শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

রাসূল (সা:) এর সিয়াম পালন ও ঈদ উদযাপন

সানজানা আফরিন বনি : ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে সিয়াম অন্যতম; যা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য তাকওয়া ও আনুগত্যের প্রশিক্ষণের একটি মাস। সিয়াম পালনের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও নাজাত লাভের সুবর্ণ সুযোগ পাই, যে কারণে এ মাসের ফজিলত অন্যান্য সব মাসের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। আর এ মাস শেষেই আসে আল্লাহর পুরষ্কার; আনন্দের দিন ঈদ। তাই আমরা জানার চেষ্টা করবো আল্লাহর প্রিয় হাবিব রাসূল (সা) কিভাবে সিয়াম পালন ও ঈদ উদযাপন করতেন।
* রাসূলুল্লাহ (সা) এর সিয়াম পালন :
সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যখন রমজান মাস এসে উপস্থিত হতো, তখন রাসূলুল্লাহ (স:) সাহাবাদের উদ্দেশ্য করে কয়েকটি আমল করতে বলতেন ও নিজেও করতেন। সেগুলো হলো :
১. চাঁদ দেখা ও রোজা রাখা : রাসূলুল্লাহ (স:) এই আমলটি প্রত্যেক রমজানে করেছেন।
২. তারাবিহ পড়া : তারাবিহ একটি সুন্নাত যা নবীজি (সা) রমজানের প্রতি রাতে পড়েছেন।
৩. সেহরি খাওয়া : রাসূলুল্লাহ(স:) বলেছেন, “তোমরা সেহরি খাও। কেননা এতে বরকত আছে। এবং দেরি করে খাও।”
৪. ইফতার করা : আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “রোজাদার ব্যাক্তির জন্য দুইটি খুশির সময় আছে, একটি সময় হলো ইফতারের সময় ও আরেকটি সময় হলো তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। তাই তোমরা ইফতার করবে।” রাসূলুল্লাহ(স:) বলেছেন, “তোমরা ইফতার তাড়াতাড়ি করে নিও।”
৫. ইফতারের সময় দোয়া করা : রাসূলুল্লাহ(স:) বলেছেন, “কয়েকটি সময় দোয়া কবুল হয়, তার মধ্যে একটি সময় হলো ইফতারের সময়।”
৬. মিথ্যা থেকে বিরত থাকা : রাসূলুল্লাহ(স:) বলেছেন, “রোজাদার ব্যাক্তির জন্য এটা আবশ্যক যে, সে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকবে।”
৭. ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকা : রাসূলুল্লাহ(স:) বলেছেন, “রমজান মাস শান্তির মাস, এই মাসে তোমরা অশান্তি থেকে বিরত থাকো।”
৮. রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানো : রাসূলুল্লাহ (স:) বলেছেন, “তোমরা যতটা পারবে রমজান মাসে রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার ও সেহেরি খাওয়ানোর চেষ্টা করবে, কারণ কেউ যদি রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করায়, তার সমপরিমাণ নেকি সেও পাবে। কিন্তু এতে রোজাদার ব্যক্তির একটুও নেকি কমবেনা।
৯. কোরআন তিলাওয়াত : যেহেতু এই মাসে কোরআন নাজিল হয়েছিল, তাই রাসূলুল্লাহ (স:) এই মাসে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করতে উৎসাহিত করতেন।
১০. অধিক পরিমাণে দান-সদকা করা : রাসূলুল্লাহ (স:) বলেছেন, “রমজান মাসে কেউ যদি ভালো কাজ করে তার সওয়াব অনেক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।”
“আল্লাহপাক বলেছেন, রোজা আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দিবো।”
১১. সিয়াম থাকা অবস্থায় মিসওয়াক করা : হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ(স:) সিয়াম(রোজা) থাকা অবস্থায়ও মিসওয়াক করতেন।
১২. রমজানের শেষ দশ দিন বেশি বেশি ইবাদাত করা : রাসূল (সা) রমজানের শেষ দশদিনে ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। তিনি লাইলাতুল কদর তালাশ করা সম্পর্কে বলেন, “রমজান মাসের শেষ দশ রাতের বিজোড় রাত্রি গুলোতে একটি রাত আছে যা হাজার মাসের মাসের চাইতেও উত্তম।”
১৩. রমজান মাসের শেষ দশদিন মসজিদে ইতেকাফ করা : রাসূলুল্লাহ (স:) রমজান মাস আসলেই মসজিদে ইতেকাফ করতেন।
১৪. ওমরা হজ পালন করা : এই মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত হলো যার সামর্থ আছে তার ওমরা হজ পালন করা।
১৫. রমজান মাস শেষ হওয়ার আগে আগে ফিতরা আদায় করা : রাসূল (সা) রমজান মাস শেষ হওয়ার আগে আগেই ফিতরা দিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।
১৬. এছাড়া রাসূল (সা) এই মাসে বেশি বেশি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।
১৭. রাসূল (সা) রমজান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় আমলগুলো আরো বাড়িয়ে দিতেন।
সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী সিয়াম পালন করতে অভ্যস্ততা অর্জন করতে পারি।
এক্ষেত্রে তাঁরই একটি বাণী আমাদের সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে, যেটি মুমিনদের জন্য সতর্কবাণীও বটে:
“তারাই তো সবথেকে বেশি হতভাগা, যারা রমজান মাস পেলো কিন্তু তাদের গুনাহগুলোকে ক্ষমা করাতে পারলোনা।” (বুখারী)
* রাসূল (সা) এর ঈদ উদযাপন :
“আর যেন তোমরা নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা আল্লাহর মহত্ব-বড়ত্ব প্রকাশ কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা বাকারা : ১৮৫)
এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে, ঈদের উদ্দেশ্য হল দুটি :
১) আল্লাহর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা।
২) আল্লাহ যে নেয়ামত দান করেছেন সেজন্য তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা।
ইসলামপূর্ব যূগেও বিভিন্ন জাতি বিভিন্নভাবে উৎসব পালন করতো। তবে সেগুলো ছিল শুধু আনন্দ-ফুর্তি আর খেলা-ধুলা। যেমনটি আবু দাউদ শরিফের বর্ণনায় এসেছে- মদীনায় যাওয়ার পর নবীজি (সা.) দেখলেন, সেখানকার লোকজন দুটি দিনকে উদযাপন করে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে। নবীজি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দুদিনের কী তাৎপর্য আছে? তারা বললো, আমরা জাহেলী যুগে এ দু দিনে খেলাধুলা করতাম। তখন তিনি বললেন : আল্লাহ এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দু’টো দিন দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। শুধু খেলাধুলা, আমোদ-ফুর্তির জন্য যে দু’টো দিন ছিল আল্লাহ তায়ালা তা পরিবর্তন করে এমন দু’টো দিন দান করলেন যে দিনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, তাঁর স্মরণ ও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হবে। হযরত ইবনে জারীর রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনা মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম ঈদ পালন করেছেন।
ঈদ উৎসবটির সত্যিকার তাৎপর্য বুঝতে হলে, আসুন আমরা দেখি নবীজির (সা) জীবনে ঈদ কেমন ছিল:
ঈদের দিন সকাল বেলায় নবীঘর ও তার চার পাশে সবকয়টি জায়গায় ঈদ আনন্দের আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। এ সব কিছুই হচ্ছিল প্রিয় নবী (সা.) এর চোখের সামনে। প্রত্যেকে ঈদ আনন্দে নিজ নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করছিল। তারা সকলেই চাইত তাদের নিজ নিজ অনুষ্ঠান সম্পর্কে যাতে বিশ্বনবী (সা.) অবগত হন। প্রিয় নবী (সা.) এর ভালোবাসা ও সম্মানের খাতিরেই তারা এসব করেছিল।
এদিকে নবীজীর (সা.) এর ঘরের অবস্থা সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : “রাসূল (সা.) ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন, তখন আমার নিকট দুটি ছোট মেয়ে গান গাইতেছিল। তাদের দেখে প্রিয় নবী (সা.) অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে আবু বকর (রা.) আমার ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির কাছে শয়তানের বাশি? প্রিয় নবী (সা.) তার কথা শুনে বললেন : মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও। অতঃপর যখন প্রিয় নবী (সা.) অন্য মনস্ক হলেন তখন আমি মেয়ে দুটিকে ইশারা করলে তারা বের হয়ে গেল।”
অন্যদিকে হুজরা শরিফের খুবই নিকটে আরেকটি অনুষ্ঠান চলছিল, যেটির বর্ণনাও দিয়েছেন আয়েশা (রা.) এভাবে দিয়েছেন : ঈদের দিন আবিসিনিয়ার কিছু লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে খেলাধুলা করছিল। প্রিয় নবী (সা.) হযরত আয়েশা (রা.) কে ডেকে বললেন : আয়েশা তুমি কী দেখতে চাও? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি আমাকে তাঁর পিছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন, আমার গাল তাঁর গালের উপর রাখলাম। তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন: হে বনি আরফেদা, তোমরা শক্ত করে ধর। এরপর আমি যখন ক্লান্ত হয়ে গেলাম তখন তিনি বললেন, তোমার দেখা হয়েছে তো? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি বললেন: তাহলে এবার যাও। (বুখারী, মুসলিম)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, নবীজির হুজরার সন্নিকটে ঈদ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান শুরু হল। কতগুলো বালক নবীর শানে উচ্চাঙ্গের ও মানসম্পন্ন কবিতা আবৃতি করতে লাগল।
আয়েশা (রা.) বলেন: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসা ছিলেন, ইত্যবসরে আমরা বাচ্চাদের চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দেখলেন হাবশিরা খেলাধুলা করছে আর ছোট ছোট শিশুরা তাদের চারদিকে হৈ চৈ করছে। তিনি বললেন : আয়েশা এদিকে এসে দেখে যাও। অতঃপর আমি এসে আমার থুতনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গর্দানের উপর রেখে তার পিছনে থেকে তাকাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন: তুমি পরিতৃপ্ত হওনি? তুমি কী এখনও পরিতৃপ্ত হওনি? আমি তখন তার নিকট আমার অবস্থান পরীক্ষা করার জন্য বলতেছিলাম না এখনও হয়নি। হঠাৎ ওমর (রা.) এর আগমন ঘটল। সাথে সাথে লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্তব্য করলেন: আমি দেখলাম জিন ও মানুষ শয়তানগুলো ওমরকে দেখে পালিয়ে গেল। (তিরমিজি)
হাবশীরা যে কবিতাগুলো আবৃতি করছিল সেগুলো অর্থ বুঝা যাচ্ছিলনা, কেননা সেগুলো ছিল তাদের নিজস্ব ভাষায়। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কবিতাগুলোর অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। মুসনাদ ও সহীহ ইবনে হিব্বানে আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হাবশিরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এমন কিছু পাঠ করতেছিল যা তিনি বুঝতে পারছিলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কী বলছে? সাহাবাগণ বললেন, ওরা বলছে : মুহাম্মদ সৎ ও নেককার বান্দা।
 সাহাবী আনাস (রা.) বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখলেন ইহুদিরা দুটি দিন খেলা-ধুলা ও আনন্দ ফুর্তি করে। তখন তিনি বললেন : আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন, তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন।” (আবু দাউদ, নাসায়ী)
আল্লাহ ও তাঁর দেয়া বিধান ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী যদি আমরা সিয়াম পালন ও ঈদ উদযাপন করি তবে একদিকে যেমন ঈদের অনাবিল আনন্দে ভরে উঠবে আমাদের জীবন অন্যদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে ধন্য হবে আমাদের পরকালীন জীবন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ