মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

খুলনায় রোহিঙ্গা সন্দেহে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা

খুলনা অফিস : খুলনায় রোহিঙ্গা সন্দেহে ৬০ বছরের অজ্ঞাত এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুর ঘোনার কাঠালীয়া বাজারে এ ঘটনাটি ঘটেছে। পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সাহস ঘোষগাতী গ্রামের চিংড়ি ঘের মালিক মেহেদী মোড়ল ও কাঠালীয়া বাজারের মুদি দোকানদার মধুসুদন মন্ডলকে আটক করেছে ।
স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার রাতে রোহিঙ্গা সন্দেহে অজ্ঞাত এক বৃদ্ধকে স্থানীয় লোকজন পিটিয়ে আহত করে। এক পর্যায়ে তাকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি হাসপাতালে নেয়ার সময় তিনি মারা যান। পরে নিহত ব্যক্তিকে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফিরিয়ে আনার সময় শনিবার ভোর চারটার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরখালী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই রণজিৎ নিহত ব্যক্তিসহ উক্ত দুজনকে আটক করে।
স্থানীয় মাগুরখালী ইউপি চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ সানা বলেন, নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তার পরিচয় জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বিপ্লব বলেন, নিহত ব্যক্তি রোহিঙ্গা কিনা এখনো জানা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে আটক দুজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে ডুমুরিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছে।
এ ছাড়া একই দিন রাতে উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের নরনিয়া গ্রামে রোহিঙ্গা সন্দেহে পঞ্চাশোর্ধ এক নারীকে গ্রামবাসী আটক করে পিটিয়ে আহত করে। খবর পেয়ে মাগুরাঘোনা পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে।
এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরে ছেলে ধরা আতঙ্ক বিরাজ করছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নারী ধর্ষণ ও ডাকাত আতঙ্ক। বোরকা পরা অপরিচিত নারী-পুরুষ গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ায় গত একসপ্তাহ ধরে এই আতঙ্ক শুরু হয়েছে । দিনে অথবা রাতে ছদ্মবেশে অপহরণ কিংবা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এমন গুজবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজন রোহিঙ্গাকে ছেলেধরার কথিত অপরাধে আটক করেছে সাতক্ষীরা পুলিশ। তবে, পুলিশ বলছে এরা রোহিঙ্গা নয়, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের অসংলগ্ন কথাবার্তায় ধারণা করা যায় এরা বিকৃত মস্তিষ্ক।
গ্রামবাসীরা জানান, তাদের এলাকায় সন্ধ্যা নামতেই খবর আসছে যে, ওই পাড়ায় রোহিঙ্গা ঢুকছে। তারা শিশু অপহরণ কিংবা অন্য কোনো অপরাধের চেষ্টা করছে। এক কান দু’কান করে এ খবর গ্রামময় ছড়িয়ে পড়তেই নীরিহ গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে রাত জেগে রোহিঙ্গা ধরার চেষ্টা করছে। এমন ঘটনা জেলার তালা, সাতক্ষীরা, দেবহাটা ও কলারোয়াসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ঘটেছে।
দেবহাটা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) উজ্জ্বল কুমার মৈত্র জানান, শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে পারুলিয়া ইউনিয়নের কদবেলতলা এলাকা থেকে এক রোহিঙ্গা নারীকে গ্রামবাসী আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। ওই নারী কয়েকদিন ধরে সেখানে ঘোরাফেরা করছিলেন। গ্রামবাসীর ধারণা, তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে ছেলে ধরার চেষ্টা করছিলেন। পুলিশ তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সদর উপজেলার বাঁশদহা এলাকা থেকে জিতেন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। গ্রামবাসীর অভিযোগ, রোহিঙ্গা সদস্য জিতেন ভবানীপুর গ্রামের আনারুল ইসলামের ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
এদিকে, তালা ও পাটকেলঘাটা থানা এলাকা থেকে আরও তিন ব্যক্তিকে পৃথক স্থান থেকে গ্রামবাসীর সহায়তায় আটক করেছে পুলিশ। তাদের নাম পরিচয় জানা না গেলেও পুলিশ বলছে, তারা অপ্রকৃতিস্থ। তবে, গ্রামবাসীর ধারণা, তারাও রোহিঙ্গা সদস্য এবং ছেলে ধরার মতো অপরাধের চেষ্টা করছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে বেশ কিছু সংখ্যক নারী ও পুরুষ রোহিঙ্গা সদস্য সেখানকার আশ্রয় শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানব পাচারকারী দালালদের মাধ্যমে তারা ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্যে বেশ কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা সদস্যকে সাতক্ষীরা সীমান্তে আনার পর দালালরা তাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। পরে এসব রোহিঙ্গা গ্রামের দিকে ঢুকে পড়েছে। তারাই নানা ধরনের অপরাধের চেষ্টা করছে। এদেরই কারণে জেলাব্যাপী ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি রোহিঙ্গা নাম শুনলেই গ্রামবাসী আতঙ্কিত হচ্ছেন।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান জানান, ছেলে ধরা রোহিঙ্গা বিষয়ে যা প্রচার হচ্ছে তার সবই গুজব। কলারোয়ায় যে দুই নারী ধরা পড়েছেন তারা মূলত ভিখারী। সেখানকার একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তারা ভিক্ষা করেন। গ্রামবাসী তাদের ছেলেধরা রোহিঙ্গা মনে করে আটক করে। প্রকৃতপক্ষে এই কয়দিনে সন্দেহভাজন যে কয়জনের সন্ধান মিলেছে তারা কেউই রোহিঙ্গা নন। এমনকি তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত এমন প্রমাণও মেলেনি। তিনি গুজবে কান না দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ