সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

গরীবের সঞ্চয়পত্র এখন ধনীদের দখলে

খুলনা অফিস : জনগণকে সঞ্চয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করতে ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় আহরণের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করলেও এখন তা বিত্তবানদের দখলে। কালো টাকা সাদা করার বাহক হিসেবে এ সঞ্চয়পত্রকে ব্যবহার করছেন বিত্তশালীরা। নামে-বেনামে কিনছেন সঞ্চয়পত্র। ব্যাংকের তুলনায় সুদ বেশি হওয়ায় সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন সঞ্চয়পত্র কিনতে। সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থেকে অর্জন তিন থেকে চার গুণ।
জানা যায়, এক সময় সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া সুদে অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকদের সংসার চললেও এখন সব শ্রেণি পেশার মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আর নতুন করে সুদের হার কমায় ব্যাংকের স্থায়ী আমানত ভেঙে সবাই সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন। এ কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন ব্যাংকের শাখায় দেখা যাচ্ছে সঞ্চয়পত্র ক্রেতার দীর্ঘ সারি।
সম্প্রতি খুলনার বাংলাদেশ ব্যাংক শাখায় গিয়ে দেখা যায়, শুধুমাত্র সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক গ্রাহক। সেখানে সৌদি আরব ফেরত আমিনুল ইসলাম বলেন, এফডিআরের (স্থায়ী আমানত) সুদ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমতে কমতে এখন ৬ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। এই টাকায় এখন সংসার চলে না, তাই এফডিআর ভেঙে সঞ্চয়পত্র কিনতে এসেছি। আমানতের সুদ হার কমার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক বছরে খুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকার। অপরদিকে ৫ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৪২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকার। পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের বিক্রি হয়েছে ১৫৪ কোটি ৭১ লাখ ৭০ হাজার টাকার। পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৭৭ কোটি ৩২ লাখ টাকার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের শুধুমাত্র খুলনায় তিন বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ১১৭ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ১৬১.০৮ কোটি টাকা। ৫ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ১৪ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ২৬.৫৯ কোটি টাকা। এই দুই প্রকার সঞ্চয়পত্র যে কোনো গ্রাহক কিনতে পারেন এ জন্য ৩ ও ৫ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে বিত্তবানরা একাধিক ব্যাংক থেকে সঞ্চয়পত্র কিনে কালো টাকা সাদা করে থাকেন। এ কারণেই লক্ষ্যমাত্রার থেকে অর্জন দ্বিগুণ।
অপরদিকে পারিবারিক বা পেনশনার চিত্র উল্টো যেখানে লক্ষ্যমাত্রার থেকে অর্জন কম। পারিবারিক সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ১০২.৫০ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ৫২.৫৬ কোটি টাকা। পেনশনের সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ৫২.৫০ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ৪৯.৪৯ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তফসিলী ব্যাংকসমূহের শুধুমাত্র খুলনায় তিন বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ৮৩.৫০ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ৮৮.৪২ কোটি টাকা। ৫ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ১৭.৫০ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ৬০.২৫ কোটি টাকা। পারিবারিক সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ৬৩ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ৫০.২৫ কোটি টাকা।
পেনশনের সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ কোটি টাকার বিপরীতে অর্জন ২৬ কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা করে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে। স্থায়ী আমানতের সুদের হার এখন ৬ শতাংশ। বিভিন্ন মেয়াদে সঞ্চয়পত্রের জন্য ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর। আর এ কারণে বেশি আমানতের আশায় প্রতিদিনই মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে।
জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরোর তথ্য মতে, জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের সব কার্যক্রম অটোমেশন (অনলাইন) হয়ে যাবে। এ অটোমেশনে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সঙ্গে লিংক থাকবে। তখন সঞ্চয়পত্রে লেনদেন পেপারলেসভাবে হবে। তাই কেউ সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র কিনছে কি না সেটি সহজেই ধরা পড়বে। অটোমেশন হয়ে গেলে কার সঞ্চয়পত্র আছে তার সব তথ্য পাওয়া যাবে। সঞ্চয়পত্রে কালো টাকা বিনিয়োগরোধে ৫০ হাজার টাকার বেশি কেউ সঞ্চয়পত্র কিনতে চাইলে তাকে চেকের মাধ্যমে টাকা পেমেন্ট করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুদের হার কমিয়ে আমানত ধরে রাখতে পারবে না ব্যাংকগুলো। স্থায়ী আমানতের জন্য বেশি সুদ না দিলে সব আমানত সঞ্চয়পত্রে চলে যাবে। স্থায়ী আমানত ধরে রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে আলাদা সুদহার নির্ধারণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ৫ বছর এবং ৩ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র ক্রয় করতে বেশি আগ্রহী সাধারণ মানুষ। কারণ এতে করে কালো টাকা সাদা করার একটি সহজ উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। আর এই জন্যই ব্যাংকের এ সকল সঞ্চয়পত্র ক্রয় বেড়ে চলেছে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা খুবই প্রয়োজন।
খুলনা জিপিওর এমপিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, সঞ্চয়পত্র গরিবের আমানত হলেও এখন বিত্তশালীরাই এ দিকে ঝুঁকছেন বেশি। টাকা অলস ব্যাংকে বসিয়ে না রেখে অধিক লাভের আশায় সঞ্চয়পত্র কিনে রাখছেন। সরকারি নীতিমালা রয়েছে একজন গ্রাহক একক নামে পাঁচ বছর মেয়াদি সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। একক নামে তিন বছর মেয়াদি সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন এবং যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে সঞ্চয়পত্র কিনতে আসা আব্দুর রহিম বলেন, বিদেশ থেকে কিছুদিন হল ফিরেছি। এ জন্য টাকা ব্যাংকে না রেখে সঞ্চয়পত্র কিনে রাখছি। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ ব্যাংক, জিপিওসহ প্রায় তিনটি ব্যাংকের সঞ্চয়পত্র ক্রয় করেছি।
বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনার উপ-পরিচালক মো. তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, তিন বছর এবং পাঁচ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র আমাদের লক্ষ্যমাত্রার থেকেও দ্বিগুণ বিক্রি হয়। এতে করে অনেক সময় দেখা যায় সাধারণ গ্রাহক সঞ্চয়পত্র ক্রয় করতে পারেন না। তবে বর্তমান নিয়মে এক ব্যক্তি একাধিক ব্যাংকে একাধিকবার সঞ্চয়পত্র ক্রয় করেন। এতে করে কিছু বিত্তবানের কারণে সরকারের সঠিক লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। এ সকল কারণে বর্তমান সরকার সঞ্চয়পত্র ক্রয় বিক্রয়ের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি করেছেন। যাতে করে এক ব্যক্তি একাধিক ব্যাংকে সঞ্চয়পত্র ক্রয় করতে না পারেন। এ প্রক্রিয়ার সফলতার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার উপায়ও বন্ধ হবে বলে তিনি মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ