শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মাফ করো

অয়েজুল হক : প্রচন্ড ভ্যাপসা গরমের পর আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ। রাত বেড়েছে। ঝড় বৃষ্টি হতে পারে। আবুল মিয়া বড় বাজারের বড় দোকান আবুল স্টোরের ঝাপ টেনে বাড়ির পথ ধরেন। রোজার মাস শুরু হয়েছে। রোজার মাস নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। সারা বছরের ব্যবসা এক মাসে পুষিয়ে নেওয়ার একটা বড় সুযোগ হয়! তোড়জোড়, সরকারি আইন কানুনে দমিয়ে রাখা যায়না দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। কিভাবে পারবে! শত শত আবুল মিয়া একজোট। মাঝেমধ্যে টিসিভির ট্রাকে মাল বিক্রি করতে দেখে আবুল মিয়ার হাসি পায়। ফিক করে হেসে ওঠেন। মনে মনে বলেন ওসবে লাভ হবেনা। সবেতো শুরু। আশায় আছেন মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের একটা বাড়ি মারবেন। শেষ দিকে দেব বাড়ি কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই চোখে পড়ে তার পাশে হেঁটে যাওয়া পিকুল। থমকে দাঁড়ায়।

-বাড়ি দেবেন! শেষ দিকে?

-হু।

আবুল মিয়ার কথায় রেগে ওঠে পিকুল। বখাটে হিসাবে এলাকায় তার বেশ নামডাক। উঠতি বয়সের ছেলে মুরব্বীদের সম্মান করতে শেখেনি।‘ শেষ দিকে বাড়ি দেবেন ক্যান, এখনই দেন’

-এখন দেয়া যাবেনা। ঝামেলা আছে।

-এখন বাড়ি দেয়া যাবেনা, সুযোগ বুঝে বাড়ি দেবেন!

আবুল মিয়া সহজ ভাষায় জবাব দেয়, হ্যাঁ।

আবুল মিয়ার হ্যাঁ শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে যেতেই ধুপধাপ করে কিলঘুঁষি পড়তে শুরু করে। চোখ মুখ বুক পিঠ- ঘুষি আছড়ে পড়ে একর পর এক। আবুল মিয়া চিৎকার করেন। পিকুলও হাসফাস করে বলতে থাকে, ওরে শালা বুড়া আমারে বাড়ি দিবি! সুযোগ বুঝে বাড়ি দিবি! আজ তোরে মাইরাই ফালামু।

আশেপাশের বেশ কিছু লোক চিৎকার শুনে ছুটে এসে পিকুলের হাত থেকে আবুল মিয়াকে এ যাত্রায় রক্ষা করলেও যাবার সময় পিকুল বলে যায়, তোরে আমি দেখে নেব।

ল্যাম্পপোষ্টের মৃদু আলোয় আবুল মিয়ার হাত ধরে বাড়ি পৌঁছে দেন কয়েকজন ভদ্রলোক। প্রতিবেশী নজরুল সাহেব বলেন, এসব পুলাপানের সাথে ঝগড়া করতে হয়না।

আবুল মিয়া বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে বলে, ভাই সে আমারে খালি খালি মরছে।

-শুধু শুধু কেউ কেউ কাউকে মারে?

-আমি বলেছি, শেষ সময়ে দেব বাড়ি। সে ভাবছে তারে বাড়ি দেব। ওরে আমি বাড়ি দিতে যাবো ক্যান। ওরে বাড়ি দিয়ে কী মরবো! 

কৌতূহল নিয়ে নজরুল জানতে চান, শেষ সময়ে কাকে বাড়ি দেবেন?

আবুল মিয়া আৎকে ওঠেন। একবার এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কিলঘুঁষি খেয়েছেন। প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, বাড়ি দেব মানে বাড়ি দেব। মানে বাড়ি দেব...

-তো তো করে শুধু বাড়ি দেব বাড়ি দেব করছেন কেন? 

নজরুল সাহেবের ক্ষ্যাপাটে গলা। যে কোন সময় কিলঘুঁষির ঝড় বইতে পারে। আবার। আবুল মিয়া কাঁদো কাঁদো সুরে বলে, ভাই এ বাড়ি সে বাড়ি না।

-কোন বাড়ি?

আবুল মিয়া বুদ্ধি খাটিয়ে বলে, এই যে আমার বাড়ি। দেখেন। দোতলার কাজ শুরু করবো ঈদের পর।

নজরুল সাহেব কিছুটা রাগ নিয়ে চলে যান। হয়তো মনে মনে ভবেন বয়সের সাথে সাথে পাগল হতে চলেছেন। ব্যাথায় আবুল মিয়ার সারা শরীর কুকড়ে ওঠে। বাড়ি ঢুকতেই বউয়ের ঝাড়ি, এতো রাত হলো যে?

আবুল মিয়া ক্যা ক্যু করে বলেন, আর বলোনা এসেছি এই তো সৌভাগ্য। 

-ইস কী আমার সৌভাগ্য রে! তোমাকে আসতে বলেছে কে? যাও। যেখানে খুশি, মন চায় চলে যাও।

মেয়েটার বিয়ের পর থেকে শামীমা বেগম কেমন খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছেন। সন্তান বলতে ঐ একটাই মেয়ে। আজকাল বাড়িটা খা খা করে। বউয়ের ঝাড়িতে আবুল মিয়ার কাতরানি বেড়ে যায়। কাতরানি দেখে ভদ্র মহিলার রাগ কমবে কী আরো বাড়ে, ঘরে ঢুকেই ক্যা ক্যু করছো কেন?

আবুল মিয়া অসহায়ের মতো বলেন, বাড়ি আসতে পড়ে গেলাম।

-ধবধবে শুকনো রাস্তায় কেউ পড়ে যায়?

-পড়ে গেলে আর কী করা যাবে....

শামীমা বেগম আপন মনে থগর বগর করতে থাকেন। আবুল মিয়া জানেন বউয়ের মেজাজ দ্রব্যমূল্যের মতো ক্রমাগত বাড়বে। সময় নষ্ট না করে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে হবে। সামনে শুধু লাভ আর লাভ। বাথরুমের ঠান্ডা পানিতে কিছুক্ষণ ধুলাময় শরীর পরিষ্কার করেন। গোসল সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দেন। বড্ড ক্লান্ত। আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিটি স্থান ব্যাথার তীব্র অনুভূতি হয়ে জানান দেয় - সে যেন সহজে যাবেনা! 

মেয়েটা ফোন করেছে। রিসিভ করতেই ওপ্রান্তে মেয়ের বিমর্ষ গলা, বাবা তোমার জামাই হঠাত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। 

অবাক হয়ে আবুল মিয়া প্রশ্ন করেন, কী বলিস! 

- হু, এখন কী করি! বাসায় আমি ছাড়া কেউ নেই। 

- কী হয়েছে! 

- ঠিক বলতে পারছি না। সে আমাকে চিনতে পারছে না।

- মানে!

- হু, অফিস থেকে ফিরেই আবোল তাবোল বলছে। 

- কী বলছে!

- আমি কে? আমি খুনী। আমি ডাইনি। আমি নাকি তাকে মেরে ফেলবো....

হঠাত চিৎকার শোনা যায়। আমাকে মেরে ফেলার জন্য লোক ডাকছো। আমি চলে যাচ্ছি। পালিয়ে যাচ্ছি। 

ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয়। আবুল মিয়া কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। কী করবেন, কী করা দরকার! কয়েকবার ফোন দিলেও ওপাশে সাড়া মিলেনা। কী হচ্ছে জানা দরকার। বেশ কয়েকবার কল দেবার দেবার পর রিভিস করে শীলা। আবুল মিয়া উদ্বিগ্ন গলায় বলেন, কিরে ফোন ধরিস না কেন! ব্যস্ত নাকি?

- হু।

- কোথায়? 

শীলার হাফানো গলা। বলে, ওর পেছন পেছন ছুটছি।

- হঠাৎ কী হলো! 

- তোমাকে না বললাম কিছুই জানি না। 

- কোথায় ছুটছিস!

- মিরপুরের কাছাকাছি চলে এসেছি সম্ভাবত।

আবার লাইন কেটে দেয়। শামীমা বেগম সব শুনে অস্থির। এ রুম ও রুম করছেন। বয়স হয়েছে, না হলে তিনিও মেয়ের সাথে জোট বেধে গভীর রাতে জামাইয়ের পেছন পেছন দৌঁড়াতেন। প্রায় একঘন্টা পর শীলা ফোন করে, পেরেছি বাবা। কন্ঠে খুশির সুর। 

- কী পেরেছিস!

- পুলিশে ধরেছে।আপতত থানায় আছে। আমার দিকে কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে।

আবুল মিয়া, শামীমা বেগম কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। ঘুমহীন রাত পার হতে থাকে। শেষরাতের দিকে দমকা হাওয়া। বাতাসের ঝাপটায় যেন দুলতে থাকে বাড়ি ঘর। বাতাস না যেন আগুন। জমানো আশা জমিয়ে রাখা পণ্যগুলোর গায়ে আগুন ধরিয়ে বিরাট মুনাফা করবেন। মনে হচ্ছে বাজারের দোকান লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। মিশে যাবে বাড়িঘর। খিটখিটে বউ পাশে এসে বসে। চোখের পাতায় জড়তা, ভয়। মায়াবী গলায় বলে, ওগো যদি মরে যাই ক্ষমা করে দিও। একসাথে অনেক বিপদ ঘিরে ধরেছে। 

ছাদের ওপর হুড়মুড় শব্দ হয়। কি একটা গাছ ভেঙে পড়েছে। আবুল মিয়া আতংকিত, বাকরুদ্ধ। ভাবেন কখন না জানি ছদটাই ভেঙে পড়ে।ওপরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলেন, আর বাড়ি দেবনা, মাফ করো মালিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ