রবিবার ১১ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

প্রতিবন্ধী তামান্নার কৃতিত্ব

এসএসসি-তেও জিপিএ-৫ পেতে হবে। এটাই তামান্নার ইচ্ছে ও স্বপ্ন ছিল। হ্যাঁ, এ স্বপ্নপূরণে কোনও বাধা ওকে থামাতে পারেনি। অসম্ভবকে সম্ভব করে মেধার স্বাক্ষর রেখে আবারও প্রমাণিত হলো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সাফল্যের পথ আটকাতে পারে না। দুই হাত ও একটি পা নেই তামান্না আক্তার নূরার। আছে একটি মাত্র পা। সেই পা দিয়ে লেখেই এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মেয়েটি। একটি মাত্র পা নিয়েই সংগ্রাম করে আসা তামান্না এ বছর যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া জেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তামান্না নূরার বাবা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউপির আলিপুর গ্রামের রওশন আলী ও মাতা খাদিজা পারভিন শিল্পী। তামান্নার বাবা রওশন আলী জানান, তামান্না জিপিএ-৫ পেয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাংলায় একটু খারাপ হওয়ায় মন খারাপ। এরপরও তামান্নার সার্বিক রেজাল্টে সবাই খুশি। মাত্র একটি পা নিয়ে মেয়েটি সংগ্রাম করে এতদূর এসেছে। তবে মেয়ের রেজাল্টে খুশি হলেও দুশ্চিন্তার অন্ত নেই বাবা রওশন আলীর। কারণ মেয়ের স্বপ্নপূরণ করতে হলে ওকে কলেজে ভর্তি করাতে হবে। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে তেমন ভালো কলেজ বা লেখাপড়ার সুযোগ কম। মেয়েটিকে একটি ভালো কলেজে দিতে গেলে সেখানে কাউকে রাখতে হবে। যেহেতু তার দুই হাত ও একটি পা নেই। তার সঙ্গে সার্বক্ষণিক কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। তাই কীভাবে মেয়েকে লেখাপড়া করাবেন এনিয়ে চিন্তিত তিনি। তবে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও মেয়ের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করবেন বলে জানান তামান্নার বাবা রওশন আলী।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর যশোরের ফাতেমা হাসপাতালে খাদিজা পারভিন শিল্পী একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন; যার দুই হাত ও এক পা দুর্ভাগ্যবশত জন্ম থেকেই নেই। সেই সন্তান তামান্না নূরাকে বুকে চেপে বাড়ি ফেরেন বাবা-মা। সামাজিক অনেক প্রতিকূলতাও মোকাবেলা করতে হয় তাদের। অভাবের সংসার। তারপরও বেড়ে ওঠা শিশুটির চাহনি, মেধা মা শিল্পীর মনে সাহস যোগায়। মায়ের কাছে প্রথমে অক্ষর জ্ঞান নিতে থাকে তামান্না। বাসা থেকে দূরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা সহজ ছিল না। বাসাসংলগ্ন শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজমাইন এডাস স্কুলে তাকে নার্সারিতে ভর্তি করা হয়। মা স্কুলের ক্লাসে বাচ্চাকে বসিয়ে দিয়ে বাইরে অবস্থান করতেন। তার শ্রবণশক্তি ও মুখস্থশক্তি এতো প্রখর ছিল যে, একবার শুনেই বিষয় আয়ত্ব ও মুখস্থ হয়ে যেতো। এরপর অক্ষর লেখা শুরু করে পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে চক ধরে। অতঃপর কলম দিয়ে লেখার আয়ত্ব করে ফেলে সে। বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টানো, আঙ্গুলের ফাঁকে চিরুনি, চামচ দিয়ে খাওয়া, চুল আঁচড়ানো সহজেই আয়ত্ব করে তামান্না। ধীরে ধীরে নিজের ব্যবহারিত হুইল চেয়ারটি এক পা দিয়ে চালাবার দক্ষতাও অর্জন করে প্রতিবন্ধী মেয়েটি। নিজ বিদ্যালয়ে কেজি, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির রেজাল্টে মেধাতালিকার পাশাপাশি এডাস বৃত্তি পরীক্ষায় প্রতিবার সে বৃত্তি পেয়েছে। লেখাপড়ার ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে একই স্কুল থেকে পিইসি ও ২০১৬ সালে বাঁকড়া জেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে জিপিএ-৫ পায় তামান্না। চলতি বছর সে বাঁকড়া ডিগ্রি কলেজে কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
তামান্নার বাবা রওশন আলী ঝিকরগাছার পোয়ালিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার শিক্ষক। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠান এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। ফলে প্রাইভেট পড়িয়ে যা উপার্জন হয় তাই দিয়ে সংসার চলে। এ অবস্থায়ও কষ্ট করে মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে নিয়েছেন। তিনি জানান, মেয়ের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু শারীরিকভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় মেয়েকে বোঝানো হয়, এটা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। মেডিকেলে পড়তে গেলে ব্যবহারিক অনেক কাজ থাকে। তাই তামান্না এখন লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হতে আগ্রহী। রওশন আলী হতাশা ব্যক্ত করে জানান, মেয়ের সেই স্বপ্ন পূরণ করাও তাঁর পক্ষে বেশ কঠিন।
আমাদের সমাজে অনেক বিত্তবান আছেন। ব্যবসায়ী আছেন। তাঁরা রমযানে জাকাত দেন। দান-খয়রাত করেন। অনেক বিদ্যোৎসাহী শিক্ষাবৃত্তি দেন মেধাবীদের। তাঁরা অনায়াসেই প্রতিবন্ধী মেধাবী তামান্নার শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে পারেন। উল্লেখ্য, এসএসসির রেজাল্টের পরের দিন অনেকগুলো দৈনিক ছবিসহ তামান্নার কৃতিত্ব নিয়ে রিপোর্ট করেছে। অদম্য ইচ্ছেশক্তির এ মেয়েটিকে আমরা স্বাগত জানাই। আশা করি, বিদ্যোৎসাহী মহৎপ্রাণ মানুষের অভাব হবে না, যারা তামান্নার লেখাপড়ার খরচ চালাতে সাগ্রহে এগিয়ে আসবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ