শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

জাতীয় কবির  নামে বিভ্রান্তি

 

শেখ দরবার আলম : ॥ এক ॥ অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ সাহেব সিএ, ভবন ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫, এই ঠিকানাস্থিত প্রথমা প্রকাশন থেকে ২০১৮’র ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তার নজরুল বিষয়ক একটি গ্রন্থের শিরোনাম দিয়েছেন ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল জীবনী। তার এই গ্রন্থের শিরোনাম এবং তার লেখা ভূমিকা থেকেই স্পষ্ট যে, সাম্য ও সহাবস্থানের কবি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামটা তিনি দেখতে ও দেখাতে চাননি। কবিকে খাটো করে দেখানোটাই তার এই গ্রন্থের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তামাম ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতি তত্ত্ব কায়েম করার আকাক্সক্ষায় পরিচালিত কর্মসূচির অংশ হিসাবে হিন্দু ধর্মীয় সাংষ্কৃতিক জাতীয়তাবাদী সমাজপ্রধান স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগের এম.এ. ক্লাসের পাঠ্য তালিকায় মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্ত্বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত যারা পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত হতে দেননি, তেমনি এর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে প্রগতিশীল পরিচয়ে ঘরে এবং বাইরে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রয়োজনে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টে সৃষ্ট ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম প্রধান দেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এম.এ. ক্লাসের পাঠ্য তালিকায়ও যারা কেবল হিন্দু সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতিসত্ত্বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য-সঙ্গীতই কেবল রাখতে চেয়েছেন, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ এবং ‘বৈষ্ণব পদাবলী’ ও অবশ্য পাঠ্য হিসাবে রাখতে চেয়েছেন; কিন্তু ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট থেকে ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত খোদ পাকিস্তান আমলেও সাম্য ও সহাবস্থানের কবি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য-সঙ্গীতও যারা অবশ্যপাঠ্য করতে চাননি, তাদেরই চিন্তা-চেতনার সমর্থক অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ সাহেব। তার এই মানসিকতার পরিচয় আমি প্রথম পেয়েছিলাম কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিমিটেডের ‘দেশ’ পত্রিকায় লেখা আমার একটা চিঠির প্রতিবাদে লেখা তার চিঠিতে। পাকিস্তান আমলে নাকি নজরুল চর্চাই বেশি হয়েছে, এমন ভিত্তিহীন কথাও লিখতে পেরেছিলেন তিনি। 

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজে মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ এমন অনেক মহৎ মানুষ আছেন যারা হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব আরোপকামী নন। এদের মধ্যে এমন অনেক মহৎ মানুষও আছেন যারা সাম্য ও সহাবস্থানের কবি কাজী নজরুল ইসলামের গুণগ্রাহী কেবল নন, ভক্তও। কিন্তু বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রী মনুসংহিতার সমাজে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব আরোপকামীরাই সংঘবদ্ধ ও সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। ১৭৫৭’র ২৩ শে জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসন মঞ্চায়নের সময় থেকে সেই হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব জাতীয়তাবাদ আরোপকামীরাই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সবখানের, প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন। তামাম ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব কায়েম করার সুবিধার্থে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টে মুসলিম প্রধান অবিভক্ত পাঞ্জাব ভাগ করে মুসলিম প্রধান অবিভক্ত আসাম ভাগ করে এবং মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাংলা ভাগ করে বৃটিশ ভারতের বিশ শতাংশ জায়গা দিয়ে, ভারতীয় উপমহাদেশের দশ শতাংশের মতো জায়গা দিয়ে, এরপরও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের আলাদা জাতি হিসাবে স্বীকার না করার একতরফা শর্তে ভারতীয় উপমহাদেশে একটা মুসলিম প্রধান দেশ সাময়িকভাবে বা অস্থায়ীভাবে স্পষ্টতই তাদের উদ্যোগেই সৃষ্টি করা হয়েছে। ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে ইংরেজরা তাদের আকাক্সক্ষাই পূরণ করেছেন।

ক্রুসেডের চেতনাসম্পন্ন সা¤্রাজ্যবাদী বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ইংরেজী ভাষী শ্বেতাংগ বণিকদের জাতীয়তাবাদী খৃস্টান সমাজের সহযোগী সমাজ হিসাবে ১৭৫৭’র ২ শে জুন থেকে ১৯৪৭ এর মধ্য আগস্ট পর্যন্ত একশ নব্বই বছর যাবত সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে একচেটিয়াভাবে সযোগ-সুবিধা পেয়ে বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনসংহিতার সমাজ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে, শিক্ষার দিক দিয়ে, সচেতনতার দিক দিয়ে, সাংগঠনিক দিক দিয়ে এবং ঐক্য ও সংহতির দিক দিয়ে এতখানি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন যে, তাদের পক্ষে এটা বিশ্বাস করা খুবই সহজ হয়েছিল যে, ১৭৫৭’র ২ শে জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের সময় থেকে ১৯৪৭এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত ১৯০ বছর যাবত সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত হয়ে হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন ও অসংগঠিত হয়ে পড়ে সমাজহীন সমাজের মানুষ হিসাবে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হওয়ায় ১৭৫৭-এর ২৩ জুনের ১৯০ বছর পর ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টে সৃষ্টি মুসলিম প্রধান দেশটিকে মুসলমানরা উপযুক্ত মর্যাদায় ধারণ করতে পারবেন না।

হিসাবটা যে ভুল ছিল এমনটা ভাবার যথেষ্ট সুযোগ সব ক্ষেত্রে নেই। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এবং ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে একটা খুব বড় রকমের বিপর্যয়, মর্মান্তিক বিপর্যয় ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টের পর ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে। পাকিস্তানের কথা জানি না, কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ও হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতি তত্ত্বের কারণে ভারতে এবং বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কারণে বাংলাদেশে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্ত্বা চর্চার এবং এই মুসলিম জাতিসত্ত্বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত, স্থাপত্য ও অন্যান্য শিল্প চর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। এটা আদৌ কোনো অতিরঞ্জিত কথা নয়।

 

॥ দুই ॥

হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে সনাক্ত হয়ে আছেন মুসলমানরা। আর হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতি তত্ত্বের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে সনাক্ত হয়ে আছে মুসলমান সমাজের ইসলাম-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্ত্বা ও এই মুসলিম জাতিসত্ত্বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য, সঙ্গীত, স্থাপত্য ও অন্যান্য শিল্প। 

 অন্যদিকে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট পরবর্তী বাঙলা ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত হয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের কেবল মুসলিম প্রধান দেশের অন্যান্য ভাষাভাসী প্রধান মুসলিম প্রধান প্রদেশের মুসলমানরা কেবল নন, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি এবং মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্ত্বা ও এই মুসলিম জাতিসত্ত্বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য, সঙ্গীত, স্থাপত্য ও অন্রান্য শিল্প। এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে বাংলা ভাষাভাষী প্রধান মুসলিম প্রধান দেশের বাঙলা ভাষাভাষী মুসলমানরাও যাতে নজরুল চর্চার দিন থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকেন সেই লক্ষ্যেই অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ সাহেব কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার পতœীর প্রতি মিথ্যা নিন্দা-অপবাদ এবং কুৎসা সম্বলিত এই গ্রন্থ প্রণয়নের কাজটা করেছেন। সব নিন্দা-অপবাদের প্রতিবাদ এই একটা নিবন্ধে করা সম্ভব নয়। আমি এখানে কেবল একটি বিষয়ের উল্লেখ করছি। তিনি তার এই গ্রন্থের ৪০৮ এবং ৪০৯ পৃষ্ঠায় দুটো কালী মূর্তির ছবি ছেপেছেন। একটা উত্তর কলকাতার ‘স্যামবাজার স্ট্রীটের’ ‘কালী মন্দিরের’ কালীমূর্তি এবং একটি শ্যামবাজার স্ট্রীট এলাকাতেই খোদ ‘নজরুলের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তি’র। এর অর্থ কবি কাজী নজরুল ইসলাম রামকৃষ্ণ পরম মহাদেবের চেয়েও অনেক বেশি কালীভক্ত ছিলেন। কেবল ঘরের কালীমূর্তির পূজা করলে তার চলতো না। রাস্তার কালীমূর্তির পূজা করেও তিনি সাধ মেটাতেন।

 

॥ তিন ॥

আমার মত কবি কাজী নজরুল ইসলামের সুস্থাবস্থায় তাকে দেখার সৌভাগ্য ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ গ্রন্থের প্রণেতা আজহারউদ্দীন খানের এবং কবির কনিষ্ঠপুত্র কাজী অনিরুদ্ধ ইসলামের স্ত্রী কল্যাণী কাজীর হয়নি। বিভিন্ন ভাড়া বাসায় কবি পরিবারের কবির দ্বিতীয় পুত্র বুলবুলের জন্মের দু’আড়াই বছর আগে থেকে অর্থাৎ ১৯২৮-২৯ সাল থেকে) কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দেখেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের পালিত কন্যা শান্তিলতা দেবী।

প্রথমে অনেক দিন যাবত কবির পৌত্রী খিলখিল কাজীর কাছেই তার কথা শুনছিলাম। খিলখিল কাজীই বলতেন, ‘দেখা হলে তার কাছেই কবির বিষয়ে এবং কবি পরিবারের বিষয়ে অনেক কিছুই জানতে পারবেন।’

এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ সংলগ্ন মাজার এলাকায় ১৯৮৭’র ২ শে মে (১৩৯৪-এর ১১ই জ্যৈষ্ঠ) মঙ্গলবার সকালে কবির পালিত কন্যা শান্তিলতা দেবীর সঙ্গে কবির পৌত্রী খিলখিল কাজী পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এর দু’দিন পর ঢাকার বনানীতে খিলখিল কাজীদের বাড়িতেই ৯০ মিনিট করে ১৮০ মিনিটের দুটো অডিও ক্যাসেটে আমি তার সাক্ষাৎকার নেই।

সেই সাক্ষাৎকার ঢাকার দৈনিক ইনকিলাবের ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ পৃষ্ঠায় ১৯৮৯-এর ২৭শে জানুয়ারী থেকে ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। ‘নজরুল জীবন ও পালিত কন্যার স্মৃতিকথা’ শিরোনামে এই সাক্ষাৎকারটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকার নজরুল একাডেমী থেকে ১৯৯৮’র আগস্ট মাসে।

ঢাকার নজরুল একাডেমী থেকে ১৯৯৮-এর আগস্টে প্রকাশিত নজরুল জীবন ও পালিত কন্যার স্মৃতিকথা’ শিরোনামে আমার এই গ্রন্থের ২৮ পৃষ্ঠায় আছে, কবির পালিত কন্যা শান্তিলতা দেবীকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কবিকে কি পূজো করতে দেখেছেন?’

তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘কবিকে পূজো করতে দেখিনি। কবির শাশুড়ি ঘরে পূজো করতেন। তার আলাদা ঘর ছিল। স্ত্রী পূজা-অর্চনা করতেন না।’

জিজ্ঞেস করলাম, কলকাতার কলেজ স্ট্রীট মার্কেটের হরফ প্রকাশীনর মালিক, মাসিক কাফেলা পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘নজরুল পরিক্রমা’ গ্রন্থের লেখক আবদুল আজীজ আল-আমান লিখেছেন যে, ‘নজরুলের বাড়িতে (অর্থাৎ নজরুলের বাসায়) তুলসীতলা ছিল। কথাটা কি ঠিক?’

জবাবে তিনি বললেন, ‘কোনো তুলসীতলা ছিল না।’ 

নজরুল জীবন ও পালিত কন্যার স্মৃতিকথা’ শিরোনামে উক্ত গ্রন্থের ৬১ পৃষ্ঠায় আছে, আমার প্রশ্নের জবাবে শান্তিলতা দেবী সুস্পষ্ট বললেন, ‘কবি কালী সাধনা করতেন না। পূজা-অর্চনার সময় বা অন্য কোনো সময় আমরা বললে, কবি দক্ষিণেস্বরে কালী মন্দিরে নিয়ে যেতেন আমাদের।’

 

॥ চার ॥

নজরুলের চোখে বরদাচরণ মজুমদার

অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ সাহেবের ‘বিদ্রোহী রণক্লান্তÍ : নজরুল জীবনী’র ৩৯৯ পৃষ্ঠায় নিমতিতার গৌরসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, লালগোপা মহেশনারায়ণ হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক, ‘শিব-স্বরূপ’ ‘গৃহযোগী’ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক শ্রীবরদাচরণ মজুমদারের যোগসাধনারত কিংবা যোগব্যায়ামরত একটা ছবি ছাপা হয়েছে। ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল জীবনী’ শিরোনামে অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ সাহেবের এই গ্রন্থের ৪০১ পৃষ্ঠায় দেখছি লালগোলা মহেশ নারায়ণ হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক, ‘শিবস্বরূপ’ ‘গৃহযোগী’ ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক শ্রী বরদাচরণ মজুমদার ওপরে একটা চেয়ারে বসে আছেন এবং নিচে তার পাদদেশে মাটিতে বসে আছেন ডানদিকে তার জামাতা এবং বাঁ দিকে পরিস্থিতির কারণে, বিশেষত পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে বিপর্যস্ত ও বোকা বনে যাওয়া কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ‘শিব-স্বরূপ’ ‘গৃহযোগী’ বরদাচরণ মজুমদারের ব্যবস্থাপনা কিংবা সম্মতি ব্যতিরেকে নিশ্চয়ই এ ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। ভদ্রলোক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ও বিবেকবান মানুষ হলে এভাবে ছবি তোলার ব্যবস্থা করা তো অনেক দূরের কথা, এভাবে ছবি তোলার ব্যাপারটা অনুমোদনও করতে পারতেন না। 

ভদ্রলোক কবিপতœী আশালতা সেনগুপ্তার এবং কবির শাশুড়ি গিরিবালা সেনগুপ্তার ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আধ্যাকিতার পথে চিকিৎসার বিধান দিয়েছিলেন এবং সে চিকিৎসা তিনি নিজেই করেছিলেন। পতœী আশালতা সেনগুপ্তর এবং শাশুড়ি গিরিবালা সেনগুপ্তার ধর্মানুভূতির এবং ধর্মীয় আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিরুপায় হয়ে বোকা বনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট, কলকাতা ১২, এই ঠিকানাস্থিত ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড থেকে অক্টোবর ১৯৬৯-এ প্রকাশিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’র তৃতীয় মুদ্রণে ৪৭২ পৃষ্ঠায় মুজফফর আহমদ লিখেছেন:

‘একদিন গিরিবালা দেবীকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এমনকি আর কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না? তিনি বললেন, ‘লালগোলা হাইস্কুলের হেডমাস্টার শ্রী বরদাচরণ মজুমদার এখন হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দিচ্ছেন।’

কিন্তু ‘শ্রী অরবিন্দ’ (শ্রী অরবিন্দ কুমার ঘোষ)’র কাছে শ্রী বরদাচরণ মজুমদার যদি ‘শ্রেষ্ঠ যোগী আখ্যা’ পান, শ্রী বরদাচারণ মজুমদারের প্রতি কাজী নজরুল ইসলাম যদি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দিলীপকুমার রায় এবং শ্রী নলিনীক্লান্তÍ সরকারকে ‘ভক্তিতে অবনত হতে দেখেন এবং শ্রী বরদাচারণ মজুমদারের প্রতি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকেও যদি ‘আন্তরিক ভক্তিতে সিক্ত’ হতে দেখেন, সঙ্গীতকার সুরেশ চক্রবর্তী যদি শ্রী বরদাচরণ মুজমদারের অন্যতম শিষ্য হয়ে থাকেন, কবি-পতœী আশালতা সেন গুপ্তার কাছে এবং কবির শামুড়ি ঠাকুরানী গিরিবালা দেবীর কাছে শ্রী বরদাচরণ মজুমদার যদি কেবল ‘গুরুদেব’ নন স্বয়ং শিব, হন বা ভগবান হন তাহলে কর্মজীবনের এবং সংসার জীবনের এই পরিবেশে কবি কাজী নজরুল ইসলামের শ্রী বরদাচরণ মজুমদারকে শরীর মনের একজন সাধারণ মানুষ ভাবার কি কোনো সুযোগ থাকে?

॥ পাঁচ ॥

ঘরে এবং বাইরে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের সাম্য ও সহাবস্থানের নীতিতে হিন্দু সমাজের ধর্ম, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করে চলতে চেয়েছেন। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই ধর্মীয় ও ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আবেগ অনুভূতিকে পরিপূর্ণ মর্যাদা দিয়ে জীবন ধারণ করতে চেয়েছেন, বাঁচতে চেয়েছেন এবং এইভাবে সাম্য ও সহাবস্থানের নীতিতে নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে কাজ-কর্ম করতে চেয়েছেন। সাম্য ও সহাবস্থানের নীতিতেই এভাবে তামাম বিশে^র মুসলিম সভ্যতাকে তাঁর সাহিত্যে ও সঙ্গীতে তুলে এনেছেন। এবং বার বার বলেছেন যে, তিনি “আল্লাহর বান্দা” এবং “নবীর উম্মত” কিন্তু কবি তিনি সবার। 

সে সময়কার অবিভক্ত মুসলিম প্রধান বাঙলার দৈনিক ও সাময়িকপত্রগুলোর সিংহভাগ ছিল হিন্দুদের। নাট্যাঙ্গনে, বেতার গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানীগুলো, চলচ্চিত্রাঙ্গন, এ সবই ছিল হিন্দুদের এখতিয়ারে।

অন্যদিকে দেখছি, সমাজহীন মুসলমান সমাজের মানুষরা কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আর্থিক দিক দিয়ে সহযোগিতা করার ব্যাপারে যেমন, তেমনি একটা উপযুক্ত মেয়ে দেয়ার ব্যাপারেও এগিয়ে আসেন নি। সমাজহীন মুসলমান সমাজ এ সব নিয়ে কোনো কিছু ভাবার কথা চিন্তাও করেন নি।

কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবন, এই উভয় দিকেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রধানত হিন্দুদের কাছে ঋণী। হিন্দুদের সব সময়ই একটা সুসংবদ্ধ সমাজ থাকে। হিন্দুরা সাধারণত সব সময়ই তাদের ধর্ম, ধর্মীয়, ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতিসত্তার প্রতি থাকেন আপোষহীন। মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরস্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তাকে তারা বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের সাম্য ও সহাবস্থানের দৃষ্টিতে দেখেন না। তদুপরি তাঁদের আছে ভারতীয় উপ-মহাদেশের মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করে গড়ে ওঠা হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতি সত্তাকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করে গড়ে ওঠা হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব। এই সব কঠিন বাস্তবতা স্মরণে রেখে বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের সাম্য ও সহাবস্থানের নীতিতে হিন্দুদের ধর্ম, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে হিন্দুদের দৃষ্টিতেই দেখতেন। তার এই ভূমিকার কারণে তার সম্পর্কে মুসলমানদের মনে যাতে কোনো ভ্রান্ত ধারণার জন্ম না হয় সে জন্য বিভিন্ন জায়গায় বারংবার উল্লেখ করে গেছেন যে, তিনি ‘আল্লাহর বান্দা” এবং “নবীর উম্মত”, কিন্তু কবি তিনি এবং মানুষ তিনি সব ধর্মীয় সমাজের।

 

পাঁচ

কবি কাজী নজরুল ইসলামের এবং তার পরিবারের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন নলিনীকান্ত সরকারের মাধ্যমে এবং নলিনীকান্ত সরকারের পরিবারের মাধ্যমে স্ত্রী বরদাচরণ মজুমদারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কবির এবং কবি পরিবারের। কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী এবং শাশুড়ী তাঁদের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং শিক্ষার স্তর থেকে স্ত্রী বরদাচরণ মজুমদারকে একটা সাইকো ফিজিক্যাল অর্গানিজম বা শরীর মনের একটা সংগঠন হিসাবে দেখেন নি। দেখেছিলেন তাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির দৃষ্টিতে ভগবানরূপে বা ভগবানের অবতাররূপে। এ দৃষ্টিতে বরদাচরণ মজুমদারকে দেখা কবি কাজী নজরুল ইসলামের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না সে প্রমাণ তার বিশ^াসপ্রসূত ও গভীর আন্তরিকতাপূর্ণ সুবিশাল ইসলামী সাহিত্য সঙ্গীত; অভিভাষণ, ইসলাম বিষয়ক বিভিন্ন লেখা।

তবে শ্রীবরদাচরণ মজুমদারকে নলিনীকান্ত সরকাররা, দিলীপ কুমার রায়রা, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুরা, শ্রী বারীন্দ্র কুমার ঘোষরা, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীরা, শ্রী অরবিন্দকুমার ঘোষরা, আশালতা সেন গুপ্তরা এবং গিরিবালা দেবীরা যে দৃষ্টিতে দেখতেন, ব্যবহারিক জীবনে ঠিক সে দৃষ্টিতেই দেখতে বাস্তবে বাধ্য ছিলেন তিনি।

কর্ম-জীবনের সহায়ক ও সহকর্মীরা এবং ঘরে স্ত্রী-শাশুড়ী যদি শ্রীবরদাচরণ মজুমদারকে শিবরূপে বা ভগবানরূপে দেখেন তা হলে তাকে শরীর মনের একটা সাধারণ মানুষরূপে দেখার সাধ্য সেদিনকার পরিস্থিতিতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের থাকার কথা নয় বলেই ছিল না।

৪ঠা সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ (১৮ই ভাদ্র ১৩৪৫: ৮ই রজব ১৩৫৭ হিজরী) তারিখ রবিবার দুপুর সাড়ে বারোটায় শ্রী বরদাচরণ মজুমদারকে লেখা চিঠিতে কবি পটস ডীজীজে আক্রান্ত তার স্ত্রীর বিষয়ে উল্লেখ করেছেন:

“গতকল্য বিকাল হইতে আপনার বৌমার অত্যন্ত অস্থিরতা ও আনচানি বৃদ্ধি পাইয়াছে। সে সর্বদা আমাকে বলিতেছে, গুরুদেবকে আনাও, ওঁকে আসতে বলো, ওঁকে আমার হয়ে ডাক, আমার ডাকে উঁনি আসছেন না।”

লক্ষণীয় যে, কবি পতœী আশালতা সেন গুপ্তার চোখে শ্রী বরদা চরণ মজুমদর হলেন ভগবান কিংবা ভগবানেরই অবতার। পটস ডীজীজে শয্যাশায়ী হয়ে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা না নিয়ে নিরাময়ের জন্য তিনি পরম বিশ^াসে শ্রী বরদাচরণ মজুমদারকে ভগবান সাব্যস্ত করে ডাকছেন। এ রকম এক হিন্দু নারীর একজন অসহায় মুসলমান স্বামীর জন্য এটা কত বড় বিপদের কথা! এই পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তৌহিদবাদে বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ^াসী কোনো ঈমানদার মুসলমান স্বামীর পক্ষে দ্বিমত পোষণ করার কি কোনো সুযোগ থাকে?

শ্রী বরদাচরণ মজুমদারের আধ্যাত্মিক চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসায় কবির স্ত্রী আশালতা সেনগুপ্তার এবং কবির ‘শাশুড়ী ঠাকুরাণী” গিরিবালা দেবীর আস্থা ছিল না। অন্যরকম চিকিৎসা কবি পতœী এবং কবির “শাশুড়ী ঠাকুরাণী” অনুমোদন করেননি। এ প্রসঙ্গে এর আগে ২২শে আগস্ট ১৯৩৮ (৫ই ভাদ্র ১৩৪৫ : ২৫ শে জমাদিউসসানি ১৩৫৭ হিজরী) তারিখ সোমবার সকাল ৯টায় শ্রী বরদাচরণ মজুমদারকে লেখা কবির চিঠিতে এক জায়গায় আছে:

“আপনি শিব, আপনার ওষুধের পর আর কিছু করা উচিত ছিল না। কিন্তু দুর্বল মানুষের এমনি মতিচ্ছন্ন হইয়া থাকে।...

“আপনার নির্দেশমতো কার্য করিতে পারি নাই বলিয়া আপনার বৌমা আপনার শ্রীচরণারবিন্দে ক্ষমা ভিক্ষা করিতেছে। দুই দিন হইতে এখন ঐভাবে প্রণাম করিতেছে। তবে উঠিতে পারে না বলিয়া ঠিক ঐভাবে পারিতেছে না। এ সম্বন্ধে আপনার আদেশ জানাইবেন।

“... স্বয়ং শিব যদি বাঁচাইতে না পারেন কেহ পারিবে না।”

“... আপনি ইচ্ছাময়, আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক। আপনি জন্মে জন্মে যাহা করিতেছেন আমার জন্য, তাহা আমার মঙ্গলের জন্যই।”

কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করা দরকার। ভক্তি, না বাধ্য হওয়ার একটা ব্যাপার আছে সেটা উপলব্ধি করা দরকার। পরে এই চিঠিরই এক জায়গায় আছে:

“এই বন্ধন-জর্জরিত দাসকে মুক্তি দিন। দাদা, আর পারি না, আর ভাল লাগে না।...”

শ্রীবরদাচরণ মজুমদারকে নলিনীকান্ত সরকার, দিলীপকুমার রায়, সুরেশ চক্রবর্তী, শ্রী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, শ্রী অরবিন্দ (শ্রী অরবিন্দকুমার ঘোষ), শ্রীমতী আশালতা সেনগুপ্তা এবং গিরিবালা দেবীরা যেভাবে দেখেছেন সেভাবে দেখা কবি কাজী নজরুল ইসলামের পক্ষে যে সম্ভব ছিল না সে সাক্ষ্য তার ইসলামী সাহিত্য-সঙ্গীত, অভিভাষণ, ইসলাম বিষয়ক বক্তব্য সম্বলিত চিঠি, এ সবই দেবে। তবে তার কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবারে শ্রীবরদাচরণ মজুমদার সম্পর্কে ভিন্ন মত প্রকাশ করার সুযোগ যে ছিল না সেটা উপলব্ধি করতে হবে। ভিন্ন মত প্রকাশ করে চললে যে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা পেয়েছি সেই কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা পেতাম না। অনন্য সাধারণ কবি, অনন্য সাধারণ মানুষ হিসাবে এ দিক দিয়েও অনেক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে গেছেন তিনি। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ