শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কবি বন্দে আলী মিয়ার বাড়িতে একদিন

আবদুল হালীম খাঁ : স্কুল জীবন থেকেই যখন কোনো কবির কবিতা পড়তাম তখন সেই কবির জীবনী জানতে খুব ইচ্ছে করতো। যাদের কবিতা বেশি ভালো লাগতো তাদের লেখা আর কি কি কবিতা ও বই আছে সে সব খুঁজে খুঁজে পড়ার চেষ্টা করতাম। আমার যে সব কবির কবিতা ভালোলাগতো তাদের মধ্যে একজন ছিলেন কবি বন্দে আলী মিয়া। অতি সহজ সরল ভাষায় তিনি গ্রাম বাংলার দৃশ্য কবিতার ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা পাঠ মাত্র হৃদয়ে লেগে যায়। বুঝার জন্যে চিন্তা করতে হয় না, ব্যাখ্যারও প্রয়োজন পড়ে না। যেমন:

আমাদের ছোট গ্রাম ছোট ছোট ঘর

থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর।

পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই

এক সাথে খেলি আর পাঠশালে যাই।...

আর তাঁর ‘কলমিলতা’। এই সব কবিতা কতবার যে পড়েছি তার হিসাব নেই। পড়তে পড়তেই মনের অজান্তেই মুখস্থ হয়ে গেছে। তার বিখ্যাত কবিতা ‘ময়না মতির চর’ কলেজে আমাদের পাঠ্য ছিল। সেই কবিতাটি পড়ে তাঁর ‘ময়নামতির চর’ কাব্যটি কিনেছিলাম। কী অপরূপ আকর্ষণীয় বর্ণনা:

বরষার জল সরিয়া গিয়াছে জাগিয়া উঠেছে চর

গাঙ শালিকেরা গর্ত খুঁড়িয়া বাঁধিতেছে সবে ঘর।

গহীন নদীর দুই পাড় দিয়া আঁখি যায় যত দূরে

আকাশের মেঘ অতিথি যেন গো তাহার আঙিনা জুড়ে।

মাছরাঙা পাখি এক মনে চেয়ে কঞ্চিতে আছে বসি

ঝাড়িতেছে ডানা বন্য হংস-পালক যেতেছে খসি।

এই যে দৃশ্য এ কতোই না মনোহারিনী, কতই বস্তুনিষ্ঠ, কতই চিত্রধর্মী। এ ধরনের দৃশ্যের সঙ্গে যার নাড়ীর যোগ আছে এক মাত্র তারই পক্ষে ভাষার তুলিতে এ দৃশ্যের মনোরম চিত্র অংকন করা। শুধু কি তাই? এই চিত্রের সঙ্গে মানুষের চিত্র অনুরূপভাবে তিনি অনায়াসে এঁকেছেন। যেমন:

দুপুরে যেদিন নেমেছে সন্ধ্যাÑ মেঘেতে ঢেকেছে বেলা,

গাঁয়ের মেয়েরা ঘাটে পানি নিতে আসিতে করে না হেলা।

কেহ আসে একা-দল বেঁধে কেহÑ চলে তারা তাড়াতাড়ি,

পথে যেতে যেতে খুলে দিয়া গরু তাড়াইয়া আনে বাড়ি।

গোয়ালের পাশে শুকনো যে খুঁটে ধামায় ভরে তা লয়,

কঞ্চির বেড়া ধরিয়া বধূরা প্রিয়-পথ চেয়ে রয়।...

ময়নামতির বট গাছ, হাসু খালির চর, বর্ষার মাঠ, শাকতোলা বুড়ি, বড় বুবু, নানা আর নানী, শিকারী ফৈজু প্রভৃতি কবিতায় গ্রাম বাংলার একটি বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠেছে। এমন বাস্তব চিত্র অথচ সরস বাংলা কাব্যে আর মিলে না।

১৯৬৪ সালে ভূইয়াপুর কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দেবার পর ঘুরে বেড়ানোর একটা সুযোগ পেলাম। পাবনা শহরে এক ভাইয়ের কর্মস্থলে বেড়াতে গিয় প্রায় এক মাস ছিলাম। কবি বন্দে আলী মিয়ার বাড়ি পাবনা জেলার রাধানগর গ্রামে তা আমার জানা ছিল । কিন্তু তখন অন্য ব্যস্ততায় কবির কথা মনে ছিল না। শহরে মহসিন নামে এক ভদ্রলোকের পরিচয় হয়েছিল। একদিন কথায় কথায় তিনি জানালেন কবি বন্দে আলী মিয়ার বাড়ি তো এই শহরের উত্তর পাশের রাধা নগরে। একবার গিয়ে দেখে আসতে পারেন। তিনি কবির যৌবনকালের অনেক মজার মজার ঘটনাও আমাকে শোনালেন। 

তখন মনে পড়লো ইচ্ছেগুলো জেগে ওঠলো। প্রিয় কবিকে দেখার তীব্র বাসনা জাগলো। এতো কাছে কবিকে দেখতে যাবো না? আমি থাকতাম শহরের উত্তর পাশে নির্মাণাধীন আজম খান ডিগ্রি কলেজের পাশের এক বাসায়। বর্তমানে সে কলেজের নাম কি হয়েছে জানি না।

তখন নবেম্বর মাস।

দিন তারিখ মনে নেই। সকাল ৯টায় কবির বাড়ির দিকে রওনা হলাম। মহসিন কবির চেহারা, তাঁর বাড়ি এবং রাস্তার যে বর্ণনা দিয়ে ছিলেন তাতে কাউকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলাম না। শহরের উত্তর পাশের একটা নিচু কাঁচা রাস্তা উত্তর দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তা দিয়ে কিছু দূর অগ্রসর হলে পশ্চিম দিকে একটি পায়ে চলা সরু রাস্তা, তার দু’পাশে বড় বড় গাছ-গাছালি। পাখি ডাকা ছায়া ঢাকা বনাঞ্চল। রাস্তায় কোনো লোকজনের সঙ্গে দেখা হলোনা। একেবারেই নিরিবিলি নীরব নিঝুম এলাকা। এ পথে পশ্চিম দিকে কিছু দূর অগ্রসর হলেই রাস্তার সঙ্গেই লাগা দক্ষিণ পাশে একটি বাড়িÑ একটি নতুন টিনের ঘর। তার উত্তরের অর্থাৎ রাস্তার দিকের দরজাটি খোলা। বাইরে থেকে ভেতর দেখা যায়। দেখলাম একটি টেবিলের দু’পাশে দুজন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা লোক। কি যেনো আলাপ করছেন। একজন মজবুত স্বাস্থ্যের অধিকারী। মাথার ঝাকড়া বাবরি। উঁচু নাক। সুন্দর চেহারা। দেখে মনে হলো ইনিই আমার প্রিয় কবি বন্দে আলী মিয়া। আমাকে দরজার কাছে দেখে ডাক দিলেন, কে ভেতরে আসুন। আমি সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম, আমার বাড়ি টাঙ্গাইল, ভূইয়াপুর কলেজে পড়ি। যদিও তাঁকে আমার চেনার বাদ ছিল না তবু বললাম আপনি কি কবি বন্দে আলী মিয়া? কবি মিষ্টি করে হাসলেন, একেবারেই সাদা মন প্রাণের হাসি। তিনি কিছু বলার আগেই পাশের ভদ্রলোক বললেন, উনিই কবি বন্দে আলী মিয়া। কবির সহজ সরল মিষ্টি হাসি দেখে মনে হলো এমনি সরল প্রাণের অমল হাসি যিনি হাসতে পারেন তাঁর পক্ষেই তো সম্ভব ‘আমাদের গ্রাম’টির মোত এতো সহজ সুন্দর কবিতা লেখা। আরবী কবি জীবরান খলীল জীবরান বলেছেন, ‘নির্দোষ লোকেরাই হাসতে পারে।’

ভূইয়াপুরের নাম শুনে কবি সাহেব বললেন, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর জন্ম ভূমি ভূইয়াপুর, তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজ ভূইয়াপুর কলেজ। তিনি তো অনেক উঁচু মানের সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ সেবক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তা কি নাম তোমার? আমাকে দেখতে এসেছো, লেখালেখি করো অবশ্যি। আমার নাম আব্দুল হালীম খাঁ। জী, লেখালেখি কিছু করি। কোন পত্রিকায় লিখছো? পাক্ষিক হিতকরী, পাক্ষিক যমুনা, মাসিক অগ্রদূত, মাসিক খেলাঘর, মাসিক পাবনা, সাপ্তাহিক পাকিস্তানী খবর, মাসিক আল ইসলাহ, মাসিক মোহাম্মদী মাসিক বুলবুল (কলকাতা)। অনেক পত্রিকায়ই লিখছো দেখছি। তা বেশ লেখা চালিয়ে যাও। মনে রেখো, আমাদের দেশে যারা বড় সাহিত্যিক তারা নবীনদের কোনো সাহায্য সহযোগিতা করেন না, খোঁজ খবর নেন না...। এজন্যে তোমার থেমে গেলে চলবে না। কারো আশায় বসে থেকো না। নিজেই নিজের উৎসাহ দাতা হও। তোমরা নতুন কাব্য সাহিত্য সৃষ্টি করো। তোমাদের গল্প কবিতায় যেনো এদেশের গ্রাম বাংলার মানুষের কথা থাকে এবং থাকে তাদের মুখের ভাষা।

দোআ করবেন স্যার। বলেই আমার হাতের ডাইরিটি তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, কিছু লিখে দিন স্যার। তাঁর হাতে কলম ছিল না। আমার কলমটি তাঁর হাতে দিলাম। তিনি কি এক মিনিট ভেবে লিখলেন:

আমার যত কবিতা গল্প গান

রেখে যাচ্ছি তোমাদের কাছে,

আমি তো জানি না, তোমরা বলিও

এর মূল্য কতটুকু আছে।

তোমরা লিখিও নতুন কাব্য

ওগো আগামী দিনের কবি,

তোমাদের লেখায় ফুটে ওঠে যেনো

এই গ্রাম বাংলার ছবি।

এরপর তাঁর হাত থেকে ডাইরিটা নিয়ে বললামÑ এখন উঠি। দোআ করবেন। কবি আবার মধুর হাসি উপহার দিয়ে বললেন, বাসায় কেউ নেই। তোমাকে কি দিয়ে আপ্যায়ন করি। তুমি এখন থাকো দুপুরে ভাত খেয়ে যাবে। এখন আপনার আর সময় নষ্ট করবো না। কবি বললেন, একটু বসো তো দেখি, বলেই তিনি ভেতরে গিয় খোঁজাখুঁজি করে দুটি বই হাতে নিয়ে এলেন- একটি ‘অনুরাগ’ কাব্য এবং অন্যটি ‘জাগ্রত যৌবন’, পড়ে দেখো বলে বই দুটিতে নাম স্বাক্ষর করে দিলেন।

কবিকে সালাম দিয়ে পথে আসতে আসতে ভাবলাম, এই মহান কবি সারাজীবন অবিরাম লিখেছেন। তার প্রকাশিত কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, জীবনী গ্রন্থ গান একশতের উপরে বইয়ের সংখ্যা, ছবিও এঁকেছেন অনেক। অথচ তাঁকে নিয়ে কেউ একটি বইও লিখেননি, এমন কি তাঁর সাহিত্য কর্মের ওপর কেউ জীবিতকালে একটি প্রবন্ধও লিখেননি। উভয় বাংলায় খ্যাতিমান কবি হওয়া এবং বিপুল পরিমাণ সাহিত্যকর্ম থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো পুরস্কার বা সংবর্ধনাও পাননি। এর একমাত্র কারণ তিনি কোনো রাজনৈতিক দল বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠির মতবাদের ধারে কাছে যাননি, কোনো দলের মতবাদের প্রচার করেননি। আজকাল আমাদের সমাজের অনেক নবীন ও প্রবীণ লেখকরা বিশেষ কোনো দলের একটু করুণা লাভের জন্যে, একটা রুটি ও একটু হালুয়ার লোভে একবার ডানে আরেকবার বামে কাত হচ্ছেন। নিজেরাই নিজেদের ঢোল বাজাচ্ছেন। কতটুকুই মূল্যবান এমন তাঁদের সাহিত্য কর্ম!

কবি বন্দে আলী মিয়া বলেছেন: “আমার সাহিত্য কর্মের যদি সত্যিকার মূল্য না থাকে তবে তোমরা যদি তা সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দাও তবু তার মূল্য হবে না। আর যদি আমার সাহিত্যের মূল্য থাকে তবে তোমরা হাজারবার উপেক্ষা-অবহেলা করলেও একদিন তার মূল্য হবে। কারণ সত্যিকার মূল্যায়ন যাচাই করবে মহাকাল।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ