রবিবার ১১ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

উচ্চ আদালতের আদেশ

হাই কোর্টের দুটি আদেশ নিয়ে দেশের সচেতন সকল মহলেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দুটির মধ্যে প্রথম আদেশে দু’জন মাননীয় বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১২ মে বিভিন্ন কোম্পানির ৫২টি ভেজাল ও নি¤œ মানের খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিতে বলেছেন। এর কারণ, সরকারের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় এ খাদ্যপণ্যগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। চিহ্নিত খাদ্যপণ্যগুলোর মানোন্নয়ন না করা তথা জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত এসব পণ্য যাতে উৎপাদন ও বাজারজাত না করা হতে পারে সে বিষয়েও আদেশ দিয়েছেন মাননীয় বিচারপতিরা।
পরদিন ১৩ মে ঢাকা ওয়াসার দূষিত পানি বিষয়ক এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাই কোর্টের অন্য একটি বেঞ্চ জানতে চেয়েছেন, বিভিন্ন এলাকার পানি পরীক্ষার খরচ কোন প্রতিষ্ঠান বহন করবে। এই জিজ্ঞাসার জবাব দেয়ার জন্য মাননীয় বিচারপতিরা আজ অর্থাৎ ১৫ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ওয়াসার দূষিত পানির বিষয়ে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ মে দেয়া এক আদেশে হাই কোর্ট বেঞ্চ জানতে চেয়েছিলেন, রাজধানীর কোন কোন এলাকার পানি বেশি দূষিত তথা অনিরাপদ। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে ওয়াসা বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জবাব দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে রিটকারী আইনজীবী নিজেই বেঞ্চের কাছে একটি তালিকা উপস্থাপন করে জানিয়েছেন, রাজধানীর ১৬টি এলাকার পানি বেশি দূষিত এবং বিপদজনক। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে জুরাইন, দনিয়া, শ্যামপুর, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর, লালবাগ, রাজার দেউরি, মালিবাগ, মাদারটেক, বনশ্রী, গোড়ান, রায়সাহেব বাজার, মোহাম্মদপুরের বসিলা, মিরপুরের পল্লবী, কাজীপাড়া এবং সদরঘাট এলাকা। এই তালিকা পেশ করার সময় রিটকারী আইনজীবী জানিয়েছেন, ওয়াসার মতো কোনো সংস্থার মাধ্যমে বা সাহায্যে নয়, বরং সংবাদপত্রসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি নিজেই তালিকাটি তৈরি করেছেন। এ সময়ই মাননীয় বিচারপতিরা পানি পরীক্ষার খরচের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। উল্লেখ্য, এর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পানি পরীক্ষার রিপোর্ট দাখিলের পরিবর্তে একটি অগ্রগতি রিপোর্ট পেশ করা হয়। এতে পানি পরীক্ষার জন্য কমিটি গঠন এবং কমিটির কার্যপরিধির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে ঢাকা ওয়াসাকে ১১টি জোন বা অঞ্চলে ভাগ করে পানি পরীক্ষার প্রস্তাব রেখে বলা হয়েছে, অর্থায়ন করা হলে চার মাসের মধ্যে পানি পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া যেতে পারে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পানি পরীক্ষার রিপোর্ট দাখিল না করার মাধ্যমে ওয়াসা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রকারান্তরে হাই কোর্ট বেঞ্চের পূর্ববর্তী নির্দেশ অমান্য করেছে। ওয়াসা সেই সাথে অর্থায়নের দাবি জানিয়ে পানি পরীক্ষার সম্পূর্ণ বিষয়টিকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আজ যেহেতু আবার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে সেহেতু কোনো মন্তব্য করার পরিবর্তে অপেক্ষা করা দরকার।
আমরা মনে করি, ৫২টি খাদ্যপণ্য নিষিদ্ধ করার এবং ওয়াসার দূষিত পানির ব্যাপারে হাই কোর্টের জড়িত হওয়া মোটেও স্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে এ দুটি বিষয়ের জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালত পৃথক দুটি বেঞ্চ গঠন করেছে। এর কারণ ব্যাখ্যায় বলা যায়, দুটি বিষয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে মানুষের জীবনসহ জনস্বার্থ জড়িত রয়েছে বলেই হাই কোর্টকে ভূমিকা পালনের জন্য এগিয়ে আসতে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় বিচারপতিদের বক্তব্যও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার। তারা বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল দেয়ার এবং নি¤œমানের খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে শুধু রমযান মাসে অভিযান চালালে চলবে না। এই অভিযান সারা বছরই অব্যাহত রাখা উচিত। ভেজাল এবং অনিরাপদ খাদ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য যে পৃথক পৃথক সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ রয়েছে সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাননীয় বিচারপতিরা বলেছেন, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে জনগণের প্রতি ভালোবাসা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভেজাল এবং পানির মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা যে উচ্চ আদালতের কাজ নয় তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাননীয় বিচারপতিরা বলেছেন, তাদের কাজ না হওয়া সত্ত্বেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ জড়িত রয়েছে বলেই হাই কোর্টকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে মাননীয় বিচারপতিরা ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণার অনুরোধ জানিয়েছেন।
আমরা মাননীয় বিচারপতিদের বক্তব্য, পর্যবেক্ষণ এবং আদেশ ও অনুরোধকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। সরকারের উচিত ভেজাল, বিষাক্ত ও নি¤œমানের খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। একই কথা ওয়াসার দূষিত ও রোগজীবাণু বহনকারী পানির ব্যাপারেও প্রযোজ্য। এক্ষেত্রেও হাই কোর্ট বেঞ্চের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া সরকারের কর্তব্য। মানুষের জীবন নিয়ে যাতে ব্যবসায়ী নামের কোনো দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী এবং ওয়াসার মতো কোনো সংস্থা ছিনিমিনি খেলতে না পারে সে লক্ষ্যে সরকারকে জরুরিভিত্তিতে তৎপর হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ