শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আমচোর

মুহাম্মাদ আলী মজুমদার  : রিমনঃ নাহ্! এভাবে আর চলতে দেওয়া যায়না।এর একটা বিহিত করতেই হবে।

ইমনঃ বড় ভাই, শুনছো ! কালও নাকি আম চুরি হয়েছে। ঐ যে চিনিআম গাছ আর কোণার আম গাছ আছে না, সেগুলো থেকে ।

রিমনঃ শোনো, আমাদেরকে চোর ধরতেই হবে।

ইমনঃ চোরের আর নিস্তার নাই। এবার চোর ধরা খাবেই।

রিমনঃ কিন্তু কীভাবে?

ইমনঃ শোনো ভাই, দিনের বেলা তো আম চুরি হচ্ছে না। রাতেই চুরি হচ্ছে আম। তাই আমরা রাতে পাহারা বসাব। আরমান আর কাফিরও সাহায্য নেবো।

 

রিমন আর ইমন দুই ভাই। আরমান আর কাফি তাদের বন্ধু। রিমন বড়। রিমন পড়ে এইটে আর ইমন সেভেনে। দুই জনই গা-গতরে সমান। দুই ভায়ের মধ্যে বেশ মিল-মোহব্বত। তাদের বাবা দুবাই থাকেন। বাড়িতে পুরুষ বলতে তারা দু'জনই।তাদের আছে বিরাট এক আম বাগান। কমপক্ষে একশটি আম গাছ হবে বাগানে। বিশাল বাগান তারা দু'ভাই-ই দেখাশোনা করে। আজ কয়েকদিন ধরে কে যেন আম চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

 

টানা দুই দিন ধরে তারা চারজন রাত জেগে পাহারা দিল। কিন্তু না, কেউ তো চুরি করতে এলো না। তাহলে কি চোর জেনে গেছে তাদের পাহারার কথা!

 

আজ তৃতীয় দিন। সন্ধ্যার পর থেকেই তারা বাগানের প্রবেশ পথে পাহারা দিতে লাগল। তারা দুজন করে দুই দলে ভাগ হলো। বিশাল দুটি আম গাছে উঠে বড় একটি ডালে পাতার আড়ালে তারা বসে রইল। বাগানে হালকা চাঁদের আলো। এই আবছা আলোতেও বাগানের প্রবেশ পথ মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । কই নাহ্ । কেউ তো আসছে না। তাহলে আজও কি ব্যর্থ হবে তারা। হঠাৎ ইমন রিমনকে বলে উঠল,

:দেখ, দেখ, দেখ। ভাই দেখ, বাগানে কে ঢুকতেছে দেখ।

:আরে ওকে তো আমি চিনি। এটা তো রহিম মিয়ার কলোনিতে থাকে। বস্তির ছেলে।

: এখনই আমরা নেমে পড়ি। ওকে ধরতে হবে।

: না, এখন না। ও আরো ভেতরে ঢুকুক। এখন নামতে গেলে ও টের পাবে। পালিয়ে যাবে।

ছেলেটি যখন বাগানের অনেক ভেতরে ঢুকল, ওরা চারজন বিজলির গতিতে নিচে নেমে পড়ল। নেমেই চোরের পিছু নিল। দেখতে পেল চোর ছেলেটি বড় একটি আম গাছে। পাকা আমগুলো বেছে বেছে তার থলেতে ভরছে। ওরা চারজন আর দেরি করল না। ছেলেটির দিকে টর্চ লাইট মারল। সে থতমত খেয়ে উঠল। গা কাঁপতে শুরু করল ছেলেটির। রিমন ভারী গলায় বলে উঠলঃ এই ছেলে জলদি করে নিচে নেমে আস। নইলে খবর আছে। বাকি তিনজনও সমস্বরে বলে উঠলঃ তাড়াতাড়ি নেমে পড়। নইলে আমরা গাছে উঠে মেরে মেরে নামাব তোমাকে। ছেলেটি মারের কথা শুনে তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে আসল। ওরা চারজন চোর ধরার আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। নেমেই চোর হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কেঁদে কেঁদে বলল, ভাইয়েরা, আমাকে মাফ করে দিন। দয়া করুন। আমাকে পরে মারুন, আগে আমার কথা শুনুন। রিমন বললঃ বল, কী বলতে চাও তুমি? এবার চোর কান্না বন্ধ করল। দুহাতে দুচোখ মুছতে মুছতে বলল, আমার মা খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলছে তার টাইফয়েড । চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে। আমার বাবা বেঁচে নেই। আমিও ছোট মানুষ। কোনো কাজ জানিনা। আমার মা মেস বাসাতে ভাত রান্না করে। এখন কাজেও যেতে পারছে না। এদিকে মায়ের অসুখ দিন দিন বেড়েই চলছে। ঔষধ কেনারও টাকা নেই। তাই আমি নিরুপায় হয়ে আম চুরি করতে এসেছি। আম বিক্রি করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে মায়ের জন্য ঔষধ-বড়ি কিনি। কথাগুলো বলেই ছেলেটি আবার কান্না শুরু করল। চোরের দুঃখের কথা শুনে চারজনের মন গলে গেল। তারা চোরের প্রতি দয়াপরবশ হলো। রিমন মনে মনে ভাবতে লাগল, নাহ্ ! ওকে মারা ঠিক হবে না। এই ছোট্ট মা-পাগল ছেলেটিকে মারলে আল্লাহ্ও নারাজ হবেন। ইমন বলে উঠল, এই ছেলে শোনো ! তুমি কান্না থামাও। আমরা তোমাকে মারবনা। তুমি আজ বাড়িতে চলে যাও । কাল সকালে দশটার দিকে বাগানে এসো। দেখি তোমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি কিনা !

 

পরদিন সকাল। ঠিক দশটা। কথামতো ওরা চারজন বাগানে চলে আসল। ছেলেটির জন্য অপেক্ষা করছে সবাই। দশটা বেজে ত্রিশ মিনিট হয়ে গেছে। ছেলেটি আসার এখনো কোনো নামগন্ধও নেই। হঠাৎ কাফি বলে উঠল, ঐতো ছেলেটি আসছে। ঐ যে দেখা যাচ্ছে। ছেলেটি এসে হাজির হলো।

 ছেলেঃ আসসালামু আলাইকুম।

রিমনঃ ওয়াআলাইকুমুস সালাম ।

ছেলেঃ ভাইয়েরা, আমাকে কেনো আসতে বলেছেন? একটু তাড়াতাড়ি বলেন। আমার মায়ের জন্য ঔষধ কিনতে হবে আমাকে।

রিমনঃ আমরা তোমাকে সামান্য সাহায্য করতে চাই।

আরমানঃ আমরা তোমার জন্য পাঁচ বস্তা আম রেখেছি। সবগুলোই পাকা। এগুলো বিক্রি করে তুমি তোমার মায়ের জন্য ঔষধ কিনবে। আমরা তো সবাই ছোট। তাছাড়া আমরা সকলেই ছাত্র। আমদের কাছে টাকা নেই। নইলে আমরা তোমাকে টাকা দিয়েই সাহায্য করতাম।

একথা শুনে ছেলেটির দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এ কান্না আনন্দের।এ কান্না কৃতজ্ঞতার। কাফি ছেলেটির চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল, কেঁদোনা ভাই। আজ থেকে তুমি আমাদের ভাই। তোমার সুখ-দুঃখের সাথী হবো আমরা। সবাই ছেলেটি সাথে কোলাকুলি করল। আমের বস্তা নিয়ে ছেলেটি ছুটল তার বাড়ির দিকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ