মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পীযূষ দাদাদের ভূতে কিলাচ্ছে

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : কিছু কিছু মানুষ সুখে থাকলে ওদের পেছনে শয়তান লাগে। বেশি সুখ ওদের পছন্দ হয় না। আঙ্গুল, মন, শরীর, হাত-পা সব নিশপিশ করে। সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষকে উসকে দিয়ে কোনও একটা বিষয়ে হুলুস্থুল বাধিয়ে হীন স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর হয় এই শ্রেণির মানুষ।
অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে এমন কোনও ইবলিশে পেয়েছে বলেই মনে হয়েছে। অন্যথায় দীনদার মুসলিমদের পালনীয় বিষয় নিয়ে ওমন বেফাঁস কথা বলে নিজেকে ঝামেলায় জড়াতে যাবেন কোন দুঃখে?
পীযূষ সম্প্রতি বলেছেন, মুখে দাড়ি রাখা এবং টাখনুর ওপর কাপড় পরা জঙ্গির আলামত। এছাড়া শবেবরাত ও জন্মদিন পালন না করা, শহিদমিনারে ফুল না দেয়া, মাযার বা দরগার বিরোধিতা করা ইত্যাদিও নাকি জঙ্গিবাদীদের লক্ষণ। এমন ফতোয়াই দিয়েছেন তিনি ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামক একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে। এ সংগঠনের নামে দেশের ৬টি দৈনিকে ঢাউস সাইজের একটি পোস্টারও বিজ্ঞাপন আকারে ছাপা হয়েছে একই দিনে। এ সংগঠনটির তিনি আহ্বায়ক। এটির কার্যক্রম শুরু হয় বছরখানেক আগে।
পীযূষ দাদার এবং পোস্টারের বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড় শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে এই গরম এবং পবিত্র রমযানের কষ্টকর দিনগুলো ছাপিয়ে এ প্রতিবাদ আর বিক্ষোভ অচিরেই দেশময় ছড়িয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে এর আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দাদার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে।
মঞ্জুর খান নামক একজন নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেছেন এভাবে : “কি রে পীযুষ, দাঙ্গা বাধাইতে চাস? হায়দ্রাবাদ স্টাইলে দাঙ্গা বাধাইয়া ভারতরে ইনভাইট করবার চাস? তোর টার্গেটটা কী?”
মঞ্জুর খানের এ স্ট্যাটাসে অসংখ্য ক্ষুব্ধ মানুষ লাইক দিচ্ছেন। যাচ্ছেতাই ভাষায় গালমন্দ করছেন আমাদের প্রিয় অভিনেতা দাদাকে। জুতো দেখাচ্ছেন। থুথু মারছেন। এমন স্ট্যাটাস অনেকেই দিচ্ছেন ফেসবুকে। কেউ কেউ দাদাকে অবিলম্বে গ্রেফতারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেকে দাদার ফাঁসিও দাবি করছেন। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে পীযূষ দাদা রাস্তায় বেরুলে পুলিশ প্রটেকশনের প্রয়োজন হবে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দাদা ওপার গিয়ে আশ্রয় নেবেন। এ ব্যবস্থা তাঁর তো আছেই। এছাড়া প্রচার করতে সুবিধে হবে, বাংলাদেশের মানুষ কতটা সাম্প্রদায়িক এবং হিন্দুবিদ্বেষী। অথচ এর বীজ তিনিই রোপণ করেছেন মুসলিমদের পালনীয় বিষয় সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলে এবং প্রচারণা চালিয়ে।
টাখনুর ওপর কাপড় পরা এবং দাড়ি রাখা রাসুল (স) এর সুন্নত। মুসলিমদের জন্য এ দুটো কাজ পালনীয়। তাই নিষ্ঠাবান দীনদার মুসলিমরা দাড়ি রাখেন। কিন্তু পীযূষ দাদা এ সুন্নতকে জঙ্গিবাদের আলামত বা বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলেন। বক্তৃতাও ঝাড়লেন। এতো দুঃসাহস তিনি কোত্থেকে পান?
ভারতজুড়ে গরুর গোশত খাওয়ার জন্য মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। চিনে মুসলিমদের নির্যাতন শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সেখানকার রাখাইন বৌদ্ধরা ধর্ষণ ও হত্যাসহ  মেরেকেটে কীভাবে দেশ থেকে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে তা বিশ্ববাসী জানে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলা চালিয়ে ৫০ জন মুসলিমকে কীভাবে হত্যা করা হলো তাও জেনেছে সমগ্র দুনিয়ার মানুষ। শ্রীলঙ্কায় মুসলিমদের পোশাকে ইহুদিরা কী নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালালো এইতো ক'দিন আগে। এখন দেশটিতে প্রতিদিন মুসলিমদের ওপর হামলা হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে মসজিদ আর মাদরাসা। যারা শ্রীলঙ্কায় হামলা চালিয়েছে তারা দফায় দফায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলে প্রকাশ। এতো কিছু দেখেও না দেখবার ভান করেন পীযূষ দাদারা। অমুসলিমদের দ্বারা সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ তাঁদের চোখে পড়ে না। যতো দোষ নন্দঘোষ তথা মুসলিমদের। পৃথিবীতে যতো অন্যায়-অবিচার সবই করে মুসলিমরা। অন্যরা সব সাধুসজ্জন। এমনই ধারণা দেন পীযূষ দাদারা। দাড়ি কেবল মুসলিমরাই রাখেন এমন নয়। পীযূষের বাপ-দাদারাও অনেকে দাড়ি রেখেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরতো মুখভরা দাড়িমোচের জন্য বিশ্বখ্যাত হয়ে আছেন। আমাদের আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণদার বেশ লম্বা দাড়ি আছে। যদিও মুসলিমদের সুন্নতি দাড়ি আর রবীন্দ্রনাথ-নির্মল গুণদের দাড়ির মধ্যে ফারাক যথেষ্ট। কিন্তু দাড়িতো। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও ভারতের অনেক গুণীজনেরই দাড়ি দেখা গেছে। এছাড়া দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখেও অল্পবিস্তর দাড়ি আছে। হিন্দুসন্ন্যাসীদের দাড়িমোচ প্রায় অনিবার্যই।
ভারতের ইতিহাসে খুঁজলে পাবেন, বহুবার দাড়িওয়ালা ত্রিশূলধারী সন্ন্যাসীরা মুসলিমদের ওপর হামলা চালিয়ে হাজার হাজার হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। রক্তের সমুদ্র প্রবাহিত করেছে। তাদের জঙ্গি-সন্ত্রাসী বলবার সাহস নেই পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়দের। তাঁরা নিষ্ঠাবান মুসলিমদের জঙ্গিসন্ত্রাসী বলবার দুঃসাহস দেখান বারবার। যারা নবী মুহাম্মদ (স) এর সুন্নত হিসেবে টাখনুর ওপর লুঙ্গি-পায়জামা পরেন তাঁদের জঙ্গি বলে উল্লেখ করেছেন।
পীযূষরা ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর কথা বলে তাঁদের উসকে দিয়ে দেশের সম্প্রীতির পরিবেশ বিনষ্টের মাধ্যমে সংঘাত সৃষ্টি করে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে চান।
পীযূষরা ভালো করেই জানেন, এদেশের বেশিরভাগ মুসলিম দীনদার এবং ইসলামী অনুশাসনের প্রতি অনুগত। এই মুসলিমরা সহনশীল হলেও ইসলামের বিরুদ্ধে তথা কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি কোনও বক্তব্য কারুর মুখে শুনলে অথবা  পীযূষের মতো অপরিণামদর্শী  উদ্দেশ্যমূলক কথা বললে মুসলিমদের কেউ অঘটন ঘটিয়ে বসবে। আর তখনই তাঁরা তাঁদের বিদেশি প্রভুদের ডেকে এনে তাঁদের লক্ষ্য হাসিল করে ফেলবেন। পীযূষদের সাম্প্রতিক কার্যকলাপে এমনটিই প্রতীয়মান হচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে জনগণ ও সরকারের সতর্ক থাকা জরুরি। এরা কালসাপ। হঠাৎ ছোবল মেরে সর্বনাশ করতে পারে যেকোনও সময়। তাই এখনই এদের রুখে দেয়া সময়ের দাবি।
কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ পুলিশ ৪ ভারতীয়কে গ্রেফতার করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। এদের কাছে অস্ত্র এবং প্রচুর গোলাবারুদ পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এরা আইএস-এর নাম দিয়ে বাংলাদেশে হামলা চালাতে এসেছিল। শ্রীলঙ্কার পর পশ্চিমবাংলা এবং বাংলাদেশে আইএস হামলা পরিচালনা করবে বলে এমন খবর আগেই পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের পুলিশ তাই প্রস্তুতও ছিল। উল্লেখ্য, পুলিশের কাছে গ্রেফতারকৃতদের নাম-ধামসহ বিস্তারিত তথ্য রয়েছে বলেও জানা গেছে। এদের প্যাঁদানি দিলে পীযূষগংদের নামও সুরসুর করে বেরিয়ে আসতে পারে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে পীযূষ দাদার সঙ্গে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক ভারতীয়দের গোপন লিঙ্ক বের করে দেশবাসীকে অবহিত করা হোক।
উল্লেখ্য, যে মঞ্চে পীযূষ দাদা দাড়িওয়ালা ও টাখনুর ওপর লুঙ্গিপরা মুসলিমদের জঙ্গি বলে ঘোষণা করেন, সে মঞ্চে তাঁর পাশে বসেছিলেন শোলাকিয়া ঈদগাহ জামায়াতের মাননীয় ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদও। তাঁর মুখেও দাড়ি আছে। পায়জামা টাখনুর নিচে না ওপরে পরেছিলেন সেটা অবশ্য ছবিতে বোঝা যায়নি। সুন্নত অনুসারে অবশ্য টাখনুর ওপরেই পরবার কথা। তবে এটা অন্তত পরিষ্কার হলো যে, তিনি আসলেই পীযূষ দাদাদের লোক।
বলা আবশ্যক যে, পীযূষ দাদারা এদেশে খুব সুখে আছেন। দেশবাসী তাঁদের খুব আপন ভাবেন। ভালোবাসেন। ঘরে ডেকে বসতেও দেন। বন্ধু মনে করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবেও তাঁদের সমান মর্যাদা ও অধিকার দেয়া হয়। কিন্তু ঐ যে কথায় বলে না, ‘সুখে থাকলে মানুষকে ভুতে কিলায়।’ পীযূষ দাদাদের এখন ভুতেই কিলাচ্ছে। অন্যথায় দীনদার মুসলিমদের সুন্নতি দাড়ি রাখা এবং টাখনুর ওপর লুঙ্গি-পায়জামা পরার মধ্যে জঙ্গিবাদ খুঁজে ফিরবেন কেন?
উল্লেখ্য, জনগণের মারের ভয়ে ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ এর আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়রা জানিয়েছেন, গত ১২ মে ২০১৯ তারিখে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত পোস্টারটি নাকি তাদের নয়। তাহলে সংবাদসম্মেলন আহ্বান করে যে বক্তব্য পীযূষ দিয়েছিলেন, ‘তার বেলা’?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ