের ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা কাজ করেছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মহানবী (সা.) সর্বপ্রথম নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যে “যুদ্ধের সূচনা তোমরা করবে না।” ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি (সা.) ছায়াযুক্ত একটি স্থানে দাঁঁড়িয়ে যুদ্ধের গতিবিধি প্রত্যক্ষ করছিলেন এবং নিজ বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নিদের্শাদি দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি মুসলমানদেরকে যুদ্ধ শুরুর আগে নির্দেশ দিয়ে সতর্ক করেছিলেন যে, কুরাইশদের সাথে আগত বনু হাশিম এর লোকজন যেহেতু স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নয়, কুরাইশদের চাপের মুখে পড়ে এসেছেন তাই তাদের প্রতি যেন কঠোরতা প্রদর্শন না করা হয় এবং আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (মহানবীর চাচা) কে যেন হত্যা করা না হয়। অনুরূপভাবে আবদুল বুখতারী সম্পর্কেও তিনি বলে রেখেছিলেন যে, তার ব্যাপারেও যেন কঠোরতা অবলম্বন করা না হয়। মহানবীর (সা.) এই আদর্শ মুসলিম সৈন্যদের রেখাপাত করেছে। পরিশেষে, ইসলাম গুপ্তহত্যা কখনো সমর্থন করে না। তাই নামসর্বস্ব যারা ইসলামের লেবাস ধারণ করে আনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, তাদের সাথে ইসলামের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
শিক্ষার্থী: কামিল ফিকহ্ (স্নাতকোত্তর),  শেষ পর্ব, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা
Email: abdulkarim1895@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ