বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

দেড় সপ্তাহে রাঙ্গুনিয়ায় ১০ জনের অপমৃত্যু

রাঙ্গুনিয়া-কাপ্তাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বিভিন্ন ঘটনায় অপমৃত্যুর মৃত্যুর মিছিল ক্রমশই বেড়েই চলেছে। গত দেড় সপ্তাহে ১০ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত মাসে ইসলামপুর ও বেতাগীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে একাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা জুড়ে মাদকের বিকিকিনি যে কোন সময়ের চেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাড়িঘর নির্মাণে নীরবে চলছে চাঁদাবাজি। মূল্যবান সরকারি জায়গা দখলে গড়ে উঠেছে একাধিক সিন্ডিকেট। সব কিছু মিলিয়ে রাঙ্গুনিয়া এখন ভয়াবহ এক আতংকের জনপদ। ডাকাতি ও বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত গত এক সপ্তাহে প্রায় এক ডজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানা পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৩ মে রাতে উপজেলার চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নের সৈয়দুল হক চেয়ারম্যান বাড়িতে জান্নাতুল ফেরদৌস (২৭) নামের এই প্রবাসীর স্ত্রী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করে। একই দিন ৩ মে বিকেলে হোছনাবাদ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তাপুর মধ্যম পাড়া হাজারি পুকুরে ডুবে মোহাম্মদ ওসমান (৯) নামের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ১ মে বিকালে কর্তফুলী নদী থেকে সাহেদা আক্তার শারমিন নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৯ এপ্রিল সরফভাটা ইউনিয়নের সিকদার পাড়া এলাকায় দিনগত রাতে মা ডেইজি আকতার (২৮), মেয়ে ইভা আকতার (৬) ও ইসরাত নূর (১০ মাস) বিষ পানে আত্মহত্যা করে। গত ২৫ এপ্রিল ইসলামপুর-গাবতল সড়কে বেপরোয়া চাঁদের গাড়ি উল্টে ঘুমন্ত অবস্থায় মোহাম্মদ জাফর (৫০), মোঃ আব্দুল মোনাফ (৪২), মোঃ নাজিম উদ্দিন (২৮), মোঃ রিয়াজ (১৫) নামের চার ইটভাটা শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
জানা যায়, উপজেলার কোদালা ইউনিয়নের গোয়ালপুরা সিংহঘোনা এলাকার মো. আবদুল মালেকের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের সাথে চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নের সৈয়দুল হক চেয়ারম্যান বাড়ির মরহুম গফুর আলমের পুত্র প্রবাসী মোহাম্মদ ইসার ২০১১ সালে বিয়ে হয়। তাদের সংসারে মুসতাকিম আহম্মদ ঈশান (৬) ও ঈশিতা ইছা মীম (৪) নামের এক পুত্র ও কন্যা শিশু সন্তান রয়েছে। গ্রামের মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগে গৃহবধূ জান্নাতুল ফেরদৌসের সাথে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পরে প্রতিবেশী ভাসুর পুত্র মো. মিজানুর রহমান (২৫)। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ার সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে পরকীয়া চালিয়ে গেলেও ৩ মে গভীর রাতে দেখা করতে গেলে দু'জনকে অনৈতিক অবস্থায় একসাথে দেখে ফেলে শ্বশুর বাড়ির লোকজন। পরে দেড়ঘন্টা পর গৃহবধূ গলায় ওড়না পেঁচিয়ে নিজ কক্ষে সিলিংয়ের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করে বলে জানা যায়। তবে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, পরিকল্পিত ভাবে গৃহবধূকে হত্যার পর আত্মহত্যা বলে মূল ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। 
হোছনাবাদ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তাপুর মধ্যমপাড়া হাজারি পুকুর থেকে মোহাম্মদ ওসমান (৯) এর লাশ উদ্ধার করা হয়। ৩ মে দুপুরে খেলার সময় অসাবধানতা বসত ওসমান পুকুরে পড়ে যায়। অনেকক্ষণ সাড়াশব্দ না পেয়ে সবাই তাকে খুঁজতে বের হন। পরে পুকুরের পানিতে তার নিথর দেহ ভাসতে দেখেন কয়েকজন প্রতিবেশী। ইউপি সদস্য মো. রাজু বলেন, মৃত অবস্থায় তাকে পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১ মে বিকালে কর্ণফুলী নদী থেকে সাহেদা আক্তার শারমিন নামে এক গৃহবধুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিকল্পিত হত্যাকা- উল্ল্যেখ করে রাতেই রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন গৃহবধূর পিতা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এ ঘটনায় স্বামী মোহাম্মদ আলমগীরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ২ মে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজাতে প্রেরণ করে। গৃহবধুর স্বজনরা জানান, গত বছরের ২ নভেম্বর উপজেলার স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া ইউনিয়নের ২নম্বর ওয়ার্ডের মাওলানা মকবুল আহমেদ বাড়ির মো. শহীদুল্লাহর কন্যার সাথে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ নোয়াগাঁও ফকিরখীল এলাকার নবীর হোসেনের পুত্র মো. আলমগীরের বিয়ে হয়। আলমগীর ঢাকায় চাকরি করেন। বিয়ের পর থেকে সুখেই সংসার চলছিল তাদের। বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে স্বামীসহ বাপের বাড়িতে প্রায় ১০ দিন থাকার পর ২৮ এপ্রিল শ্বশুর বাড়িতে ফিরে আসেন তারা। এরপর ২৯ এপ্রিল রাত ৮ টায় ডলফিন পরিবহন বাস যোগে স্বামী ঢাকা চলে যায়। পরদিন ৩০ এপ্রিল ভোরে নিখোঁজ হন গৃহবধূ সাহেদা আক্তার শারমিন। এই ব্যাপারে তার বাবা ঐদিনই রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরী দায়ের করেন।
এদিকে ২৯ এপ্রিল দিনগত রাতে সরফভাটা ইউনিয়নের সিকদার পাড়া এলাকায় পারিবারিক কলহের কারণে প্রথমে দুই মেয়েকে পরে মা বিষপানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। নিহতরা হলেন ডেইজি আকতার (২৮), মেয়ে ইভা আকতার (৬) ও ইসরাত নূর (১০ মাস)। নিহত গৃহবধূর মেঝ ভাই সাইফুল আলম বলেন, ডেজি আমাদের ৬ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সবার ছোট ও আদরের ছিল। তাই ২০০৯ সালের মে মাসে বিয়ের পর থেকে বোনের সুখের জন্য তার স্বামীর বিভিন্ন দাবি পূরণ করে যাচ্ছি। কিন্তু এরপরেও অত্যাচার থেমে ছিল না। তাকে ছোটখাট বিষয়ে বেধড়ক মারধর করতো তার স্বামী। ঘটনার দিন দুপুরে এবং ২০ মিনিট পূর্বেও তাকে মারধর করেছে সে। সর্বশেষ তার স্বামীর নতুন ঘর করার কাজেও ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। বিভিন্ন সময় আমার বোন অত্যাচার সইতে না পেরে ঘরে চলে আসলে আমরা বার বার বিভিন্ন আপোষ বৈঠকে তার অঙ্গিকারের কথা বিশ্বাস করে বোনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে স্বামীর ঘরে পাঠিয়েছি। সর্বশেষ তার স্বামীকে বিশ্বাস করে পেয়েছি বোন এবং ছোট দুই ভাগনীর লাশ।
গত ২৫ এপ্রিল ভোর রাতে ইসলামপুর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ইসলামপুর-গাবতল সড়কের পাশে টিনশেড ঘরে কাঠ ভর্তি বেপরোয়া চাঁদের গাড়ি ঢুকে গিয়ে উল্টে ঘুমন্ত অবস্থায় মোহাম্মদ জাফর (৫০), মোঃ আব্দুল মোনাফ (৪২), মোঃ নাজিম উদ্দিন (২৮), মোঃ রিয়াজ (১৫) নামের ইটভাটার চার শ্রমিক ঘটনাস্থলে নিহত হয়। ইটভাটার শ্রমিক মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, ইটভাটার কাজ শেষে রাতের খাবার খেয়ে যথারীতি ১০টায় ঘুমিয়ে পড়ি। ভোররাতে বিকট শব্দে উঠে দেখি আমাদের শুয়ার ঘরের ভিতরে বড় বড় গাছের টুকরো ঘুমন্ত শ্রমিকদের গায়ের উপর। বড় বড় গাছের টুকরা সরানোর পর ৪ জন শ্রমিক গাছ চাপা পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ