শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দ্য প্রফেট- জিবরান  কাহলিল জিবরান

 

মুহাম্মদ নূরে আলম :  (গত সংখ্যার পর) কর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, “আকাঙ্খা ছাড়া জীবন অন্ধকার। কিন্তু জ্ঞান ছাড়া সব আকাঙ্খা অন্ধ। আবার কর্ম ছাড়া সমস্ত জ্ঞান অর্থহীন। কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া সমস্ত কর্মই অসাড়। তুমি যদি ভালোবেসে কোনো কাজ করো তাহলে তুমি নিজের সঙ্গে,- অন্যের সঙ্গে- ¯্রষ্টার সঙ্গে একাত্ম হবে।” আকাঙ্খা, জ্ঞান, কর্ম, ভালোবাসা ও ¯্রষ্টার  মধ্যে কোনো পার্থক্য রেখা টানা যায় না। আকাঙ্খা, জ্ঞান, কর্ম ও ভালোবাসার মধ্যেই বাস করেন ¯্রষ্টার।

আত্মজ্ঞান সম্পর্কে বলেন, “এ কথা বল না যে আমি সত্য খুঁজে পেয়েছি, বরং বল যে আমি ‘একটি’ সত্য খুঁজে পেয়েছি।” (ঝধু হড়ঃ “ও যধাব ভড়ঁহফ ঃযব ঃৎঁঃয,” নঁঃ ৎধঃযবৎ “ও যধাব ভড়ঁহফ ধ ঃৎঁঃয.” এ কথা বল না যে “আমি আত্মার পথের সন্ধান পেয়েছি” বরং বল, “পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি আত্মার সাক্ষাৎ পেয়েছি।” (ঝধু হড়ঃ, “ও যধাব ভড়ঁহফ ঃযব ঢ়ধঃয ড়ভ ঃযব ংড়ঁষ.” ঝধু ৎধঃযবৎ, “ও যধাব সবঃ ঃযব ংড়ঁষ ধিষশরহম ঁঢ়ড়হ সু ঢ়ধঃয.”)। অনেকগুলো সত্যের মাত্র একটি আমি পেয়েছি। সত্যে পৌঁছানোর ভিন্ন ভিন্ন পথ রয়েছে। আমাদের হয়তো একটি বা দুটি পথ জানা আছে। অন্যগুলো অজানা। ধর্ম সম্পর্কে বলেন, “সমস্ত কাজ ও প্রতিবিম্বই কি ধর্ম নয়? কে কাজ থেকে তার ধর্মকে আলাদা করতে পারে? অথবা তার পেশা থেকে তার বিশ্বাসকে?” (ওং হড়ঃ ৎবষরমরড়হ ধষষ ফববফং ধহফ ৎবভষবপঃরড়হ? ডযড় পধহ ংবঢ়ধৎধঃব যরং ভধরঃয ভৎড়স যরং ধপঃরড়হং ড়ৎ যরং নবষরবভ ভৎড়স যরং ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ?) কবির কাছে কাজ ও পেশাই ছিল প্রতিটি মানুষের ধর্ম।

জনৈক মহিলা যখন তাঁর কাছে সুখ-দুঃখ সম্পর্কে জানতে চান তিনি বলেন, সুখ-দুঃখ পরস্পরের পরিপূরক। সুখ থেকে দুঃখ আলাদা করা যায় না। তারা একই সঙ্গে আসে “ধহফ যিবহ ড়হব ংরঃং ধষড়হব রিঃয ুড়ঁ ধঃ ুড়ঁৎ নড়ধৎফ, ৎবসবসনবৎ ঃযধঃ ঃযব ড়ঃযবৎ রং ধংষববঢ় ঁঢ়ড়হ ুড়ঁৎ নবফ.” যখন একজন তোমার সঙ্গে টেবিলের কাছে একাকী বসে আছে, মনে রেখ অন্যজন তোমার বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে।

বাস্তব জীবনে দেখা যায়, আমরা একটু নির্ভশীলতার সুযোগ পেলেই হাল ছেড়ে দেই। অন্যের উপর সঁপে দেই নিজের সবকিছু। তিনি যে বাস্তববাদী কবি ছিলেন তারই একটি প্রমাণ পাওয়া যায় নিচের উদ্ধৃতিতে। বিবাহ নামক কবিতায় তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের হৃদয় বিনিময় করো কিন্তু একে অপরের হাতে সঁপে দিও না।

প্রতিনিয়তই মানুষ একজনের দর্শন দ্বারা অন্যজনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এমনকি পরিবারও তার বাইরে নয়। বাবা তার চিন্তা-ভাবনা সন্তানদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু জিবরান বলেছের ভিন্নকথা, সন্তানদের তোমরা ভালোবাসা দিতে পারো কিন্তু তোমাদের ভাবনা তাদের দিতে পারো না। কারণ তাদেরও নিজস্ব ভাবনা রয়েছে।

দান কবিতায় তিনি ধন-সম্পদ দানের চেয়ে নিজের আত্মাদান করাকে উত্তম দান বলেছেন। কারণ, মানুষ যখন ধন-সম্পদ গরিব-দুস্থদের মাঝে দান করে সেটা মহত্ব অল্প সময় থাকে। কিন্তু একজন মানুষ যখন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেন তখন তিনি চির অমর হয়ে থাকেন। আর এই বেঁচে থাকাটাই আসলে প্রকৃত বাঁচা। তাইতো তিনি বলেছেন, ‘তুমি যখন ধন-সম্পদ দান করো সেই দান এক ক্ষুদ্র দান, কিন্তু যখন আত্মদান করো সে দানই আসল দান’।

কতো আগেই জিবরান বাস্তব জীবনের কথা বলে গিয়েছেন। বর্তমান সময়ে দানের বিষয়টি হয়ে গেছে আত্মপ্রচারের মাধ্যম। সবাই আত্মপ্রচার চাই। আমি এটা, ওটা দান করছি সেটা মানুষ জানুক। আমার দানের বিষয়টি সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক এটা সবাই চাই। এই চাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন কবি। কারণ, এরকম প্রত্যাশা দানকে কলুষিত করে। তিনি বলেন, ‘যারা অন্তরের আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে দান করে তাদের গোপন বাসনা তাদের দানকে কলুষিত করে’।  একজন মানুষ যে কাজই করুক না কেন সে যেনো তার কাজকে ভালোবেসে করে। তিনি বলেছেন, ‘ভালোবেসে কাজ করাটা হচ্ছে তোমার হৃদয় থেকে সুতা বের করে কাপড় বোনা। যেনো তোমার প্রিয়তমা পরবে সে কাপড়’। কাজের প্রতি অবহেলা আমাদের রয়েছেই, যার কারণে আমাদের কাজ শেষে ভালো ফলাফল পাই না। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, অযতেœ রুটি সেঁক দিলে সে রুটি পুড়বেই। মানুষ পোশাক পরে লজ্জা নিবারণ করার জন্য। কটু দৃষ্টি প্রতিহত করার জন্য। অশালীনতা থেকে বিরত থাকার জন্য। কিন্তু মাঝে মধ্যে রাস্তাঘাটে এর বিপরীত দৃশ্যও লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেছেন, পোশাক হচ্ছে অসচ্চরিত্র মানুষের দৃষ্টি প্রতিহত করার একমাত্র ঢাল। জিবরান তার প্রফেট কাব্যগ্রন্থে পুঁজিবাদেরও বিরোধিতা করেছেন। ব্যবসায়ীরা যারা সস্তা দামে পণ্য কিনে পরে চড়া দামে বিক্রি করে তাদের এসব থেকে বিরত থাকার আহ্বান করেছেন। তিনি ক্রয়-বিক্রয়ের সুবিচার করার কথা বলেছেন। যদি না করা হয় তাহলে এক শ্রেণীর মানুষ হবে লোভে উন্মত্ত এবং অন্যরা হবে অভুক্ত। বাস্তব জীবনে আমরা এখন তাই দেখতে পাচ্ছি। আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি দারুণ কথা বলেছে। তিনি বলেছেন, আইন যেনো বালির স্মৃতিসৌধ না হয়ে যায়। যে আইন করা হবে সেটা হবে সবার জন্য সমান এবং প্রযোজ্য। সূর্যকে পেছনে ফিরে তাকালে যে ছায়া দেখা যায় তাই হচ্ছে আইন।

প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে যুক্তি এবং আবেগ থাকা দরকার। আবেগ দিয়ে যেনো যুক্তিকে না ভাঙা হয় বরং যুক্তি দিয়ে আবেগকে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। কারণ, আবেগ হচ্ছে একটি জাহাজের পাল আর যুক্তি হচ্ছে জাহাজের হাল। আবার আবেগ মানুষের হৃদয়ে অগ্নি শিখার মতো কাজ করে। তিনি বলেছেন, আবেগ হচ্ছে এমন এক অগ্নিশিখা যে জ্বলে পুড়ে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়। বন্ধু নির্বাচনে নানা সময় আমরা ভুল করি। বন্ধু এমন মানুষকে নির্বাচন করতে হবে যাকে সবসময় পাশে পাওয়া যায়। সেই তোমার বন্ধু যার কাছে তুমি গেলে শান্তি পাও।

কবি জিবরান এতো চমৎকার চমৎকার কথা বলে গেছেন যেগুলো আমরা বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারি। উপকৃত হতে পারি আমি, আপনি, আমরা। কারণ, এই কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি লাইনই মানব জীবনের কোন নাকোন মুহূর্তের সঙ্গে জড়িত। আর এই সব উপদেশ দিয়ে একজন মানুষ জীবনে উন্নতিসহ সত্যিকারের মানুষ হিসেবে নিজে আবিষ্কার করতে পারে। নির্বাসন দ-ে দ-িত কবির খুব ইচ্ছা ছিলো, জীবিত অবস্তায় দেশে ফেরার। কিন্তু তিনি জীবিত ফিরতে পারেননি। ১৯৩১ সালে ১০ এপ্রিল তার জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর পরে তাকে দেশে আনা হয়। সেদিন বৈরুত সমুদ্র বন্দরে হাজার হাজার অশ্রুসিক্ত মানুষ তাকে বরণ করে নেয়। তিনি দেশ ছাড়ার আগে বলেছিলেন, ‘ঋড়ৎমবঃ হড়ঃ ঃযধঃ ও ংযধষষ পড়সব নধপশ ঃড় ুড়ঁ’। তিনি কথা রেখেছিলেন। তিনি দেশে ফিরে এসছিলেন বীরের বেশে।

আইন সম্পর্কে আইনজীবীকে বলেন যে, “তোমরা আইন তৈরি করতে আনন্দ পাও, তারচেয়েও বেশি আনন্দ পাও আইন ভাঙতে। যেমন শিশুরা মনোযোগের সাথে বালির ঘর তৈরি করে, কিন্তু সে ঘরটি ভাঙতে তারা আনন্দ বোধ করে। কিন্তু তুমি যখন বালির ঘর তৈরি করো, সমুদ্র আরো বালি তটে নিয়ে আসে। এবং যখন তুমি সেগুলো ধ্বংস করো তখন সমুদ্র তোমার দিকে চেয়ে হাসে। সমুদ্র সব সময় নিষ্পাপদের সঙ্গে হাসে”। “কিন্তু যাদের জীবন সমুদ্রের মতো নয় এবং মানুষের তৈরি আইন যদি বালির ঘর না হয়, তখন কি হবে?

যুক্তি ও আবেগ সম্পর্কে বলেন, ‘তোমার আত্মা একটা যুদ্ধক্ষেত্র সেখানে তোমার যুক্তি ও সিদ্ধান্ত তোমারই আবেগ ও বাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত আছে। তোমার যুক্তি ও আবেগ সমুদ্রগামী তোমার আত্মার হাল ও পাল।’ সে হাল ও পাল যদি ভেঙে পড়ে তাহলে তুমি দিগভ্রান্ত হয়ে পড়বে কিংবা সমুদ্রের মাঝখানে আটকে থাকবে। মানুষের জীবনে আবেগের সঙ্গে যুক্তির সহাবস্থানের প্রয়োজন আছে। তাই জিবরান বলেন ‘¯্রষ্টার যুক্তির মাঝে বাস করেন’ ‘আবেগের মধ্যে চলেন।’ তাই “তোমাদেরও যুক্তি ও আবেগের মধ্যে বাস করা উচিত।”

আনন্দ বেদনা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে প্রফেট বলেন, সুখ দুঃখ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। যে স্বর্ণ পরে মানুষ সুখ পায়, আভিজাত্য পায় তাকে কি কম পুড়তে হয় স্বর্ণকারের কাছে। যেই বাঁশির সুর শোনে আমরা বিমোহিত হই, সেই বাঁশিতে কি ছুরির ধারালো আঘাত পড়ে নি। এই কারণে আল মুস্তফা বলছেন, যখনই তোমার সুখ দেখ, একটু ভালো করে অনুসন্ধান করলেই বুঝতে পারবে কোন না কোন দুখ পেয়ে তুমি এই সুখ পেয়েছ।। ঝড়সব ড়ভ ুড়ঁ ংধু, ঔড়ু রং মৎবধঃবৎ ঃযধহ ংড়ৎৎড়,ি ধহফ ঙঃযবৎং ংধু, হধু, ংড়ৎৎড়ি রং ঃযব মৎবধঃবৎ. ইঁঃ ও ংধু ঁহঃড় ুড়ঁ, ঃযবু ধৎব রহংবঢ়ধৎধনষব. কেউ বলে, দুঃখের চেয়ে আনন্দ বড়, আবার কেউ বলে- না, দুঃখই বড় আনন্দের চেয়ে। আর আমি বলি, এ দুই অবিভাজ্য।

এবার আলমিত্রা শেষ প্রশ্নটি করলেন। মৃত্যু নিয়ে। আল মুস্তফা বললেন, জীবনকে ঠিকমতো চিনতে পারলে মৃত্যুকে চেনা যাবে। শীতকালে যে বীজ কল্পনাও করতে পারেনা অঙ্কুরোদগমের, সেই বীজই বসন্তে চারা হয়ে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসে। তাহলে মৃত্যু কি আরেক জীবন। এক জীবনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে কি আরেক জীবনের বন্ধন খুলে যাবে? কে জানে?? সন্ধ্যা হয়ে গেল। আল মুস্তফাকে যেতে হবে। তবে চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়। মৃত্যু হয়তো বাহ্যিকভাবে আড়াল করে দিতে পারে তাদেরকে কিন্তু অন্তরের বোধ তো অপার ক্ষমতাবান। ঠিকই ফিরিয়ে আনবে প্রফেটকে।।

তিনি জাহাজে উঠলেন। ঘুরে ওরফালেজবাসীর দিকে ফিরে বললেন, “যখন আমার কণ্ঠস্বর তোমাদের কানে অস্পষ্ট হয়ে আসবে এবং আমার ভালোবাসা যখন তোমাদের মন থেকে মুছে যাবে, তখন আমি আবার আসব। তখন আরো অন্তরঙ্গতার সঙ্গে এবং উচ্চকণ্ঠে আমি তোমাদের সাথে কথা বলব। জোয়ারের জলের সাথে আমি আবার আসব। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ