মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রাজপথে রোজাদার পাটকল শ্রমিকদের আর্তনাদ

খুলনা অফিস : বৈশাখের কাঠফাটা রোদে রাজপথে অসহায় না খেয়ে রোযা রাখা শ্রমিকদের স্লোগানে খুলনা শিল্পাঞ্চলের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। তবুও পাটকল শ্রমিকদের পাওনা অর্থ দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ধর্ণা দিয়েও বরফ গলছে না-জানালেন বিজেএমসির চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ নাছিম। গত কয়েদিন অর্থ মন্ত্রণালয়ে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অপেক্ষা শুধু প্রধানমন্ত্রীর জন্য। এদিকে অসহায় শ্রমিকরা তাদের বিকেল ৪টায় বিক্ষোভ মিছিলসহ নতুন রাস্তা মোড়ে রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। সেখানে তারা ইফতার সম্পন্ন করে রাজপথেই গত কয়েক দিনের মত নামাজ আদায় করেছে।
প্রতিশ্রুতি মতো মজুরি না পাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি অব্যাহত রেখেছেন খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা। রোববার ৭ম দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকরা। এর ফলে এসব পাটকলে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, গত শুক্রবার ছুটি দিন ছিল। শনিবার ও রোববার সকাল থেকেও কোনো শ্রমিক কাজে যোগদান করেনি। রোববার বেলা সাড়ে ৩টায় ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলীম, ইস্টার্ণ, কার্পেটিং ও জেজেআইর শ্রমিকরা থালা হাতে নিয়ে স্ব স্ব মিল গেটে সমবেত হয়। পরে বিকেল ৪টায় বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নতুন রাস্তা মোড়, আটরা ও রাজঘাটের খুলনা-যশোর মহাসড়কে অবস্থান করে। পাওনার দাবিতে শ্রমিকরা মহাসড়ক ও রেললাইনের ওপর বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় আন্দোলনকারীরা মহাসড়কের সকল যান ও রেললাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। ফলে নতুন রাস্তা, আটরা ও নওয়াপাড়া শিল্প এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা। অবরোধ চলাকালে এক সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। পাটকল শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মো. মুরাদ হোসেন, হেমায়েত উদ্দীন আজাদী ও খলিলুর রহমানসহ সিবিএ-নন সিবিএ নেতারা এ সময় বক্তব্য রাখেন। বক্তারা অবিলম্বে শ্রমিকদের ৯ দফা বাস্তবায়নের জন্য বিজেএমসি কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান। গত ৫ মে রাত থেকে থেকে পাটকল শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। খুলনার প্লাটিনাম জুবলী জুট মিলস, স্টার জুট মিলস, দৌলতপুর জুট মিলস, খালিশপুর জুট মিলস, আলিম জুট মিলস, ইস্টার্ণ জুট মিলস, ক্রিসেন্ট জুট মিলস এবং যশোরের জে জে আই জুট ও কার্পেটিং মিলস শ্রমিকরা এই কর্মবিরতিতে অংশ নিচ্ছেন।
শ্রমিকরা জানান, এর আগে গত ২ থেকে ৪ এপ্রিল শ্রমিকরা ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট ও রাজপথ-রেলপথ অবরোধ পালন করেন। এরপর শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে ৬-৭ এপ্রিল ঢাকায় বিজেএমসির সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের আলোচনা হয়। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ এপ্রিল থেকে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘটের ডাক দেন পাটকল শ্রমিকরা। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শ্রমিকরা ১৫ এপ্রিল থেকে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু করেন। ওই দিন বিকেলে ঢাকায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। শ্রম অধিদপ্তরের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানসহ বিজেএমসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কতগুলো সিদ্ধান্ত হয়। তার মধ্যে রয়েছে- ২৫ এপ্রিলের মধ্যে ১০ সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পূর্বের হারে এবং তিন মাসের বেতন পরিশোধ করা হবে। পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি মিল থেকে পরিশোধ করা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য দাবি নিয়ে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আগামি ৮ মে বিজেএমসি বৈঠকে বসবে। এরপরই ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতিমতো মজুরি না পাওয়ায় তাঁরা ফের কর্মবিরতি শুরু করেন।
শ্রমিক নেতারা জানান, শনিবার সকাল ছয়টা থেকে মিলের উৎপাদন বন্ধের চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি এবং বিকেল চারটা থেকে নতুন রাস্তা, আটরা ও রাজঘাটে অবরোধসহ রাস্তায় ইফতারি ও দুই ওয়াক্তের নামাজ আদায় করা হয়। রোববার প্রতিটি মিলে গেটসভা করে সারাদেশের ২৬টি পাটকলে একযোগে একই কর্মসূচির কথা জানানো হয়েছে। যেটি সম্প্রতি ঢাকায় পাটকল শ্রমিক লীগ ও সিবিএ-ননসিবিএ ঐক্য পরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ সোমবার থেকে সারাদেশে একযোগে ধর্মঘট ও তিন ঘণ্টার রাজপথ-রেলপথ অবরোধ এবং আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় ও ইফতারির মধ্য দিয়ে প্রতিদিনের কর্মসূচি শেষ হবে।
আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা জানান, খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলিম, ইস্টার্ন এবং যশোরের কার্পেটিং ও জেজেআই জুট মিলে বর্তমানে ১৩ হাজার ২৭১ শ্রমিক কাজ করছেন। মজুরি বকেয়া থাকায় শ্রমিকরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। শ্রমিকদের ঘোষিত দাবির মধ্যে রয়েছে- সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ সুপারিশ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ গ্রাচ্যুইটি ও মৃত শ্রমিকের বীমার বকেয়া টাকা প্রদান, টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ, পাট মওসুমে পাট ক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মিলগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিএমআরই করা। বিজেএমসির অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা জোনে মোট ২৬টি পাটকল রয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম জোনে রয়েছে আমিন জুট মিলস লিমিটেড ও ওল্ড ফিল্ডস লিমিটেড, গুল আহমেদ জুট মিলস লিমিটেড, হাফিজ জুট মিলস লিমিটেড, এমএম জুট মিলস লিমিটেড, আরআর জুট মিলস লিমিটেড, বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি লিমিটেড, কর্ণফুলী জুট মিলস লিমিটেড, ফোরাত কর্ণফুলী কার্পেট ফ্যাক্টরি, গালফ্রা হাবিব লিমিটেড ও মিলস ফার্নিসিং লিমিটেড। অন্যদিকে খুলনায় রয়েছে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ণ, আলিম এবং যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিল।
এদিকে গত ৮ মে বুধবার সকাল ১১টায় বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের সিবিএ কার্যালয়ে পাটকল শ্রমিক লীগের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশে ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের সিবিএ-নন সিবিএ নেতারাও এ বৈঠকে যোগ দেন। দীর্ঘ ৪ ঘন্টার বৈঠকে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের ব্যাপারে নানা আলোচনা করা হয়। খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে চলমান আন্দোলন অব্যাহতসহ ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাটকলে আগামী ১৩ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মিল ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া বিকেল ৪টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত রাজপথ-রেলপথ অবরোধের ডাক দেয়া হয়। এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পাটকল শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সরদার মোতাহার উদ্দীন। এদিকে মজুরি ও বেতন না পেয়ে চরম মানবেতর দিনযাপন করছে শ্রমিকরা। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের এ সমস্যার দ্রুত সমাধান করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিকরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ