বুধবার ২৫ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

১০০ টাকা আয় করতে ব্যয় হচ্ছে ১৯৬ টাকা

স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘদিনের অবহেলিত রেলের উন্নয়নে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নেয়। লক্ষ্য ছিল উন্নয়ন ও যাত্রীসেবার মান বাড়িয়ে রেলকে লাভজনক করে তোলা। ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৭-১৮ সময়ে ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার ৬৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে রেলওয়ে। চলমান রয়েছে আরো ৪৮টি প্রকল্প, এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এ ব্যয়ের পরও পরিচালন অদক্ষতার কারণে লোকসানের ধারা থেকে বের হতে পারছে না সংস্থাটি। সর্বশেষ গত অর্থবছরেও রেলের লোকসান হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সংস্থাটির অপারেটিং রেশিও ছিল ১৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে রেলওয়ের ব্যয় হয়েছে ১৯৬ টাকা। প্রতিবেশী দেশ ভারতের রেল সংস্থার ক্ষেত্রে এ হার ৯৬ শতাংশ। চীনে এ হার ৯৪ শতাংশ, জাপানে ৮৪, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৩, পাকিস্তানে ১০৫ ও কানাডায় ৬১ শতাংশ। দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট সংস্থার অপারেটিং রেশিও বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট যে, পরিচালন দক্ষতার দিক থেকে অসম্ভব রকম পিছিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পাশাপাশি হিসাবেও ফাঁকি আছে রেলওয়ের। পরিচালন ব্যয় হিসাবায়নে ডেপ্রিসিয়েশন বা অবচয় যোগ করেনি তারা। যদিও পরিচালন ব্যয় হিসাব করার সময় অবচয় বিবেচনায় নেয়া অপরিহার্য। অবচয় যোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অপারেটিং রেশিও বাড়বে আরো অনেকখানি।
 প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অদক্ষতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারিত্বের অভাবেই রেলের এ দুরবস্থা বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, আয়ের ওপর বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণ কোনোদিনই ছিল না, এখনো নেই। প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছে। আর এ সুযোগটা কিন্তু রেলের কর্মীরাই করে দিচ্ছে। এটা ঠিক, যাত্রী পরিবহন করে রেলের পরিচালন ব্যয় তুলে আনা কঠিন। কিন্তু পরিচালন ব্যয় তুলে আনার আরো অনেক উপায় আছে। সবচেয়ে বড় উপায় হলো কনটেইনার ও কার্গো পরিবহন বাড়ানো। এ কাজটিই বাংলাদেশ রেলওয়ে করতে পারছে না। সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল কনটেইনার পরিবহনের মাধ্যমে প্রাপ্ত আয় দিয়েই পরিচালন ব্যয়ের সিংহভাগ তুলে আনা। এতে রেলের আয় বাড়ত, ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতো, তেমনি সড়কের ওপর চাপও অনেকটা কমে আসত।
বর্তমানে সারা দেশে প্রতিদিন ৩৫২টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। আর পণ্যবাহী ট্রেন চলছে ৫১টি। গত অর্থবছর যাত্রী পরিবহন থেকে ৯০৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ও পণ্য পরিবহন করে ২৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আয় করেছে রেলওয়ে। বিবিধ খাত থেকে আয় হয়েছে আরো ২৯৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে আয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় রেলওয়ের পরিচালন দক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
রেল পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে অদক্ষতার ছাপ। উন্নত দেশে রেল যখন লাভজনক, উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য আনছে, তখন বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্যয় করছে আয়ের দ্বিগুণ।
২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১০০ টাকা আয়ের পেছনে রেলের ব্যয় ছিল ১৮৭ টাকা। আয়-ব্যয়ের এ অনুপাত সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পৌঁছে ২০১১-১২ অর্থবছরে। ওই অর্থবছর ১০০ টাকা আয় করতে রেলের ব্যয় হয় ২৬০ টাকা।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যয় হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। গত এক দশকে ৪৬টি নতুন ইঞ্জিন ও ৩২০টি নতুন কোচ বহরে যোগ হলেও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় কমেনি। সর্বশেষ অর্থবছর মোট ব্যয়ের ৩৪ শতাংশই হয়েছে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে। রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রতিবেশী ভারতেও এ হারে ব্যয় হয়নি। প্রশ্ন রয়েছে বিবিধ খাতের ব্যয় নিয়েও। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বিবিধ খাতের ব্যয় ১ শতাংশের কম, সেখানে বাংলাদেশে এ ব্যয় প্রায় ২৭ শতাংশের কাছাকাছি।
জ্বালানি ব্যয়েও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের রেল সংস্থার চেয়ে বিস্তর পিছিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে। মোট ব্যয়ের ১৪ শতাংশ জ্বালানি বাবদ চলে যাচ্ছে। যদিও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে এ ব্যয় ৬ শতাংশের ঘরে। বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের পেছনে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তেল চুরিকেই প্রধান কারণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এর বাইরে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় ১৩ দশমিক ৬৫, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ৪ দশমিক ৪৯ এবং পরিচালনা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে গত অর্থবছর।
পরিচালন অদক্ষতার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিনির্ভরশীলতাও রেলওয়ের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রেলে প্রতিটি টিকিটের পেছনে সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার জন্য কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস) নিচ্ছে ৫ টাকা। ট্রেন ট্র্যাকিং সিস্টেমের জন্যও টিকিটপ্রতি আরো ৭ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর বাইরে অনলাইনে টিকিটপ্রতি রেলের ব্যয় হচ্ছে ২৫ টাকা। অর্থাৎ একটি টিকিট বিক্রিতেই ৩৭ টাকা ব্যয় করে ফেলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
 একসময় রেলের নিজস্ব ধোপাখানা ছিল, এখন সেটি বন্ধ। এ কাজে যুক্ত রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য নিজস্ব বিভাগ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ দখলে থাকা জমি শনাক্তের জন্য বিপুল টাকা ব্যয় করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। রেলের নিজস্ব যে স্লিপার কারখানা ছিল, সেটিও এখন বন্ধ। স্লিপারের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই নির্ভর করছে রেল। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে রেলের এ পরনির্ভরশীলতাকেও অনেকাংশে দায়ী করছে ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট।
 অবশ্য রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন দাবি করছেন, সঠিক পথেই এগোচ্ছে রেলের উন্নয়ন। ধারাবাহিক লোকসানের বিষয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত থাকায় রেল অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ধারাবাহিক লোকসান থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যাত্রীসেবার মান বাড়ানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। যদি যাত্রীদের সন্তোষজনক সেবা দেয়া যায়, তাহলে তাদের কাছ থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণও সহজ হবে। এছাড়া রেলের অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্প চলমান আছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে যাত্রীসেবা যেমন বাড়বে, তেমনি লোকসানি প্রতিষ্ঠানের তকমা থেকেও রেলকে বের করে আনা সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ