রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

৯ দফা দাবিতে উৎপাদন বন্ধ পাটকলগুলোর

স্টাফ রিপোর্টার : বকেয়া মজুরিসহ ৯ দফা দাবিতে রাজপথে পাটকল শ্রমিকরা। খুলনা ও যশোর অঞ্চলের পাটকলগুলো বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। এদিকে রাজধানীর ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার চৌরাস্তা, সুলতানা কামাল সেতুসহ আশপাশে এলাকা অবরোধ করেছে বাওয়ানি জুট মিলস ও করিম জুট মিলস শ্রমিকরা। 

গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে দিনভর যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছ ফেলে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় । দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ । মঙ্গলবারের অবরোধ চলাকালে ৪/৫ গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। অবিলম্বে দাবি মেনে নেয়ার আহবান জানিয়ে শ্রমিক নেতারা অন্যথায় লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন ।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থানে পাটকল শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত আছে । এর আগে দুই দফা আন্দোলনের পর সরকারের আহবানে কাজে যোগ দিয়েছিলেন খুলনাঞ্চলের নয়টি পাটকলের শ্রমিকরা। কিন্তু আশ্বাসের পরও তাদের ১০ সপ্তাহের মজুরি ও তিনমাসের বেতন দেয়নি বিজেএমসি। বাধ্য হয়ে তৃতীয় দফায় রাজপথে নামার কথা জানালেন শ্রমিকরা।

এদিকে বিজেএমসি জানিয়েছে, অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায়’ শ্রমিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন। বিজেএমসি চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ নাসিম বলেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পরই অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসতে পারে। আর অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা এলেই এই আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পড়বে বলে প্রত্যাশা তাদের। বিজেএমসির হাতে টাকা থাকলে দিতে সমস্যা ছিল না। অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে ছিলেন। আমরা তার অপেক্ষায় ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী এখন দেশের বাইরে। তিনি দেশে ফিরলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তিনি দেশে ফেরার পরই ভালো খবর পাওয়া যাবে। দ্রুতই বরাদ্দ পাওয়া বলে আমরা আশা করছি।

অসন্তোষ মেটাতে গত ১৫ এপ্রিল পাটকল শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। শ্রম অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে দীর্ঘ ৮ ঘন্টারও বেশি সময়ের ওই বৈঠক শেষ দাবি পূরণে বিজিএমসি ও সরকারের পক্ষে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। ত্রিপক্ষীয় ওই সমঝোতা চুক্তিতে বলা হয়, আগামী ১৭ মের মধ্যে পাটকল শ্রমিকদের মজুরি ফিক্সেশন (বকেয়া নির্ধারণ) করা হবে। পরদিন ১৮ মে খাতায় উঠবে, অর্থাৎ শ্রমিকদের অনুকূলে মজুরি স্লিপ দেওয়া হবে। এছাড়া ২৫ এপ্রিলের মধ্যে ১০ সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পূর্বেরহারে এবং তিন মাসের বকেয়া পরিশোধ করা হবে। তবে, শ্রমিক নেতাদের দাবি ২৫ এপ্রিল পেরিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুতির কোনোটিই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। তবে, বিজেএমসি বলছে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শবেবরাত উপলক্ষ্যে এক সপ্তাহের মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে। রমজান উপলক্ষ্যেও অধিকাংশ কারখানায় এক সপ্তাহের মজুরি দেয়া হয়েছে।

খুলনা অফিস : বকেয়া মজুরি, মজুরি কমিশন, গ্রাচ্যুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং বদলি শ্রমিকদের স্থায়ীকরণসহ ৯ দফা দাবিতে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে খুলনাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের শ্রমিকরা। বৃষ্টিহীন বৈশাখের তপ্ত রোদে তেতে উঠছে খুলনা শহরের পিচঢালা পথগুলো। তীব্র গরমে রোজা রেখে হাঁপিয়ে উঠেছে মানুষ। ঠিক এমনই মুহূর্তে পাটকল শ্রমিকদের বিক্ষোভ-মিছিল, রাজপথ-রেলপথ অবরোধে উত্তাল হয়ে উঠেছে খুলনার শিল্পাঞ্চল। বৃহস্পতিবার সকালে থেকে টানা পঞ্চমদিনের মতো প্রায় অর্ধ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী যথারীতি কাজে যোগ না দেয়ায় মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

একই দাবিতে বিকেল ৪টা থেকে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী নগরীর খালিশপুর নতুন রাস্তা মোড়ে তিনঘণ্টা রাজপথ-রেলপথ অবরোধ করছে শ্রমিকরা। অবরোধের পাশাপাশি শ্রমিকরা রাজপথে নামাজ আদায় ও ইফতারি করেন।

খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর ও দৌলতপুর জুট মিল, দিঘলিয়া উপজেলায় স্টার জুট মিল, আটরা শিল্প এলাকার আলীম ও ইস্টার্ণ এবং যশোরের নওয়াপাড়ায় অবস্থিত যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রি (জেজেআই) ও কার্পেটিং জুট মিলের শ্রমিকেরা এসব কর্মসূচি পালন করছেন।

গত ৫ মে রোববার থেকে বকেয়া মজুরি পরিশোধের দাবিতে মিলের উৎপাদন বন্ধ রেখে আন্দোলনে নামে বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকেরা। গত বুধবার দুপুরে ঢাকার বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) কার্যালয়ে পাটকল শ্রমিক লীগ ও সিবিএ ও নন সিবিএ'র বৈঠকে ১৩ মে থেকে সারাদেশের পাটকলগুলোতে ধর্মঘট চলাকালে প্রতিদিন বিকেল ৪ টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত রাজপথ-রেলপথ অবরোধ এবং রাজপথে ইফতার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, খুলনাঞ্চলের ৯টি পাটকলে গড়ে প্রতিদিন ১০০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন হয়ে থাকে। সেই হিসেবে গত চারদিনে ৩৫০ মেট্রিকটন পাটপণ্য উৎপাদন বঞ্চিত হয়েছে। পাটকল শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করছে। এতে মিলগুলোর সব ধরনের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

পাটখাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, বকেয়া মজুরি-বেতন পরিশোধ, জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশনের রোয়েদাদ ২০১৫ কার্যকর, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ ও গ্রাচ্যুইটির অর্থ পরিশোধ, চাকরিচ্যুত শ্রমিক-কর্মচারীদের পুনর্বহাল, সব মিলে সেটআপের অনুকূলে শ্রমিক-কর্মচারীদের শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ ও স্থায়ীসহ ৯ দফা দাবিতে হঠাৎ করেই গত ৫ মে দুপুর থেকে একে একে খুলনাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলের উৎপাদন বন্ধ করে দেয় শ্রমিকেরা।

বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগ খুলনা-যশোর অঞ্চলের আহ্বায়ক ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মো. মুরাদ হোসেন বলেন, রমজানেও আমরা রাজপথে থালা-বাসন হাতে ভুখা মিছিল করছি। পথেই নামাজ পড়ছি ইফতার করছি। কয়েক মাস হয় বাজার কাকে বলে জানে না শ্রমিকরা। ছেলে-মেয়েদের মুখে কোনো ভালো খাবার দিতে পারছি না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান এ শ্রমিক নেতা।

জাতীয় মজুরি কমিশন-২০১৫’র রোয়েদাদ, পাটক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ, বদলি শ্রমিক স্থায়ীকরণ, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সব বকেয়া পরিশোধ, শ্রমিকদের প্রতি সপ্তাহে মজুরি পরিশোধসহ বকেয়া মজুরি দেয়া, খালিশপুর ও দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিকদের বিজেএমসির অন্যান্য মিলের মতো সব সুযোগ-সুবিধা দেয়াসহ ৯ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছেন পাটকল শ্রমিকরা। সর্বশেষ গত ২, ৩ ও ৪ এপ্রিল দেশের সব পাটকলে একযোগে ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘট এবং ৪ ঘণ্টা করে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ